০৩ জানুয়ারী ২০১৮

একগুচ্ছ কবিতা —সেলিম রেজা




[ কবি সেলিম রেজা এই সময়ের একজন  প্রতিশ্রুতিশীল কবি। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি সাহিত্য সাধনা করে আসছেন, লেখালেখির পাশাপাশি তিনি সম্পাদনাও করেন ইতোমধ্যে বেশ কিছু সাহিত্য কাগজ তিনি সম্পাদনা করেছেন। কবি’র জন্মদিনে সংবেদ্য’র পক্ষ থেকে রইলো আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং প্রকাশিত হলো  কবি’র লেখা একগুচ্ছ কবিতা]



কী হবে আর বেঁচে!
কী হবে আর বেঁচে!
তুমিই যদি হারাও নিকষ অন্ধকারে;
চোখের আড়াল হবেই যখন
এত্ত স্মৃতি কেনই বা দিলে ?
পরাজয় একদম মানায় না তোমাকে
জানি দুঃখ পুষে রাখো অহোরাত্রি
নিঝুম রাতে জেগে থাকো একা একা
নিভৃতে খুলে বসো কথার পুরান সিন্দুক
মনে হয় ভুলে আছো মিলনের ঠিকানা
প্রথম যেদিন চোখাচোখি ছুটির শেষ প্রহরে
জিজ্ঞেস করলেদেখছেন কী!
তদুত্তরে বললাম কাজল কালো স্বপ্নিল দু’চোখ
কী হবে আর বেঁচে!
যদি টের না পাও আমার উপস্থিতি
বুঝতে না পার জীবন বৃক্ষের শেকড় আমি
এত্ত ভালোবাসা কেনই বা বাসলে ?


গুচ্ছ কবিতা—দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম




ধ্যান
কোন স্মৃতি বিস্মৃতির আনয়ন নয়
অন্ধকার ভেঙে আসা এক হাওয়া
অন্তস্থ গভীরে খুব করে তাড়া
একটা ভয় সুগভীর,
চক্রাকার বেড়ে ওঠা বজ্রপাত মতো
বিদীর্ণ হাহাকার জুড়ে দেয় অকৃত্রিম
তার ভাষা বুঝবার অভিপ্রায় ছেড়ে
ফিরে আসি স্তব্ধতার ভেতর,
আকাশ যেরকম ধুলিসমেত সাজে
সে মতো দৈন্যদশা নিয়ে এক ধ্যানী

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭

গুচ্ছ কবিতা—সেবক বিশ্বাস




বিস্রস্ত বেহাগ
এই যে মৃত শঙ্খের ঘ্রাণতপ্ত অনুধ্যানের তলে
মুছে ফেলা নৈঃশব্দ্যের এক স্পন্দন যেন!
শ্যামাঙ্গী পাড় বেয়ে লোর সন্ন্যাস;
অতঃপর অনিঃশেষ আঙুরক্ষেত
শিথিল ফেনায় জমে যাওয়া এক সঙ্গিন স্রোত!
প্রতিমুখ পৃষ্ঠার ছায়া জুড়ে বিপন্ন পাখির বাঁক
অপটু অরোকেরিয়া থেকে সঘৃত সঙ্কেতে লেখা সহস্র সংখ্যা চিহ্ন!
এসবই অক্ষীয় বিভ্রমে থেমে যাওয়া নিমগ্ন ডানার নিশ্চুপতা
বহতা বাতাসে বিম্বিত বিস্রস্ত বেহাগ!

পালা সুন্দরী—শাহরিয়ার কাসেম




বড্ড অলস কাটছে রাতুলের। সবে মাত্র উচ্চ মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষা দিয়ে বেশ অবসর। পড়াশুনার নেই খুব চাপ। বাবামাও বলে না কোন কাজ করতে। উদাসী হয়ে রাত দিন পাড় করছে। যদিও রাতুলের অবাদে ঘোরাঘুরির খুব অভ্যাস নেই তবুও ইদানিং বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে এখন রাতবিরেতে রুটিন ছাড়া বাড়ি ফিরে। বকুল, জসিম, শুভ ও জয়নাল রাতুলের খুব কাছের বন্ধু। তাঁরা রাতুলের মত এত ভাল ছাত্র নয়। তবে দুষ্টুমির জন্য রাতুলের চেয়ে ঢের বেশি। ইদানিং তাঁদের সাথে বেশী সঙ্গ দেয়ায় রাতুলও বেশ দুষ্ট হয়ে উঠছে।

