20 September 2017

শাহ আজীজ




অভাগা যুবক বাংলাদেশ
শরীরের ৯৯ ভাগ পুড়িয়ে
লাইফ সাপোর্টিং এ
বার্ন ইউনিট এর ওয়ার্ডে
শুয়ে আছে ৪২ বছরের যুবক
নাম তার বাংলাদেশ ।
পিতা মাতা অজ্ঞাত, 
জন্মের পর থেকেই
ডাস্টবিন কুড়িয়ে খেতে অভ্যস্ত ।
বাইপাস হবে ওর শ্বাসনালীর
সুস্থ নিঃশ্বাস নেবার তরে,
এযাবতকাল যায়নি পাওয়া
একফোঁটা রক্ত, ঘেঁটে তাবৎ
সামাজিক সাইটে , ফেসবুকে
ওর মৃতবৎ অবস্থায় পাওয়া গেছে
১৬ কোটি লাইক !
কি নির্মম সময় এই অভাগার
পুড়ে ছারখার তবু নয় মাথা নোয়াবার
বাংলাদেশ নাম যার !

ঢামেক এর বুড়ি  মেথরানী 
দ্যায় তুলে জাউ ধোঁয়া ওঠা
নতুন খেজুর গুড় মেশানো স্বাদে
চোখ বেয়ে তার ঝরে অঝোর ধারা
বলে ও জন্মেছিল ওই ফুটপাতে
মেলেনি ঠাই  ঢামেকের সীমানাতে
পাক সেনা আর রাজাকারের দাপটে ।
বলেছে তারা বাপ নেই যার
এখানে ডেলিভারি হয়না সেই জারজের
শিশুটির চিৎকারে শহীদ মিনার
কেঁপেছিল থর থর করে
আজ সে ৪২এর তাগড়া জোয়ান ।
গোটা শরীরে হাজার পেট্রোল বোমার
রাহাজানিতে রচিত হয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র
কি অপূর্ব মানচিত্র, দেখার মতো বটে!

হে বাঙ্গালী ! দেখে যেও অভাগারে
ঢামেকের বার্ন ইউনিট এর বিছানায়
শুয়ে কাতরায় ভালবাসার বাংলাদেশ !!


বাংলা আমার
আমাকে যখন ফোরসেপ দিয়ে টেনে
বের করা হয় তখন প্রথম যে মুখটি
আমি দেখি তিনি মধ্যবয়সী, দেখার মত
একগুচ্ছ পাকা চুল,আয়ত নয়ন,উন্নত নাসিকা ।
আমার পুনঃ নির্গমন অসময়ে,পরিপূর্ণ অবয়ব
না হতেই আমাকে সিজারিয়ান করে
জোরপূর্বক বের করা হয়,পরে বুঝেছি ।
পালক মাতা আর আমার আইনগত
সহ পালকদের হাতে দোলনায় দুলছি ।
একটা ক্রাইসিস শুরু থেকেই বিদ্যমান ছিলো।
আমার কথিত পিতা বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে
এলেন আমার বুকে,চতুর এই পিতা কাঁদলেন
আমার দুঃসময় থেকে তার দুঃসময়ের গান
গাইলেন একাকী সহ পালক পরিবেষ্টিত হয়ে ।
আমার সুস্থতার জন্য যা দরকার ছিল তা
আমি পেলাম না,আমাকে গড়ার জন্য যা
প্রয়োজন তা থেকে আমি বঞ্চিত ,আমার
ভেতরে বসে থাকা রোগবালাই নিরাপদেই
সবলতা আর ক্ষমতা অর্জনে ব্যাস্ত রইল ।
মাত্র দুবছর যেতে না যেতেই আমি ধর্ষিত
হলাম ,কলমের মাথায়,তিনশত ভেড়ার হাতে।
আমার মাথাটি প্রকাণ্ড এবং দেহটি
শীর্ণ হওয়া শুরু হলো,অচিরেই কথিত
পিতার রক্তে রন্জিত হলো আমার বুক এবং
রক্তের হোলি খেলা চলতে লাগলো লাগাতার।
 
