08 October 2016

শাহনেওয়াজ বিপ্লব




দুপুরে গোসল করতে গিয়েই কথাটা শুনে এসেছিল অরুণ। কথাটা বলেছিল দয়াল ঠাকুরের ছেলে রানা। ও আবার শুনে এসেছে প্রাইভেট পড়তে গিয়ে- টিউটোরিয়াল হোমে। গোসল করতে এসে, ও-ই রটিয়েছে ঘোষাল পুকুরের বাঁধানো ঘাটে। অরুণ শুনেছে ফিরতি মুখে যখন গোসল সেরে ফিরছিল। কথাটাতে প্রথমে তেমন গুরুত্ব দেয়নি কিন্তু বাড়ি ফিরে, বাবার মুখে আবার যখন শুনল, তখন মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। আবার দাঙ্গা।

গতকাল নাকি শীলবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কে বা কারা আগুন দিয়েছে তার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রামের নানা জায়গায় অগ্নিকান্ডের ফলে বহু মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত। ভারতে বাবরী মসজিদ ভেঙে দেয়ার পর কি গ্রাম, কি শহর সব স্থানেই থমথমে অবস্থা । কখন কী হয়- কখন কী হবে, কিছুই বলা যায় না।


ছোট্ট নদী হালদা। এপারে হিন্দুপ্রধান গ্রাম নতুনপাড়া। সব মিলিয়ে দুই হাজার লোকের বাস। বাজার বসে- নতুনপাড়া বাজার। নদীর ওপারে মুসলমান পাড়া। ওদের সংখ্যা হাজার বিশেক হবে। নদী পেরিয়েই উভয় গ্রামের যাতায়াত। পাশাপাশি খুশিগঞ্জের বাজার অনেক দূর- অনেক ঘুরপথও বটে। এতদিন পর্যন্ত উভয় গ্রামের সম্পর্ক ছিল-ভাই-ভাই। ছিল মধুর। আজ দাঙ্গার করাল গ্রাসে যেন কেমন ওলট-পালট হয়ে গেল।

নতুনপাড়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহিমবাবুর বাড়ি নদীর ওপারে। বড় মসজিদটি পেরিয়ে, একেবারে তালতলা গ্রামে ঢুকতেই। সাইকেলে মাত্র আধঘণ্টার পথ। বাবার মুখে কথাটা শুনে অরুণের বেশ ভয় ভয় করছিল। কারণ বাবা যাবেন আজই মহিমবাবুর বাড়ি। বুড়ো মানুষ। তাও আবার সাইকেল জানে না। দাদাও আজ সকালে চট্টগ্রাম শহরে গেছেন। আচ্ছা ও নিজে গেলে কেমন হয়? বাবা কি যেতে দিবেন- অরুণের মনে সংশয় জাগে।

বেলা তখন তিনটে। অরুণকে ডেকে ওর বাবা বলেন-খুব সাবধানে থেকো। দাদাও নেই। একা বাড়িঘর সামলে থাকবে। কারণ তুমি ছাড়া বাড়িতে সব মেয়েছেলে। কেউ ডাকলে না বুঝে দরজা খুলো না। সন্ধ্যার পর বাইরে বেরিও না। আমি এখনই মহিমবাবুর বাড়ি রওনা হচ্ছি। যাব আর আসব। বেশি দেরি হবে না।সাথে সাথে অরুণ বাবাকে অনুরোধ করে-আমি গেলে হয় না বাবা। যা বলতে হবে আমাকেই বলুন না। সাইকেলে যাব। মাত্র আধঘণ্টার পথ। সাথে সাথেই ফিরে আসব

-এ বড় গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাবা-তুমি ছোট মানুষ তোমার দ্বারা হবে না। তাছাড়া সাইকেলে যাওয়া যাবে না। হেঁটেই যেতে হবে। আমি শুনেছি আজ দাঙ্গা বাঁধতে পারে।

