১০ জুলাই ২০১৮

গুচ্ছ কবিতা — রিকি দাশ


 

দিগন্ত
ছুঁয়ে দেখার লোভে!
চর জেগে উঠেছে বিস্তৃত সব মেঘে,
খসে পড়ছে অ্যাংলোস্যাক্সন ইতিহাস
পার করে আসা সহস্র ভূগোল
ফেলে চলেছি এতকালের গুছানো সব সন্ধ্যা, মুগ্ধ নগর।

কোন শব্দ নেই থমথমে নিমতলার মতন নিঃসাড় শহরের কর্পোরেট গলি ছেড়ে;
হেঁটে চলেছি ক্রমশ গ্যালাক্সি জুড়ে।
কবিতার ক্ষেতে বুনে চলা রসায়ন চুষে শরীরে রাঙিয়ে নিবো যাযাবরের ব্যাধি।

উষ্ণ ঠোঁটে আলিঙ্গন করে শাণিত সব সকাল, একদিন যেন এক ঋদ্ধ আমি!
চিবুকের বা-পাশে রবীন্দ্রনাথ জপ-তপে ডানা মেলে ইট-কাঠের তান্ডব নীলকমলে।
গতির তীব্রতায় ছিটকে যাবে ভিসুভিয়াস।
ভূ-খন্ড ভেসে উঠবে পৃথিবীর লাভায়। ঠাই দাঁড়িয়ে শিল্প ছোঁয়ার তাড়নায় হেঁটে যাবো অদৃশ্যে।
দু-চোখ ভরে দিগন্ত ছোঁয়ার লোভে...

২৮ জুন ২০১৮

ফাহ্‌মিদা বারী—অন্ধ জীবন



:::: এক ::::
একটানা পানি পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে।
কেউ বুঝি বাথরুমের ট্যাপটা ছেড়ে রেখেই চলে গিয়েছে। টিপটিপ টিপটিপ...ফোঁটাগুলো বেশ বড়বড়। ট্যাপের নীচে মনে হয়, স্যান্ডেল টাইপের কিছু একটা আছে। আওয়াজটা খুব তীক্ষ্ণ নয়, খানিক ভোঁতা। বাইরে এতক্ষণ গাড়ির হুইসেল আর রিক্সা টেম্পুর প্যাঁ-পু-তে মাথা ধরে যাচ্ছিলো। সেসব আওয়াজ কমে আসতেই এখন শুরু হয়েছে এই ট্যাপের পানি পড়ার আওয়াজ।
বেশ অনেকদিন আগে একটা কথা শুনেছিলাম। যাচাই করে দেখার সময় অথবা সুযোগ কোনটাই হয়ে ওঠে নি আগেশুনেছিলাম, মানুষের একটা কোনো ইন্দ্রিয় অচল হয়ে গেলে নাকি অন্য ইন্দ্রিয়রা আরো বেশি মাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। এক ইন্দ্রিয়ের অবসর গ্রহণের সুযোগে অন্য ইন্দ্রিয়গুলো দায়িত্ব বেশ কয়েক দফা বেড়ে যায়। এখন তো হাতে সময়ের অভাব নেই। তাই প্রতিনিয়ত কথাটার সত্যতা মেপে দেখার চেষ্টা করছি আজ দু’বছর হতে চললো এক দূর্ঘটনায় চোখ দুটো হারিয়ে আমি পুরোপুরি অন্ধ।

১৫ জুন ২০১৮

মাহতাব হোসেন—বীথি'র বানান ভুল



শহীদবাগের মসজিদ পেরোতেই তেড়েফুঁড়ে বৃষ্টি নামলো। আমি গা বাঁচাতে কোথাও ঢুকে পড়বো কিনা এমন চিন্তা করতে করতেই ভিজে গেলাম। আর মাত্র দেড়দু’মিনিট হাঁটলেই নীতুদের বাড়ি। ১৭২/এ। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই চলে এলাম। ওদের বাড়িতে কলবেল নেই। দু’তলা পুরনো ধাঁচের বাড়ি। গেটের ওপর গোলাপি রঙা বোগেনভিলিয়া ছড়ানো।
কড়া নাড়তেই দৌঁড়ে এলো নীতু। স্যারবলেই একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে দ্রুত দরজা খুলে দিল। আমি খুব স্বাভাবিক ভাবেই ওদের বসার ঘরে চলে এলাম। এরমধ্যে ও একটা গামছা নিয়ে এসেছে। ফ্যানটাও ফুল স্পিডে ছেড়ে দিয়েছে। নীতুর হাত থেকে গামছা নিয়ে বললাম, তোমার আম্মু নেই। প্যান্ট কম ভিজেছে তবে শার্টের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ভেতরে শ্যান্ডো গেঞ্জি পরি না। নীতু বলল, আমু রান্নাঘরে।

