25 May 2017

জাকিয়া জেসমিন যূথী




ছুনা হে ছুনা হে, ইয়ে রস্মে বাফা , যো দিল পে নেশা হে, যো পেহেলি দাফা হেগুন গুন করতে করতে পথে নামলামবাসার গেট থেকে মাথা বের করতেই রিকশা নজরে এলোরিকশা ভাড়া পাঁচ টাকা কমিয়ে ঝটপট উঠে বসতেই সে বলে, “পিছন দিয়া যাওয়া যাইবো?”
বাহ রে! পিছন দিয়া কেম্নে যাবেন? চিনেন না তাতেই আবার ভাড়া বেশি চানসামনে দিয়ে যানবলে বেশ একটা মিষ্টি ঝাড়ি দিলাম
এরপরে সে আর কথা বাড়ালো নাকিন্তু, যতই চাইছি এটা এখন পঙ্খিরাজ ঘোড়ার বেগে ছুটুককিন্তু কিসের কী? মনে হচ্ছে ঠেলাগাড়িতে উঠেছি
 প্রথম গলি না পেরোতেই ছোট ছোট কণা ঝরতে শুরু করছেআমি ভিজছি নাকিন্তু সামনে যে গাড়িগুলো আছে সেগুলো দেখছি ভিজছেচকিতে ভাবলাম, এই এক হাত দূরত্বের মধ্যেও এক জায়গায় বৃষ্টি আছে, আরেক জায়গায় নেই! তাজ্জব ব্যাপার তো!
রিকশাওয়ালাকে ইতোমধ্যেই জিজ্ঞেস করে ফেলেছি, পলিথিন আছে কিনাদ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করতেই বললো, “আমি তো উঠায় দেখি নাই!”
মোর জ্বালা! উঠায় দেখি নাই মানে কী? রিকশা টা কি আরেকজনের?” তাকে ঝাড়তে গিয়ে গানের লিড়িক্স ভুলে গেলাম
একে তো ঠ্যালাগাড়ি চলছে তার উপরে তার গন্তব্য চেনা নেইতাকে চিনিয়ে নিয়ে যেতে যেতে ভাবছি, ব্যাগের সব ভিজে গেলেই মরেছি
যা হোক, কয়েক মিনিট বাদে গন্তব্যে পৌঁছে যাবো যাবো এর মধ্যে পাশাপাশি দুটি গাড়ির প্যাঁচ লেগে গেলোএ পাশে থেকে যাবে মাইক্রো, আর ওপাশ থেকে আসছে প্রাইভেট কারদুজনেই এই মোটামুটি চওড়া রাস্তায় একসাথে পাশাপাশি চলতে চাইছেযাও বা দুজনের প্যাঁচটা মিটলো, আমার ঠ্যালাগাড়ির যেন চাকায় আঠা গজিয়েছেচলেই নামিনিট দুয়েক পরে নামলাম রিকশা থেকে
নেমেই দেখি সব ফার্মেসিএবার আমি নিজেই গন্তব্য চিনতে পারছিনাতা বেশ!” ভেংচিয়ে উঠলাম আনমনেই
.
দোদুল্যমান মনে সামনে এগোতেই চোখে পরলো ফটোষ্ট্যাট, স্ক্যান লেখা দোকানের শাটারযাক, পেলাম!” স্বস্তি ঝরলো এক মুহুর্তে
কিন্তু হেঁটে এগোতে পারছি না মোটেই-দশ বছরের এক অটিস্টিক ছেলেকে কাঁধে করে খুব সম্ভব তার বাবাই হবে, হাঁটছে ঠিক আমার এক পা সামনেইবাবা টা হাঁটা থামিয়ে দিলেই বাচ্চা ছেলেটার মুখে গিয়ে গুতো খাওয়ার সম্ভাবনাএর মধ্যে বৃষ্টির তোড় বেড়েছেআমি ফুটপাত ধরে হাঁটছি কিন্তু দোকানের কার্নিশ পাচ্ছিনা যাতে উঠে গেলে বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচবোহঠাত চোখে পরল আতিফ আসলাম দাঁড়িয়ে, এতক্ষণ যার গান গুন গুন করছিলাম, সে আমার সামনে? আল্লাহ গো! ঠিক যে দোকানে আমি যাব তার আগেরটায়সময় যেন থমকে গেলবৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে আমায় সে খবর নেই একদমইইক ও নেজার, ইক ও নিগাহ, রুহো মে শামিল ইশ তারাহ...” -“ম্যাম, কী করাবেন?”
হ্যাঁ?” অপ্রস্তুত আমি পেন ড্রাইভ খুঁজতে কাঁধে ঝুলানো ভেনিটি ব্যাগে ত্রস্ত হাত লাগালামদেখিয়ে দিলাম কী করাতে চাইকাজ হয়ে গেলো প্রায় দুমিনিটে
 
বের হবার মুখে ঝুম বৃষ্টিবাসায় ফিরবো না এখানেই দাঁড়িয়ে থেকে বৃষ্টি থামবার অপেক্ষা করবো? ভাবছিলাম দাঁড়িয়ে থেকেএর মধ্যেই দেখি, একটা রিকশা ঘুরে আমার কাছাকাছি আসতে লেগেছেযদিও দুজনার মাঝের দূরত্বটা ফুটপাথ দখল করেছেতবু মনে হলো, এটা আমারই জন্যে আসছেঅবাক হলেও খুশী হচ্ছিলামরিকশায় পলিথিন মোড়ানোউঠে বসতে যেতেই দেখি, যাত্রী বসেকী আশ্চর্য ! এ যে সেই আতিফ আসলাম!
ম্যাম, আপনি তো থানার পেছনে যাবেন? আমিও যাচ্ছি উঠে বসুন
আমিও কেমন আহাম্মকের মত উঠে বসলাম পাশেএই প্রথম দেখলাম তাকেকোন সংকোচ নেই আমার মধ্যেও
রিকশাটা যেন উড়ে চলে এলো বাড়ির কাছাকাছিআমার বাসা আরও দুটো বাড়ি পরেএর মধ্যেই সে ভাড়া দিয়ে বৃষ্টির ছাট মাথায় গায়ে মেখেই নেমে পরলোনামবার ঠিক আগে বলে গেলো, “ইফতেখারদেখা হবে!”
.
হতভম্ব হয়ে ভাবছি, ভদ্রলোক সেই বাসাটাতেই তো নামলো যে বাড়ির ভদ্রমহিলা তার মেয়েকে সাথে করে আমাকে গেল শুক্রবারে দেখে গেছেকিন্তু তার ছেলের তো এখন নিউইয়র্কে থাকার কথাসে দেশে এসেছে এমনটা তো বলেনি সেদিনবিষয়টা বোধগম্য হতেই সম্পূর্ণ অবয়বে অন্যরকম অচেনা শিরশিরে এক আনন্দ অনুভব ছড়িয়ে পরলো আমার
.
(সমাপ্ত)

No comments:

Post a Comment