আমার শীর্ণ দেহখানি একটি মোটা সুদৃশ্য
দামী কোট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো ।
আমি পুনঃ পুনঃ ধর্ষিত হলাম,পালকমাতা
বৈরী হলো আর কর্তিত বেরাদর আবারো
পাশে এসে নসিহতে কান ঝালাপালা করলো।

সদৃশ্য ঐ চেয়ারখানিতে কি আছে জানিনে তবে
যেই-ই আসন নেয় ওখানে সেই-ই পরপারে
যাবার টিকেট পেয়ে যায় হাতে, আশ্চর্য !
আমাকে হাইপ্রোটিন,হাই-ক্যালোরী খাওয়ানো
শুরু হলো,ফলাফল ডায়রিয়া লাগাতার,তবে
প্রতিষেধক এলো “ওরস্যালাইন”,ঘন্টায় ঘন্টায় পেলাম
ওটাও নাকি শুধু আমার জন্য গবেষনাগারে তৈরী
বড় ভাগ্যবান আমি ।
আমার মাটিগুলি উর্বর থাকায় দুপেয়ে জীবেরা
পথ বেছে নিলো । আমার উপর দিয়ে
অজস্র  পানি প্রবাহে তারা প্রান পেলো ।

আমার মাঝে মধ্যেই মনে হয় আমিতো
ইতিহাসে আমিই ছিলাম সেই পাল সেনদের
সময় থেকে,মাঝে মধ্যে ঐক্যবদ্ধ থেকেছি
লোভনীয় গা’গতর সামাল দেবার জন্য
সামাল দেবার জন্য আমায় ভিনভাষীদের সঙ্গে
প্লাস্টিক সার্জারী করে তৈরী হলো জড়ুয়া ধর্ম ভাই
আসলে দাস বানানো হয়েছিলো আমায়
যেমনটি বানিয়েছে এরিয়েনসরা
এই বিশাল ভূখন্ডের কালো মানুষদের আর
সাথে আমরা,তাদের অন্ন ,বাসস্থান,উদ্যান তাবৎ কিছু