০৯ জুন ২০১৮

ভিন্ন স্বাদের পাঁচটি অণুগল্প—সুধাংশু চক্রবর্ত্তী



।। চুরি-ডাকাতির অণুগল্প ।।
এর পর কী হবে

ডাকাতি করতে এসে ধরা পড়লে কী হয় জানিস? ঠাশ-ঠাশ-ঠাশ-ঠাশ...ডিসুম-ডিসুম-ডিসুম-ডিসুম...
জানবো না কেন? যা যা জানতাম সে-সবই যে হয়ে চলে আমার সঙ্গে।
এরপর কী হবে জানিস? চটাস-চটাস-চটাস...ডিসুম-ডিসুম-ডিসুম-ডিসুম...
জানবো না কেন? জানি বলেই তো ঘেন্নায় মরে যাচ্ছি। ডাকাতেরও অধম যে থানার ওই...
তাহলে বল এরপর কী কি ঘটতে পারে তোর কপালে?  ঠাশ-ঠাশ-ঠাশ...ডিসুম-ডিসুম...
আর মেরো না গো বাবুরা। বলছি বলছি। সব বলছি আপনাদের।
বল–বল। না বলা ইস্তক...ঠাশ-ঠাশ-ঠাশ...ডিসুম-ডিসুম...
এগুলোই আবার রিপিট হবে থানায় গিয়ে জমা হবার পর। তার সঙ্গে...
তার সঙ্গে কী? ডিসুম-ডিসুম...ঠাশ-ঠাশ...
ও বাবুরা গো-ও-ও, দারোগাবাবু যে সব ডিম...আমি আর বলতে পারবো না বাবুরা। জানতে পারলে দারোগাবাবু যে আমাকেও হজম করে দেবেন গো-ও-ও-ও....

গুচ্ছ কবিতা—সম্পা পাল



কাল্পনিক পৃথিবী
সামনে একটা কাল্পনিক লম্বা রাস্তা
সেখানে অনেক নির্জনতা, আর ধুপছায়া।

এরপরে আরও একটা রাস্তা সেটাও কাল্পনিক
রাস্তার ওপাশে একটা দরজা সেটাও কাল্পনিক।
দরজার ওপাশে কাল্পনিক পৃথিবী
কাল্পনিক পৃথিবীতে একটা কাল্পনিক চরিত্র।

২৬ মে ২০১৮

আলোকলতা— স্মৃতি ভদ্র



“মা
ভালবাসা জীবনের যে কোন সময় আসতে পারে।”
বুবুনের এই কথাটা আমার জীবনে মিলে যাবে তাযেন আমার ভাবনার অতিরিক্ত ছিল। জীবনের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা পিছনে ফেলে তখন আমি বেশ গুছিয়ে উঠেছি। স্বনির্ভর আমিই বুবুনের একমাত্র আশ্রয়স্থল। না, আশ্রয় নয় বুবুন আমার জীবনে জড়িয়ে আছে লতার মতোন। আর আমি ওর আলোকলতা।