-আমাকে কেউ কিছু করবে না। তুমি দেখে নিও। তোমার কথা মতো আমি হেঁটেই যাব আর সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরব।-অরুণ কতকটা মরিয়া হয়েই জেদ ধরে।বিকাল চারটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ে অরুণ। পকেটে গুরুত্বপূর্ণ দরকারি চিঠি। সময়মতো পৌঁছাতে না পারলে হয়তো সর্বনাশ হয়ে যাবে। একে একে ওদের মহাজন পাড়া, রায়পাড়া, বোসপাড়া পেরিয়ে শেষে বড়দিঘির পাড়ে খেলার মাঠে একসময় এসে পড়ে সে। কয়েকটি ছেলে জমায়েত হয়েছে খেলার মাঠে। সংখ্যায় জনা-দশেক হবে। অরুণকে দেখে ওদেরই একজন বলে ওঠে,খেলবে নাকি অরুণদা? নারে, আমি আজ আর খেলব না, বলেই দ্রুত পা চালায় সে।

খেলার মাঠ পেরিয়ে ঘর কয়েক নাপিতের বাস। ওদের পাড়া পেরোনোর মুখে বিনয় দাস এসে বলে-কোথায় যাচ্ছ অরুণদা। একটা কথা শোননি। দাঙ্গা বাঁধবে বোধহয় আজ। তাই আমরা আজ কেউ বিকালে সেলুন খুলব না।

দ্রুত পায়ে একসময় অরুণ, চৌধুরী বাড়ির মাঠে এসে পড়ে। এই বিরাট মাঠ পার হলেই নদী পড়বে। মাঠ তো নয় যেন ধু-ধু মরুপ্রান্তর। যদিও দু-চারজন এপথে অন্যদিন যাতায়াত করে, আজ আর জনমানব নেই। কথাটা বোধহয় জানতে আর কারও বাকি নেই। একেই বলে হুজুগে বাঙালি। কথাটা মনে হতেই একটু হাসি পেল তার। পরক্ষণেই একটু ভয়ও পেয়ে যায় সে। কিছু একটা হবে নিশ্চয়ই,লোকজন তাই আগে থাকতেই সতর্ক। মানুষ আজকাল বেশ সাবধানী হয়ে গেছে। কেই বা কাঁচা প্রাণটা দিতে চায়? আর লাভই বা কী?

বেশ একটু ভয়ের সাথেই পথ চলছিল অরুণ। মাঠ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সূর্যদেব পাটে বসেছেন। এই অস্তমিত সূর্যের রক্তরাগ দেখতে ওর খুব ভালো লাগে। পশ্চিম দিগন্তে কে যেন আবির ঢেলে দিয়েছে। দুহাত তুলে অস্তমিত সূর্যকে প্রণাম করে সে। মাঠ পার হয়ে নদীর কাছাকাছি এসে পড়েছে।
শীতের দিনের বিকেল বোধহয় একটু তাড়াতাড়ি শেষ হয়। শীতও আজ একটু বেশি। সন্ধ্যা প্রায় আসন্ন। একদল পাখি আকাশের বুকে ডানার শব্দ তুলে চলেছে তাদের বাসায়। শীতের মরা নদীতে, পারাপারে বেশি বেগ পেতে হয় না অরুণকে। এই নদী পেরোনোর মুখেই দেখা হয় আনোয়ারের সাথে। প্লাস্টিকের জিনিসপত্র বিক্রি করে সংসার চালায় সে। লোকে বলে, আনোয়ার হোসেন দিনে জিনিস বিক্রি করে আর রাত্রে চুরি করে বেড়ায়। অরুণ এসব বিশ্বাস করে না। আনোয়ার অরুণকে দেখে অবাক হয়ে বলে- আজকের দিনে কেন বের হলে অরুণ।আর কোথায় বা যাচ্ছ এসময়? আজ দাঙ্গা বাঁধবে কিনতু। সামান্য কারণ থেকে কী যে হয়ে গেল! তা তুমি কোথায় যাবে বাবা। অরুণ উত্তর দেয়,হেডমাস্টার মহিমবাবুর বাড়ি। আনোয়ার সাথে সাথে জানায়,আজ আর গিয়ে কাজ নাই। ফিরে যাও তুমি আমি বরং তোমাকে খানিকটা এগিয়ে দিয়ে আসছি।