কিন্তু পাল্টেছে সময়,মানুষেরা যাযাবরের মত
যখন তখন ভূখন্ড পাল্টায় না,খোজে স্থায়ী আবাস
আমিও গর্বিত, পরিচয় হলো আমার সুপ্রতিস্ঠিত।
অবশেষে আমি যৌবনেই বৃদ্ধের রূপ পেলাম
আমার সন্তানেরা নিজেরাই লিপ্ত সংঘর্ষে
তাদের ভিতর বিভেদের বীজ হয়েছে বপন,অগোচরে
অনেক দফা ধর্ষিত আর কাটাছেড়ায় চলমান
লাগাতার অশান্তিতে আমার সন্তানদের নিরাপত্তা
নিয়ে ভেবে ভেবে শঙ্কিত আমি । অবশেষে
আমারও কি হবে পরিবর্তন , মিলবে মূল স্রোত ধারায় !
তাও ভালো ,হবেনা নামের ঐতিহাসিক পরিবর্তন
ইদানিং আমি বেধড়ক আদরে ত্রস্ত
অঢেল অর্থ আর ভাল খাদ্যের সমাহারে
মনে জাগে ভয় এমনটিতো ছিলোনা কথা
কি জানি কোন শংকায় কেঁপে ওঠে মন বারবার ।
আমার সন্তানেরা দ্বিধাবিভক্ত  । যারা লড়েছিল
আমার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় , তারা কলুষিত,
অর্থ লোলুপতায় নিমজ্জিত । হাল ছেড়ে যে কিষাণ 
লড়েছিল সে   ফিরে গেছে মাঠে তাদের দেখা যায়
দিতে গতর জড়ুয়া ভাইয়ের  এজেন্টের খামারে ।
অগনিত এইসব কর্মহীন মুখকে
সুপথ দেখায়নি আমার কথিত পিতা
বরং ক্ষমায় বুকে টেনেছে সুর্য্য  সন্তানের ঘাতকেরে ।
হাজা্র হাজার  সন্তানহারা জন্মদাত্রীর অভিশাপে
কেঁপেছিল সেদিন ভুখন্ড আমার । আমার সন্তানেরা
বারবার ক্ষমতার পরিবর্তনে ,তাত্ত্বিক পরিশোধনে ,
আমার বুক ভিজিয়েছে আপন ভাইয়ের রক্তে ।
সেই আমি শুধু আমিই রয়ে গেছি ,আজ তিন দশকের
পর সেই মোটা মাথা  আর নাবাড়ন্ত  শরীর ,
লাগাতার ডায়রিয়ায়  প্রায় পানিশূন্য ।
মানুষেরে দেবার মতো বিশুদ্ধ পানি আর আমার
শরীরে অবশিষ্ট নেই ,ভেতরে সঞ্চিত প্রাকৃতিক
ধারা পড়েছে ছড়িয়ে মিলেছে পানিতে নীরবে
আমি আক্রান্ত , আক্রান্ত বৃক্ষ আর তাবৎ প্রাণীকুল
আমি ক্লান্ত, শ্রান্ত, শায়িত মৃত্যুপথযাত্রী সম
আমার জিরজিরে শরীরখানি এখন দর্শনীয় বড়
বড় বেশী গবেষণার বিষয় , ভিক্ষার মুষ্টি
যা হয় আদায় দেখিয়ে আমার ক্ষয়িষ্ণু গতর
তা চলে যায় দূর ভূখণ্ডে ফেরেনা কখনো আর ।
মুষ্টি দাতারা এলে দেখতে আমায় তোলে সাজিয়ে গুঁজিয়ে
সবুজ হয় সবুজাভ রসায়নের গুনে , অবিরাম ধারা ওঠে
বুক চিরে দিতে ভিজিয়ে শুকনো গাত্রে ,
কবে কোন কালে কে জানে এই বঙ্গভুমে এসেছিল
কুলাঙ্গার আর জারজের দল লুকিয়ে ছুপিয়ে ভালো
মানুষের সাথে ,ক্রমে তারা বিস্তার করেছে শেকড়
খাঁটি বাঙ্গালি নামে , নির্দয় প্রতিনিয়ত খুঁড়িছে  আমার পাঁজর
দিতেছে আশ্রয় প্রশ্রয় ভিনদেশী মতলববাজদের
আমার আমিত্ব আমাতেই থাকবে বিদ্যমান
আসছে ধেয়ে পর্বত প্রমান বানের জল
হিমালয় চুড়া থেকে , দেবো ভাসিয়ে ভালমন্দ  অকাতরে
রহিতে তাণ্ডব আর করতে পুনঃস্থাপন প্রাকৃতিক ভারসাম্য
আমি বঙ্গভুমি আদি অকৃত্রিম ,আমি ছিলাম সেন পালদেরও অতীতে
পৃথিবী সৃষ্টির আদিতে আর আমি থাকব যতদিন থাকে অক্ষত
আদি মাতা এই বিশাল ধরিত্রী ।।



বাংলা আমার-দায়
এখন আর কেঁউ চাইছে না নিতে দায়
বাংলাদেশ নামের ৪২ বছরের তাগড়া যুবক
পেট্রলে পুড়ে শুয়ে ছিল বার্ন ইউনিটের বিছানায়
বেচে গেছে জীবনটা শ্বাস হয়েছে স্বাভাবিক ।

কতো কুলাঙ্গার এলো গেল দেখতে তামাশা
কোন জারজই দ্যায়নি এতটুকু ভরসা
বিছানায় বসে নিশ্চুপ নিশ্চল নির্বাক
শরীরময় পোড়া দাগ নিয়েছে খাল বিলের বাক।

তবুও ভালো বাংলাদেশ দেখছেনা কিছু
ছেড়ে আসা  স্মৃতিময় মন্দ দিনগুলো ছাড়ছে না পিছু
ওর দুটো চোখ হারিয়েছে সাময়িক দৃষ্টি দেখার
কর্নিয়া দুটো পাল্টালে দেখতে পাবে আবার।

শুনেছে চুপটি করে বসে বিছানায়
১৫৩ টি আকিকা হয়েছে শিশুর জন্ম ছাড়াই
ফিসফিস করে বলে নার্সের কানে কানে
আরও হতো ভালো যদি শুনতে না পেতাম এ দুটি কানে ।।





No comments:

Post a Comment