আশ্রয়, এই শব্দটি ঠিক কতটা লজ্জাজনক হতে পারে তার উদাহরণ আমার জীবন। খুব ছোটবেলায় মা মারা যায়। এরপর বাবা বিয়ে করে নতুন মা ঘরে আনলে সেই ঘর আমাকে পর করে দেয়। আমার জায়গা হয় মামাদের কাছে। জায়গা নয় আশ্রয় দেয়। যা দিয়ে বিনিময়ে আমার আত্মসম্মানটুকু নিয়ে নিতে চায়। কিন্তু আমার আশ্রয়দাতারা বিনিময় সূত্রেই যে ভুল করছিলো তা মানতে নারাজ ছিল। তারা আমাকে তাদের উচ্ছিষ্ট একটু জায়গা দিয়েছিলো আশ্রয় হিসেবে যা ছিল স্টোররুমের এক কোণা কিন্তু বিনিময়ে চাইছিলো আমার সব থেকে মূল্যবান আত্মসম্মান। তাহলে কিভাবে সম্ভব ছিল এই বিনিময়? আর তাই আমার জন্য তারা বরাদ্দ রাখত কটু কথা আর উপহাস। তাদের সবচেয়ে বেশী উপহাসের স্বীকার হতো আমার পড়াশোনা করার ইচ্ছাটি। “কুঁজোর শখ হয় সোজা হয়ে দাঁড়াতে!” মামির এই বাক্যটির সাথে ঘর ছিল যেন  আমার সকালবিকাল। এই উপহাসকে গা থেকে ঝেরে ফেলে আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতাম। মায়ের নামে নানার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল টুকু দিয়েই আমি এগিয়ে যেতে থাকলাম।

২২ মে ২০১৮

সুনীতি দেবনাথ—মসলিনের সাতকাহন


একটি বহুল প্রচলিত গল্প আছেমুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে একদিন তাঁর এক কন্যা এলে আওরঙ্গজেব কন্যাকে স্বল্প বস্ত্র পরে আসার জন্য তিরস্কার করেন। বিস্মিত কন্যা জানান তিনি আবরওয়ানের (এক বিশেষ প্রকারের মসলিন) সাতটি জামা পরে আছেন। বিস্ময়! আরো বিস্ময় চল্লিশ হাত লম্বা আর দুই হাত চওড়া সূক্ষ্ম এই শ্রেণীর  মসলিন কাপড় একটা আংটির ছিদ্র দিয়ে পার করা যেতো। মাত্র এক পাউন্ড সুতোর দৈর্ঘ্য হতো প্রায় আড়াইশো মাইলা! ৫০ মিটার দীর্ঘ মসলিন কাপড় একটা দেশলাই বাক্সে জায়গা হতো। ১৭৫ গজ মসলিন কাপড় একসঙ্গে গুটিয়ে নিলে একটি পায়রার ছোট্ট ডিমের সাইজ হতো। বিস্ময়ের ব্যাপার কতটা সূক্ষ্ম বস্ত্র ছিলো এই পুরোনো কালের মসলিন।

২০ মে ২০১৮

গুচ্ছ কবিতা- অনুপ চক্রবর্তী


একাকিত্ব
এইতো ক'দিন আগেও একা ভালো ছিলাম ।
নিঃসঙ্গ জীবন উচ্ছল ঝলমল।
ছিলো প্রদীপের মতো জ্বলজ্বল।
একাকিত্বের জীবনে তোমাকে পেয়ে ধন্য ছিলাম।
তুমি সেই একজন; যার সাথে-
দেহে নয় আত্মার সম্পর্ক গড়ে ছিলাম।
একদিন হঠাৎ ধূমকেতুর মতো হারিয়ে গেলে..
নীরব আঁধারে  আমায় ধোঁকা দিলে।
কান্নার সাগরে ভাসিয়ে নিলে,
চলে গেলে না বলে- না ফেরার দেশে।
আমি আবার সেই একাই হয়ে গেলাম,
তবে নয় আগের ন্যায় একা নিঃসঙ্গ।
একাকীত্ব ই জীবনের আলো, হোক না অমাবস্যার ন্যায় কালো।


০৩ মে ২০১৮

একগুচ্ছ কবিতা—স্নিগ্ধা বাউল



গন্ধবণিক
ঘ্রাণ কিছু পেতাম পিতার ধূপের শরীরে, হিন্দুয়ানীর শৈশবে;
কাটাকুটির ঘুড়িতে, রঙিন ফিতেতে, মায়ের হাতে গরম ভাতে।
গন্ধ অন্ধ প্রেমিক, মুদ্রার গন্ধ ক্ষণিক ক্ষণিক।
মেয়েলি গন্ধ সপ্তাহ জুড়ে, আঁশটে গন্ধ নিজের ঘরে।
ত্রাতাদের গন্ধে ভুরভুর সমাজ
একই গন্ধে মাছের কারবার।