কিন্তু কাকা আর বোধহয় ফেরা যাবে না।দেখছো না দূরে মানুষের কোলাহল।আনোয়ার ভয়ে বিবর্ণ হয়ে যায়। তাহলে কী হবে অরুণ? তুমি বরং এক কাজ কর,এই নদীর ধার ঘেঁষে ঘুরপথে খুশিগঞ্জের বাজার হয়ে চলে যাও।কেউ দেখতে পাবে না।ঐ আমার বাড়ি দেখা যাচ্ছে কিন্তু তোমাকে তো ঠাঁই দিতে পারব না বাবা। জানলে তোমার বিপদ হয়ে যাবে।হয়ত জানটাই চলে যাবে। তুমি তাড়াতাড়ি চলে যাও বাবা। আল্লাহ তোমায় রক্ষা করুন।

নদীর পাড় ধরে সরু রাস্তা দিয়ে জোরে পা চালিয়ে যেতে থাকে অরুণ। এদিকে খুব একটা কেউ আসে না। মনে পড়ে, সে একবার খুব ছোটবেলায় ওর বন্ধুর সাথে পথ হারিয়ে এখানে এসে পড়েছিল,পরে অনেক কষ্টে বাড়ি ফিরেছিল। হঠাৎ দূরে আরও প্রচন্ড জন-কোলাহল শোনা যায়।ভীষণ ভয় পেয়ে যায় সে। উঁচু পাড়, দেখা যায় না কিছুই তবু বোঝা যাচ্ছে, বেশ ভালো লোকই জমেছে। তাড়াতাড়ি পা চালায়। হাতের টর্চটাও জ্বালাতে ভুলে যায়। কোন পথে যাচ্ছে তা বুঝতে পারে না সে। রাত কত হয়েছে তাও না। শেষে পিচঢালা রাস্তায় এসে পড়ে মনে জোর পায় সে। ঐ তো আলো দেখা যাচ্ছে। বোধহয় খুশিগঞ্জের বাজারে এসে পড়েছে সে। এখানে ওদের গ্রামের চেনা-জানা লোকের দোকান আছে। ফিরতি পথে ওদের সঙ্গে গেলেই হবে। মনে সাহস পায় অরুণ। জরুরি চিঠিটাও এই ফাঁকে একবার দেখে নেয়।

বড় রাস্তায় উঠে অরুণ টের পেল হয়তো কোন ভীষণ ঘটনা ঘটেছে কোথাও। বাজার একদম জনহীন-থমথমে। কোথাও কোন লোকজন নাই। দোকানপাট বন্ধ। কোথায় যাবে, কী করবে তা ঠিক করার আগেই, ও টের পায় একদল লোক হাতে অস্ত্র নিয়ে চিৎকার করতে করতে ছুটে আসছে ওরই দিকে। খুব বেশি দূরে ওরা নয়। তাই চিন্তার অবকাশ না দিয়েই দিক-বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে চলে অরুণ। কোন দিকে যাচ্ছে তা সে নিজেই জানে না। হঠাৎ একসময় একটা মস্ত বড় বাড়ির সামনে এসে পড়ে। এটা কোন জায়গা, কার বাড়ি- সে কিছুই বুঝতে পারে না। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে জোরে ধাক্কা দেয় দরজায়। প্রায় সাথে সাথেই এক বৃদ্ধা কোন কিছু জিজ্ঞাসা না করেই দরজা খুলে দেয়। ভেতরে ঢুকে অরুণ অবাক হয়। একী, এ কোথায় এসেছে সে!