২৭ ডিসেম্বর ২০১৭

এক পৃষ্ঠা কবিতা- অপরাহ্ণ সুসমিতো


ক্রিয়াপদ
বউটা বারান্দায় খালিপায়ে ধপ্-ধপ্ হাঁটছিল
সে সভাপতির কাছে আকুল ক্ষমা চাইছিল
লোকটা কাফনের কাপড় যাকাত দিচ্ছিল

শুকর ছানাটা বোকাবোকা চাইছিল
সম্পাদক কবিতার ভিড়ে হাঁপাচ্ছিল
কেরাণীটা ঈদের মৌসুমে বেশি করে ঘুষ নিচ্ছিল
গাজার শিশুটা বোমার শব্দে কাঁদছিল 

গুচ্ছ কবিতা- শুভ্র সরকার


মানুষের শব্দার্থ
ফুল ফোটার শব্দ, তুমি জামার বোতামে ঘরে লুকিয়ে রাখো। আর মুখস্থ অঙ্কের মতো আমি ভুলে যাই মানুষের শব্দার্থ।
সন্ধ্যাঝোপে ধ্বনিত হয় অভিজ্ঞ অন্ধকার দিগন্তরেখায় চেয়ে থাকে মেঘধুলো।

অনভ্যস্ততায় বিদার হয়ে যায় ধূলোর স্নান; পাখির বাগান। যেমন পালকের অবয়বে হারিয়ে যায় উড়ান। অলীক হাওয়ার তোড়ে হারিয়ে ফেলি আত্মার ঘ্রাণ।

আর বিলীন ধুলোর অবয়ব উড়িয়ে দিলে পথের নিশানা। দীর্ঘকাল হেঁটেও মানুষ নিজের কাছে পৌঁছাতে পারে না।

একগুচ্ছ কবিতা—উদয় শংকর দুর্জয়



আনমনা রোদ্দুর ভেজায় হৃতমহল 
বাদামী এনভেলাপ খুলতেই উড়ে যায় গুচ্ছ গোলাপ; টুপটাপ 
লাজুক শব্দগুলো লুকোতেই পশ্চিমে ওঠে মেঘের দেয়াল। তখন 
জানালায় নেমেছে ঘনঘটা, আঁচলের আড়ালে রোদনসূত্র গুছিয়ে নিয়ে 
এক ঝাঁক বিহগ ঠিকানা ভুলে উড়ে যায়। মোহনচূড়ার পিঞ্জরে লেখা গিরিখাদের 
পাণ্ডুলিপি পড়তে পড়তে অশ্রুপাতের রং বদলায়বালিকা তখনো খণ্ড খণ্ড মেঘপুঞ্জের
মাঝে দৃষ্টি ফ্যালে; প্রত্যাশিত আলোক বিন্দু দেখাবে বৈকুণ্ঠের দুয়োর। 

একগুচ্ছ কবিতা- হোসনে আরা জাহান


কেমন জানি পেট পোড়ে গো... 
কী দারুণ ঘুম ঘুম ভোর, কুয়াশা, শিশির, মিষ্টি রোদ
প্রিয় কাপে চায়ের হালকা লিকার
পাহাড়ি মেঘের গা ছুঁয়ে আসা বাতাসে
মন খারাপের মিশাদ
সবকিছুতেই কেমন একটা সুখলাগা পাই
তবু আমার কেমন জানি পেট পোড়ে গো
আমি ঠিক আজও এসব বুঝতে শিখি নাই

হাওড়ে হাজার মীন, পথের পাশে ভাঁটফুল
ঝুপ করে বৃষ্টি নামে, ভাসে মনে সাতকুল
আসমানে দেখি জাদুর প্রদীপ কেবলই জ্বলে
সময়ে অসময়ে আহা সত্য
মিথ্যার ছলে
এসব কথা নিজের মনে নিজেই তো লুকাই
তবু আমার কেমন জানি পেট পোড়ে গো
আমি ঠিক আজও এসব বুঝতে শিখি নাই।


