25 October 2015

আরিফুন নেছা সুখী


ই মজনু পইড়া যাবি তো, ঘাটের কোলে যাসনা বাপ।
মায়ের ডাকের কোন সাড়া দেয়া তো দূরের কথা। চৌদ্দ বছরের কিশোর মজনু মায়ের কথা কানেই তোলে না । নদীর ঘাটের কিনার ধরে দৌড়ায় আর দৌড়ায়। মা দেখে ছেলে তার চোখের আড়াল হয়ে যায়। তাই সে আপন মনে একাই বাড়ি ফেরে। ওদিকে মজনু সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে মেতেছে বৈকালী আড্ডায়। সঙ্গে আছে ক্রিকেট খেলার সরঞ্জাম, কিন্তু খেলার দিকে মন না দিয়ে আড্ডাতেই মাতে বেশি। এই আড্ডা ওদের প্রতিদিনের রুটিন। আড্ডা না দিলে যেন পেটের ভাত হজম হয় না।

প্রতিদিনের মতো সেদিন ও আড্ডায় বসেছিল ওরা। নানান কথার ফাঁকে এক সময় ওদের মধ্য থেকে আক্কাস বলে দেখ দেখ নদীর মধ্যে কী যেন একটা ভেসে যাচ্ছে। সৌরভের কথায় মনোযোগ দেয় সবাই। সূর্যটা কখনই পাটে বসেছে। সন্ধ্যা নেমেছে ঘণ্টা খানিক। প্রায় জনশূন্য ঘাটে ওরা ছয় বন্ধু। দূরে কাউকে কাউকে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে মাঝেমাঝে। আলো আঁধারির খেলায় আক্কাসের দেখানো জিনিসটা কী তা ভালোমতো বোঝা যাচ্ছে না। তবুও ছয় বন্ধু ভালো করে দেখার চেষ্টা করে। অনেকটা উবু হয়েই নদী গর্ভে চোখ রাখে তারা। ছয় কিশোরের বারটা চোখ উসুক হয়ে ভাবছে কি ঐ জিনিসটা। এমন সময় হঠা হুস শব্দে কেউ একজন দেখতে পাওয়া জিনিসটা মাথায় করে ভেসে ওঠে। ওরা  ভয় পেয়ে পেছনে সরে আসে। কিন্তু ভয় পেয়ে দূরে সরে থাকার পাত্র নয় তারা। আবার এগিয়ে আসে লোকটার কাছে। ভালো করে নিরিখ করে দেখে বলে ওঠে আরে, আনার ভাই না!
আনার ভাই নামক ব্যক্তিটা মুখে হাত দিয়ে বলে চুপ চুপ। তারপর ওদের ছয় জনকে হেঁচকা টান দিয়ে নিয়ে যায় বাঁধের আড়ালে। সেখানে নিয়ে গিয়ে বলে শোন তোরা যে আমাকে নদীতে ভেসে আসতে দেখেছিস এই কথা কখনও কাউকে বলবি না। মাঝখান থেকে রফিকুল বললো কেন আনার ভাই, বললে কী হবে? আর ওর মধ্যে কী আছে? শাহীন বললো বলতে না করছে বলবি না, এতোকথা বলিস কেন। আনার বললো কাল বিকেলে জিগাতলার মাঠে আসিস তোদেরকে সব বলবো, কিন্তু যা বলবো গোপন রাখবি কিন্তু। সবাই একসঙ্গে বললো ঠিক আছে।

তারপর যে যার বাড়ি চলে গেল। কিন্তু বাড়ি ফিরে কেউ স্থির রাত কাটাতে পারলো না। ভাবছে রাতটা কখন শেষ হবে, তারপর সকাল, দুপুর পার হয়ে বিকেল। এই করে ভেবে ভেবে কোনরকম রাতটা পার করলো তারা। সকালে উঠে কোনরকম নাস্তাটা সেরে স্কুলে চলে এলো। স্কুলে এসেও ছয় বন্ধুর একই আলাপন। মনোযোগ আর অমনোযোগের মাঝামাঝিতে ক্লাসগুলো পার হলো। টিফিন পিরিয়ড ও পার করলো কোনরকম । বাড়ি ফিরে একটু খেয়ে ছুটলো জিগাতলার মাঠে। সবার আগে এলো আক্কাস। তার আর তর সইছে না। কি বলবে আনার ভাই। ওর পরপরই এলো রফিকুল, পরে একে একে মজনু, শাহীন, জুয়েল আর আফাজ। সবাই গোল হয়ে বসে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে সেই আনার ভাইয়ের জন্য। কিন্তু তার আসার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। ভাবে সে আসবে তো! আক্কাস বলে সে তো অবশ্যই আসবে।