হতচকিত অরুণকে বৃদ্ধা সস্নেহে বলেন, আমার সঙ্গে তাড়াতাড়ি চলে এসো বাবা। কোন ভয় নেই তোমার। বাড়ির ছাদ থেকে আমি সবই দেখেছি। তোমার পিছনে তেড়ে আসা লোকগুলো তোমায় দেখতে না পেয়ে হয়তো ফিরে গেছে, নয়তো অন্য কোথাও খোঁজাখুঁজি করছে। কোথায় বাড়ি তোমার। আর নামই বা কী? আমার নাম অরুণ-বলতে বলতে প্রায় যন্ত্রচালিতের মতো বৃদ্ধাকে অনুসরণ করে তিন-তলার একটি ছোট ঘরে চলে আসে অরুণ।

বৃদ্ধা বলেন-এ কোথায় এসেছ তুমি জান? মনে হচ্ছে ঘুর পথে আমি বাদশা মিয়ার পাড়ায় চলে এসেছি-ভয়ার্ত গলায় অরুণ বলে।
তোমার অনুমান ঠিকই।বলতে গেলে তুমি প্রায় শত্রু-পুরীতেই এসে পড়েছ। তবে তোমার কোন ভয় নেই।আজকের রাতটা এখানেই থাকো। কেউ জানতে পারবে না। কাল ভোরেই-লোকজন জাগার আগেই চলে যেও। তোমার কোন ক্ষতি আমি হতে দেব না। চুপ করে এ-ঘরের মধ্যে বসে থাক, আমি একটা আলো নিয়ে আসি। তবে আজকের দিনে বেরিয়ে তুমি ভালো করনি।

বৃদ্ধা নীচে নামতে গিয়ে আবার ফিরে এসে অরুণকে জিজ্ঞাসা করেন- আচ্ছা,তোমার বাড়ি কোথায় বললে না-তো?
নতুনপাড়ার বীরেণ মুখার্জীর ছেলে আমি, নাম অরুণ। আমার বাবা কলেজে পড়ান।
তোমার বাড়ি কি সুবিমলদের কাছেই।
হ্যাঁ,আমাদের বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেকের পথ।
সে,কেমন আছে জান?
সে আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ।-আস্তে আস্তে বলে অরুণ।

কেন এমন হল বলতে পার বাবা। আগে তো এমন ছিল না। দু-সম্প্রদায়ের মধ্যে বেশ সদ্ভাবই ছিল। আগের দিন আর নাই- তাও জানি। এতগুলো কথা বলে বৃদ্ধা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। সে এক দিন গেছে,-হিন্দু-মুসলমান তখন ভাই ভাই।বিরোধ তো ছিলই না। বরং ছিল বেশ সদ্ভাব। আর ছিল আত্মীয়তার মধুর সম্পর্ক। তাহমিনা আমার মেয়ে, বোসবাড়ির মেয়ে সুধা তার বান্ধবী। আজও বেশ সুসম্পর্ক আছে দু-জনার মধ্যে। চিঠি-পত্রও নাকি আদান-প্রদান হয়। দু-বছর আগে তাহমিনা যখন ঘরে এল ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে, প্রথমেই দেখা করতে গিয়েছিল ওর বান্ধবী সুধার বাড়িতে। জাতের বিচার তখন তো ছিল না এতটা। নদী পেরিয়ে তোমাদের ওখানেই বাজার-হাট আমাদের। আর ঐ একই স্কুলে পড়াশুনা। কিন্তু কলহ, কাজিয়া তখন ছিলই না। দাঙ্গা-হাঙ্গামার কথা ছেড়ে দাও। থাক ওসব কথা। বুড়ো হয়েছি, কথা আরম্ভ হলে আর থামতে পারি না। মনে হয় অন্তর উজাড় করে সব কথা একসঙ্গে বলে ফেলি। তা কোথায় যাচ্ছিলে বাবা?
আজ্ঞে, তালতলায় মহিমবাবুর বাড়ি।
হেডমাস্টারের বাড়ি।কিন্তু তোমার তো জানা উচিত ছিল একটা ভীষণ কিছু ঘটবে। এরকম দিনে কেউ কি বের হয় বাবা। ওরা পেলে তো তোমায় আস্ত রাখত না। কেটে টুকরো করে দিত। -শান্ত অথচ ধীর কণ্ঠে বলেন বৃদ্ধা। মহিমবাবুর বাড়িতে একটা জরুরি চিঠি পৌঁছানোর দরকার ছিল রাত্রের মধ্যেই। বাবা যেতেন। তিনি বৃদ্ধ। প্রায় জোর করে তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেই এসেছি আমি।