গুচ্ছ কবিতা—শফিক আহমেদ




পদচ্ছাপ
যেখানে যেখানে পড়েছিল পদচ্ছাপ
এই পিচ্ছিল ধাঁধাঁময় পথে
আর যত পথিক ছিল আনমনা
পরিচয় লুকিয়ে রাখতো কৌশলে
সেইসব পদচ্ছাপের পরে আরও অনেক মানুষ নিশ্চয়ই এসেছিল এগিয়ে
মনে রাখার প্রত্যয় নিয়ে আমিও কি হেঁটেছিলাম সানন্দে?
তবে আজও কেন খুঁজছি সেই সে পথের মানবীকণ্ঠ
আর গেরস্থময় গোটা আঙিনায়
ছড়িয়ে রেখে বিচালি
তার সেই প্রথম তমোহর হাসি!
অজ্ঞাত গ্রাম নয় যদিও অজ্ঞাত
তার ঠিকানারাশি
আমি কী চিনি?সেই দৃশ্যত নিগূঢ় জটিল রহস্যের ফাগুনভরা দুপুরের
প্রায় তামাদি হয়ে যাওয়া বালিকার
ঘুঙুরের প্রথম তন্দ্রার ঘোরটি?

একগুচ্ছ কবিতা—অনিরুদ্ধ সৌরভ



বর্ণহীন
ধূসর দেয়াল জুড়ে কে আঁকে বর্ণহীন চিত্র?
বুক- পিঠ জাপটে ধরেছে দীঘল কালো রাত
বুকের মাঝ বরাবর ভেদ করে যাচ্ছে অন্ধকার।
পড়ে আছি নিঃস্তব্ধ যেন ডায়নোসারের ফসিল!
জলের স্রোতে ভেসেছে অহঙ্কারআমিত্ব,
কালের ভাঙনে গেছে সংসারসুখের বসত ভিটা।
টিনের চুলো, পোড়া মাটির পাতিল, পাতার থালা...
বাঁধের ওপর সংসার।
কাকের চোখের মতো কালো রাত জড়িয়ে ধরে
তৃষ্ণার্ত শরীর, বিষাক্ত চুমু আঁকে পরম মমতায়!

সারা রাত কেটেছে সংশয়েআলোহীন,
জীবনের স্বাদ যেন বিষাক্ত, রূপ বর্ণহীন।


গুচ্ছ কবিতা—সেবক বিশ্বাস



কবুতর
রাতভর আমি স্বপ্ন দেখেছি
          এক সাদা পায়রার!
বাজারের এক বন্দী পায়রা কিনেছি
নগদ টাকায় খাব বলে,
সারা পথ কোনো কথা বলেনি সে,
হাতের মধ্যেই কেবল কেঁপে উঠেছে বারবার,
হৃৎপিণ্ডের এক জীবন ধুকধুকানি টের পেয়েছি আমি হাতের আঙুলে।
দুপুরে যখন গলাটা কেটেছি তার,
কাটা গলার এক অদ্ভুত স্বরে হঠাৎ সে বলে ওঠে
চল্লিশ বছর ধরে উড়ছি খুশির ডানায়;
আর আজ বয়স থাকতেই তুমি আমার গলাটা কেটে ফেললে!
চমকে ছুঁড়ে ফেলি কাটাকবুতর দু'হাত তফাতে।
মাটিতে চলে বেশ কিছুক্ষণ তার নিদারুণ দাপাদাপি।
অতঃপর সন্তপ্ত আমি তখনই ঠিক করে ফেলি
আমি আর কখনো কবুতরের মাংস খাবো না!