এমন সময় দূরে কাউকে হেঁটে আসতে দেখে ওরা আশ্বস্ত হলো। তার মানে অবশেষে এলো আনার ভাই। ওরা সবাই দাঁড়িয়ে বললো কি ভাই দেরি হলো যে? আনার জামার ভেতর থেকে একটা কী যেন বের করলো। সেটা দেখে মজনু বললো এটা তো সেই রাতের বালিশটা। এখন চিপসাই গেছে কেন। আনার বললো এটা হাওয়ার বালিশ। পাম্প দিলে আবার ফুলে যাবে। বলেই বালিশটাকে ফুঁ দিয়ে ফোলাতে লাগলো আনার। ওরা তো রীতিমতো হা হয়ে গেল। তারপর সবাই গোল হয়ে বসে। আনার বলা শুরু করলো তোরা তো জানিসই আমার বাড়ির কথা। আমি কোন কাজ রেখে কোন কাজ করবো। বাবা মা আর ছোট ভাই তাদেরকে তো দেখতে হবে। বড় ভাইয়েরা আলাদা হয়ে গেছে সেই কবে। সারাদিন মাঠে কাজ করে আর চলে না। তাই সন্ধ্যার পর নদী পার হয়ে ওপার থেকে মাল এনে এপারে বিক্রি করি। এ থেকে কিছু উপরি আয় হয়। শাহীন বলল নদী কিভাবে পার হও আনার ভাই।

আনার বলে এই যে হাওয়ার বালিশ। এটা ধরে ধরেই নদী পার হয়। কিন্তু কি করবো বল। আমার খুব খারাপ লাগে এই ব্লাকের কাজ করতে। সবাই চমকে ওঠে একে ওপরের দিকে তাকায়। মজনু বলে তুমি ব্লাক করো আনার ভাই। শুনেছি এটাতো খারাপ কাজ। আনার বলেআমিও জানি এটা খারাপ, কিন্তু আমি কোন খারাপ মাল আনি না। এই টুকটাক জিনিসপত্র  চুল কাল করা তেল, স্নো, পাউডার, শাড়ি, টর্চলাইট এইসব। অনেকে ফেনসিডিল, হেরোইন এইসব আনে।শাহীন বলে তুমি তো বিপদে পড়ে যাবে আনার ভাই। সবাই ভাববে তুমিও ওদের মতো খারাপ মাল আনো। আনার বলে তাইতো আমি ওদের সাথে যায়না। একা একা যাওয়া আসা করি। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ জানান দিচ্ছে সন্ধ্যা পার হয়েছে অনেকক্ষণ। মজনু বলে বাড়ি ফিরতে হবে রে। মা বকা দেবে। সবাই বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দিল। কিন্তু আনার এগিয়ে যায় নদীর দিকে। যাবার আগে বালিশের হাওয়া বের করে আবার ঢুকিয়ে নেয় জামার ভেতর । তারপর হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলো নদীর কাছে।

চারদিক শুনশান নীরবতা। নদীর পানিতে এসে পড়েছে পূর্ণিমার গোল চাঁদ। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে নদীর পানি। বাঁধের ওপর দিয়ে বাড়ি ফিরছে কেউ কেউ। আনার একা এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে পদ্মা নদীর তীরে। কি করবে সে। নানান ভাবনা তার মাথায় জট পাকাচ্ছে। নদীতে নেমে গেলে এতক্ষণ প্রায় অর্ধেক চলে যেত। কিন্তু আজ মনটা মোটেই সাঁয় দিচ্ছে না নদীতে নামতে। কিন্তু  নামতে তাকে হবেই। গতকাল বাড়ি ফেরার পর অসুস্থ বাবা বলেছে ওষুধ শ্যাষ হইয়া গেছে বাপ...।
বারবার কানে ধাক্কা দেয় বাবার বলা কথাটা। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না আনার। হু হু কান্নায় ভেঙে পড়ে। বালির ওপর বসে পড়ে ধুপ করে। বসে পড়তেই পকেট থেকে পড়ে ছোট্ট একটা কৌটা। কৌটাটা দেখেই মনে পড়ে শরিফার কথা। পাশের গ্রামের শরিফাকে সে মন দিয়েছে বছর চারেক। শরিফার কথা ভাবতে ভাবতে বালির ওপর পড়ে যাওয়া স্নোর কৌটাটা তুলে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে আনার। ভাবে আজকে শরিফার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু মজনুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে রাত হয়ে যাওয়ায় দেখা করা হযনি আর। এখন বেশ রাত। ওপারে গিয়ে আবার ফেরত আসতে হবে। কিন্তু শরিফার সঙ্গে দেখা না করে যেতে মন সায় দিচ্ছে না কিছুতেই। কোনকিছু না ভেবে জোরে জোরে পা ফেলে আনার আগায় শরিফার বাড়ির দিকে। হাওয়া বের করে বালিশটা জামার মধ্যে ঢুকিয়ে জোর  কদমে এগিয়ে চলে। যেতে যেতে ভাবে শরিফা জেগে আছে তো! আর যদি জেগে না থাকে তাহলে যাওয়াটা অন্তঃসারশূন্য হয়ে যাবে। কিন্তু তারপরে ও জোরে খুব জোরে হেঁটে চলে আনার। মেঠোপথের আল ধরে পার হয় একটা শেয়াল। চমকে ওঠে আনার। তারপরও পায়ের গতি থামায় না একটুও। সায় সায় হেঁটে চলে...।