ভয় নেই,এদিকে এত রাত্রে কেউ আসবে না। তুমি আজ ভুল করে আমার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছ, এসবই তো খোদার ইচ্ছা। তিনি দয়াময়, মন্দ কিছু তোমার হবে না।
রাত কটা হবে বুঝতে পারে না অরুণ। কারণ হাত ঘড়িটার অস্তিত্ব সে ভুলে গেছে। বসে থাকতে থাকতে হাজারো চিন্তা তার মনে ভিড় করে আসে। মনে পড়ে বৃদ্ধ বাবার কথা, দাঙ্গা হবে জেনেও কেন এল সে, পথের বিপদের কথা, সর্বোপরি এই মমতাময়ী বৃদ্ধার কথা। যতই ভাবে ততই অবাক হয়ে যায়,-কী ভাবে সে প্রাণে বাঁচল। এভাবে চিন্তা করতে করতে একটু তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল সে। এমন সময় বৃদ্ধার ডাকে সে সজাগ হয়ে ওঠে।

ঘুমিয়ে পড়লে নাকি বাবা। আলোটা নিয়ে এলাম। সকলের অগোচরে আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। তুমি ব্রাহ্মণের ছেলে তোমাকে তো কিছু খেতে দিতে পারি না। বুঝতে পারছি ক্ষিদেও তোমার পেয়েছে। বুঝলে বাবা, মায়েরা সব বুঝতে পারে। তাই এই দুধটুকু নিয়ে এলাম। ভয় পেয়ো না। এটা কেউ সন্দেহ করবে না। বৌমা এটা আমার জন্য দিয়েছে। নাও বাবা খেয়ে নাও। হ্যাঁ, এই কম্বলটা পেতে নাও, আর এটা গায়ে জড়িয়ে নাও। খুব ভোরে এসে তোমায় তুলে দিয়ে যাব। কষ্ট করে আজকের রাতটা কাটিয়ে দাও। নীচে নিয়ে যেতে পারব না তোমায়, তাতে তোমার ক্ষতি হয়ে যাবে। দোষ তো তোমার নয়-কিন্তু তুমি যে হিন্দু।
বাবা, আমার বয়স হয়েছে অনেক। আমি পরাধীন দেশ দেখেছি, পাকিস্তানী হানাদারদের অত্যাচার দেখেছি, দেখেছি যুদ্ধ,আর সে যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুও দেখেছি। তাই এই দাঙ্গা, মারামারি, কাজিয়াতে আমি ভীষণ ভয় পাই। ভাবি দু-পক্ষে কখন মিটমাট হবে। আবার শান্তি নামবে। সকলের মুখে হাসি ফুটবে। খোদার কাছে দিনরাত এই মানত করি বাবা। -শুধু শান্তি-শুধু শান্তি, হিংসা নয়। তুমি শুয়ে পড় বাবা। আমি দরজায় তালা দিয়ে দিচ্ছি। তোমার কোন ভয় নেই, তোমার কথা কেউ জানতে পারবে না। তুমি নিশ্চিন্তে একটু ঘুমিয়ে নাও।

অরুণ বোধহয় একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ প্রচন্ড কোলাহলে ওর ঘুম ভেঙে গেল। তবে কি সে ধরা পড়ে গেছে, তাই এই উল্লাস। কিছুক্ষণ স্তম্ভিতের মতো পড়ে থাকে। এরপর বুঝতে পারে দাঙ্গাকারী দল সাহাপাড়া পুড়িয়েছে, কায়স্থ-পাড়া পুড়িয়েছে, কয়েকটি কাপড়ের দোকানেও আগুন দিয়েছে, তাই তাদের এই জয়োল্লাস। পাশাপাশি শুনতে পায় ঐ হিন্দু ছোকরাকে না ধরতে পারার আফসোস। ওদের মধ্যে কে একজন বলে উঠল-শালা পালাবে কোথায়, এই পাড়াতেই কোথাও লুকিয়ে রয়েছে।” তারপর আবার একবার বিকট জয়ধ্বনি করে সব নীরব হয়ে যায়। সেই বৃদ্ধার মতো অরুণেরও প্রশ্ন জাগে-এই হিংসার আগুন কবে নিভবে, কবে আসবে সুন্দর শান্তি?