একগুচ্ছ কবিতা—অলক হাসান



হে ভ্যালেরিনা
ঝরা পাতার কোরিওগ্রাফি শিখে গেলে
ভয় জাগে এ বুকে
তুমি পাখিদের ভঙ্গিতে
সাগরের ঢেউ

হাওয়ার তালে
নেচে নেচে আত্মস্থ করে নিলে
অথচ আমার হৃদয়ের এ কম্পনে তোমার শরীর আজো কেঁপে উঠতে দেখিনি।

গুচ্ছ কবিতা—মাহমুদুল হাসান



কেরানী ও জ্বর
চেয়েছিলাম উথালপাতাল হবে,
উত্তাপে পুড়ে যাবে আদরের শরীর।
ভেবেছিলাম খুব তেজী হবে

ঢালাই মেশিনের সবটুকু শক্তি নিংড়ে ওলটপালট করে দেবে।
খুব রাজকীয় ভাবে না হলেও জ্বরটা এলো অবশেষে।
এলো ভিখারির মত মলিন মাথাব্যথা আর
          বেকার হতাশ প্রৌঢ়ের মত গা ম্যাজ ম্যাজ সাথে নিয়ে।
তবু আমি খুশি, দুটো দিন ছুটি পাওয়া যাবে
অনিচ্ছুক বাধ্যতামূলক এই বন্দিজীবনে স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে
          দুটো দিন মুক্তি পাবার আশায় একটু জ্বরের প্রার্থনা ছাড়া
          একজন ভীতু স্বপ্নভুক কেরানী আর কিইবা করতে পারে।
বৃষ্টি ভালোবাসে সে, ভেজে অনেক্ষণ,
রোদ ভালোবাসে, গায়ে মাখে খুব করে,
তাতে যদি একটু জ্বর  আসে।
তাতে যদি একটু ছুটি মেলে।

অপাংক্তেয়—আকাশ মামুন



রাতের শুনশান নিরবতা ভেঙ্গে একটানা গোঙানির আওয়াজ বাইরের অসহ্য রকম অন্ধকারকে একটা আকার দিতে চেষ্টা করছে। ভিতরে আলো বলতে হলদে সোডিয়াম বাতির টিমটিম করে জ্বলে থাকা। মেঘাচ্ছন্ন রাতে ভরা পূর্ণিমাকে মেঘ গ্রাস করলে যেমন জোস্না ম্লান হয়ে যায় তেমনি বড় হল রুমের অন্ধকার সোডিয়াম বাতিকে জাপটে ধরে ম্লান করে দিয়েছে। তবুও নিজস্ব আভাটুকু নিয়ে জেগে আছে। কিন্তু জেগে থাকতে পাচ্ছে না গোঙানিটা। নিস্তেজ হতে হতে দূরে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে যেন। দূরন্ত ট্রেনের হুইসেল দূরে যেতে যেতে যেমন মিলিয়ে যায় তেমনি ধীর লয়ে মিলিয়ে গেলো গোঙানিটা।
মুখে পানির ঝাপটা পেয়ে চোখ মিটমিট করতে করতে চোখ খোলার চেষ্টা করতেই অকস্মাৎ একটা ধাক্কা খেল। দুর্বল শরীর আর ততোধিক দুর্বল মনে নিয়ে চোখ খুলতে গিয়ে আলোর ধাক্কায় চোখের চারপাশে বলিরেখা ফুটে চোখ কুচকে গেল। কয়েক বারের চেষ্টায় আধোবোজা চোখে যা ভেসে উঠলো তাতে চোখ খোলার আগ্রহটাই মরে গেল। কপালে ভাঁজ নিয়ে বলি রেখা ভেসে উঠা, আগ্রাসী চোখ আর মুখে বেমানান উদ্দেশ্য প্রবণ কাঠিন্য নিয়ে নিঃশ্বাস দূরত্বে ঝুকে আছে লোকটি। চট করে চোখ বুজে এলো। প্রাণপণে চোখ খুলতে চাওয়ার মানসিক চেষ্টাটা ঠিক যে ভাবে জেগে উঠেছিল সে ভাবেই দমে গেল। ঝিম মেরে পড়ে রইলো সেহেরা বেগম। এই অভিজ্ঞতা যে প্রথম তা নয়, তবে নিপীড়নের তীব্রতার অভিজ্ঞতাটা একেবারেই প্রথম। মাদক দ্রব্য পাচারের অভিযোগে আগেও বার তিনেক গ্রেফতার হয়েছে সেহেরা বেগম। প্রতিবারই লিডারের লোক এসে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।