একগুচ্ছ কবিতা—মাহমুদ নোমান


এভাবেও হয়ে থাকে
কানের লতিতে লাল ডেঁয়ের কামড়ের শূলে
নার্সিং হোমে এসে বলেছি,
বিধাতা আমাকে পাঠিয়েছে
              তোমার কাছে।
অথচ, তোমার সাথে কখনো কথা হয়নি
রাস্তায় হেঁটে যেতে হয়তো দেখেছি
তোমার চলে যাওয়া পরস্পরের
বিপরীত দিকে
আর ফিরে তাকিয়েছি একই সময়ে।

গুচ্ছ কবিতা- সোয়েব মাহমুদ



দ্যাখা–অদ্যাখা কাব্য: ১
আমি চাই তোমার সাথে কোথাও কখনোই আমার দেখা না হউক,
আমি চাই, প্রানপনে চাই।
তাই এড়িয়ে যাই, তোমার হাটা পথ
এড়িয়ে যাই পরীবাগ, মালিবাগ,বাসাবো এবং ছায়াবীথি।
এড়িয়ে যাই প্রানের শহরটাও।

একগুচ্ছ কবিতা—শারমিন আক্তার


ভবঘুরে
তোমাদের ঘরে সুখী কোন কবিতা
          রোজকার সংসার গোছায়
              আঁচল পেতে
ওদিকে আমার ঘাম শুষে খায় রাজপথ
ভদ্র পল্লীর গুটিকয়েক বিধাতার মতন

যেন মজলুম হতেই এসেছি আমি
ডিসকাউন্টের ফর্দে চাপা মানুষ এক
     বিষণ্ন পাহাড় গ্লানি সমেত
          কুঁজো পিঠের ধু-ধু শহরে।
ছায়াপথেই শেষ মিলল সরাইখানা
     কী করে আর বাড়ি যাই!

একগুচ্ছ কবিতা- জাকিয়া সুলতানা শিরীন


শাশ্বত
নষ্ট জোয়ারে ভাসো
চোখে গিলে খাও সম্ভ্রম
চুপিচুপি উত্তল ঢেউ তোলো
নারীর অঙ্গ ভাঁজেদোষ নেই তাতে।
যদি কবিতায় প্রেম ভালোবাসার কথা বলি
আবেগ উচ্ছলতার কথা বলি, অমনি
বলিরেখা টানো, ত্যাড়া চোখে দেখ,
দুরভিসন্ধি আঁটো,
মনে জাগাও নষ্ট আভ্রু
ঢাকনা দিয়ে ডেকে রাখো নগ্নচিন্তা,
যদি তোমায় পরোয়া না করিআমি
হয়ে যাই নষ্টার শ্রেণিভুক্তা,
ভেতরের দুর্গন্ধ ছড়ানোর ভয়ে
ত্রিপলে ঢেকে রাখো হৃদয়কে
উত্তোলিত করতে পারো না ফলার মতো।
চাঁদের আলো ঢেকে রাখতে হয় না
ও শাশ্বত সর্বজনীন
নিজেকে বিলিয়েই হয় বিলীন।