ভোর হতে আর দেরি নেই বোধহয়। ছোট্ট জানালা দিয়ে অরুণ, রাত্রির নিস্তব্ধ রূপকে একবার দেখে নেয়। চারিদিকে সব চুপচাপ, হৈ-হল্লা আর নেই। মহিমবাবুর বাড়ির পথ হারিয়ে অরুণ এসে পড়েছে বাদশা মিঞার পাড়ায়-ভাবতে অবাক লাগে তার। কি সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল এই ছোট রাতটুকুতে। ঈশ্বরের অপার করুণা না থাকলে সে কি আজ রক্ষা পেত। হাতজোড় করে ভগবানের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাতে গিয়ে তার মন বলে ওঠে, খোদা তোমার মেহেরবানি

দুর্যোগের রাত বোধহয় শেষ হল। ভোর হয়ে এসেছে। ভোরের বাতাসে শরীরটা যেন জুড়িয়ে যাচ্ছে। দরজাটা ভেজানো ছিল। বুড়িমা বোধহয় আগেই খুলে দিয়ে গেছেন। আস্তে আস্তে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে অরুণ। দেখে, বৃদ্ধা দরজার পাশে বসে একমনে তসবি জপছেন। অরুণকে দেখেই বলে ওঠেন, উঠে পড়েছ বাবা। আমি এক্ষুনি তোমায় তুলে দিতাম। এবার তোমাকে যেতে হবে। পিছনের সরু সিঁড়ি দিয়ে নেমে বাগানের পায়ে চলা পথ ধরে বাড়ি চলে যাও বাবা। কাল সারারাত এখানে-ওখানে হামলা হয়েছে। তাই আমি ঘুমোতে পারিনি। তোমার দুয়ার আগলে বসে আল্লার দোয়া ভিক্ষা করছিলাম বাবা। হ্যাঁ, এবার তুমি এসো। খোদাতালা তোমার মঙ্গল করুন। আর একটা কথা বাবা-এই রাত্রির কথাটা কারো কাছে প্রকাশ করো না। এটা বাবু মিঞার বাড়ি। আর আমি বাবুর মা।

ধীরে ধীরে নেমে আসে অরুণ। ভাবে, ছেলে বাবু হিন্দুর রক্তে হাত রাঙাচ্ছে আর তারই মা জগদ্ধাত্রীর মতো এক হিন্দু ছেলের প্রাণরক্ষা করছে। নিজের অজান্তেই তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে ঐ মমতাময়ী নারীর প্রতি। ইচ্ছে হয় মা বলে কাছে ছুটে যাই। গিয়ে বলি, তুমিই তো আমার জীবনদাত্রী মা। তুমি তো জাতধর্মের ঊর্ধ্বে।

পুবদিকে সূর্য তখন আস্তে আস্তে চোখ মেলছেন। সারা পৃথিবী যেন এখনও ঘুমিয়ে আছে গভীর আরামে। দুর্যোগের রাত্রির যেন অবসান হয়েছে। বাগান পেরিয়ে মেইন রোডে ওঠার মুখে অরুণ পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে, থমকে দাঁড়িয়ে যায়। মমতাময়ী করুণার মতো বৃদ্ধা তখনও দাঁড়িয়ে আছেন-ওরই পথের দিকে তাকিয়ে-তুষারে ঢাকা হিমালয়ের মতো শান্তির বার্তা নিয়ে। ঐ চির শাশ্বত জননীর উদ্দেশ্যে হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে আবার দ্রুত পা চালায় সে।


 ________________________

No comments:

Post a Comment