কষ্টালজিক- সৌমিত্র চক্রবর্তী


রম্ভগোল চিৎকারটা হাওয়ার দিকে ছুঁড়ে দিয়েই লাফিয়ে উঠল আদিম আর্য পতপত করে সঙ্গত করলো অনিয়মিত দাড়ির জঙ্গল এই ফাঁকা প্রান্তরে তার নিজস্ব ডিকশনারির এই শব্দের ইনটারপ্রিট করার মতো কোনো হুলো নেই
কংক্রিটানগর থেকে কতদিন হল পালিয়েছে সে? ৬ ৯ ০ ৪ সংখ্যাগুলো কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায় এখন অথচ অংকে সে নাকি বেশ ভালোই ছিল এসব আর মনে রাখতে পারেনা সে হোকগে, ওসব মনে রেখে অন্তত তার যে কিছুই হবার নয় এটুকু বোঝে সে কিছুই মনে রাখতে পারেনা সাম্প্রতিক কোনো ঘটনাই ভুরু দুটো কুঁচকে যায় কি যেন নাম মেয়েটার? ভীষণ সুখী সুখী মুখ করে চিড়িয়াখানায় দেখা বর নাকি পালিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে কদিন পরেই চিতপাত এক মোটেলের বিছানায় ফাঁকতালে ক্যামেরা,মোবাইল অনেক কিছুই গলে গেছে আঙুলের ফাঁকে মেয়েটার স্বর্গ দরজার কাছে একটা আঁচিল ছিল কি? লাল রঙের আঁচিলটা বড় হতে হতে আকাশে দপদপ করতে থাকে হা হা করে অনর্থক হেসে ওঠে জঙ্গুলে কয়েকটা কুবো পাখী লাল কালো ডানা বার করে উড়ে যায় উড়োজাহাজউড়োজাহাজলোকটা সেই ফেলে আসা শৈশব ফিরে পায় সে দৌড়ায়, মাঠ দৌড়ায়, চারপাশ দৌড়াতে থাকে
শাল্লাহ! সেই কাফেটোরিয়া কোত্থেকে টুপ করে খসে পড়লো। বাঞ্চোত, আড়াইশো টাকা পার কাপ ধক দিয়ে কুচ্ছিত কফি। ওয়াক থুঃ! বছরখানেক কফি দেখলেই ঘেন্না ধরে যেত। সেই টানা একঘেয়ে সকাল থেকে রাত্রি, আর রাত্রি ফুস করেই ফের সকাল। বারো ঘন্টা, চোদ্দো ঘন্টা কম্পিউটারে মুখ গুঁজে রগড়াও শালা যত ট্যাঁস কোম্পানীর রদ্দিমার্কা দস্তাবেজের গর্ভশ্রাব। রাতে ঘুমের মধ্যেও বিড়বিড়। সন্ধের পরেই রোজ মাথার মধ্যে দশটনের ডাম্পারের দাপাদাপি। কড়া ভোদকার গ্লাস নিয়ে অশোকার জঘন্য ভীড় গিলে বাড়ী ফিরতে এগারো। ধুস শালা তোর চাকরির পোঁদে দু লাথ। লাথি মেরে একটা মোরামের খন্ডকে তিরিশ ফুট দূরে পাঠালো সে। রম্ভগোওওওওল!

মুক্তি চাইছি- কাজী জুবেরী মোস্তাক


স্বাধীনতার উল্লাস আজ মনে হয় ফিকে
যখন দেখি মানবতাটা মরছে ধুঁকে ধুঁকে,
স্বাধীনতা আজ পরে আছে আস্তাকুঁড়ে
আর পরাধীনতা দেখি বুক উঁচিয়ে চলে৷

২১ ডিসেম্বর ২০১৭

কৃষ্ণানন্দ অথবা অ-পুষ্পিত কৃষ্ণচূড়া-মুহিম মনির


কৃষ্ণানন্দ
নাজমা আলী
প্রকাশক: চৈতন্য  প্রকাশনী
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ১৭ খ্রি.
প্রচ্ছদ: কাজী যুবাইর মাহমুদ
পৃষ্ঠা: ৮০
মুদ্রিত মূল্য: ১৫০ টাকা।

'হঠাৎ করেই রাত বেড়ে যায়। কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়েছিল রাতকে স্বাগত জানানোর জন্যে আর এখন রাত কত হবে--ভেবেই পাচ্ছে না।' কে ভেবে পাচ্ছে না? 'কে এই মেয়ে? এতো শান্ত, এতো শুভ্র, এতো পুণ্যে পরিপূর্ণ!' মেয়েটি হচ্ছে রামী। রামীরা সুলতানা'। নাজমা আলীর কৃষ্ণানন্দ'র কেন্দ্রীয় চরিত্র সে। ঘনায়মান রাতের আঁধারে আধাপাকা 'রাস্তা দিয়ে হাঁটছে রামী। রাস্তায় ছোটো ছোটো গর্তের মাঝে জমে আছে বৈশাখের বৃষ্টির জল। ওর রাঙা চরণ দুটো গর্তের মাঝে ডুবে যায় মাঝেমধ্যে, আর তখনি গর্তে জমে থাকা জল পায়ের আঘাতে ছিটকে পড়ে ওর শরীরের হাতে, মুখে, নীল শাড়িতেও।' মানে নীল শাড়ি পরেছে রামী। রাধা বেশে হয়তো কৃষ্ণের অভিসারে গিয়েছিল। কিন্তু সত্যিই গিয়েছিল কি না, তা আমরা জানতে পারি না। শুধু জানতে পারি: 'রামীর মস্তিষ্কটা সভ্য জগতে ফিরে আসে, ও ভদ্র ছিলো কিনা!'