শরিফার বাড়ির কাছে আসতেই দেখে বাড়িটা অন্ধকার। তবে ভেতরে আবছা আলো দেখা যাচ্ছে। আর পূর্ণিমার চাঁদের আলো টিনের চালে পড়ায় অন্ধকারটা অতটা বোঝা যাচ্ছে না। শরিফার শোবার ঘরের জানালায় এসে শব্দ করার আগেই জানালা খোলে শরিফা। অবাক হয়ে আনার বলে তুমি জানতা আমি আসবো? শরিফা বলে জানতাম না, তয় মনডা কয়তাছিল কেউ বুজিন আসবো। তা এত রাতে তুমি বাইর হইছো যে! আনার বলে তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল। বলেই জানালার শিক গলিয়ে দুই হাত দিয়ে শরিফার মুখমণ্ডল তালুবন্দী করে। ভরা চাঁদের আলো এসে পড়ে শরিফার মুখে। চাঁদের আলোয় শ্যামাঙ্গী শরিফা হয়ে ওঠে অপরূপা। আবেগে দুচোখ বন্ধ করে অনুভব করে আনারের ছোঁয়া। আনার মন ভরে দেখে শরিফাকে। তারপর বুক পকেট থেকে স্নোর কৌটাটা হাতে দিয়েই পা বাড়ায় নদীর পথে। জানালা দিয়ে অপলক তাকিয়েই থাকে শরিফা। আনার আর পেছন ফিরে তাকায় না। তার ভাবনা ওই পূর্ণিমার চাঁদের মতো মুখটা তার একান্ত নিজের করে চাই। আর লুকোচুরি নয়। এবার তাকে ঘরে তোলার পালা। তাই এবার বড় একটা দাও মারতেই হবে। তারপর হলদি বাটো মেন্দি বাটো। বিয়ের সানাই বাজিয়ে শরিফাকে ঘরে তুলবে। বিয়ের পর আর ব্লাক করবে না আনার। ছোট একটা দোকান দিয়ে টুকটাক ব্যবসা করবে। নানা কথা ভাবতে ভাবতে নদীর কাছে এসে পৌছায় আনার। আবার ফুঁ দেয় বালিশে । নদী তাকে ডাকছে। তাকে নামতে হবে নদীর বুকে, সব প্রস্তুতি শেষ। নদীতে নামতে যাবে আনার এমন সময় ঘাড়ের ওপর একটা বলিষ্ঠ হাতের ছোঁয়ায় চমকে ওঠে সে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ব্লাকের সর্দার আফতাব খাঁ। যে বারবার তাকে ফেনসিডিল নিয়ে আসার পরামর্শ দেয়। লোভ দেখায় নানা রকম। লাল নীল ফানুস ওড়ায় তার চোখের সামনে। কিন্তু আনার সে কথা কানেই তুলে না। অথচ আজ স্বপ্নভুক আনার অবলীলায় মেনে নেয় ব্লাকের সর্দার আফতাব খাঁর  কথা।
চোখে রঙিন স্বপ্নের ঘোর তাকে আজ লোভী করে তোলে। তাই আফতাব খাঁর দলের হয়ে কাজ করতে অনায়াসে রাজী হয়ে যায় সে।
সারারাত সাঁতার দিয়ে ওপারে গিয়ে নানারকম জিনিসপত্র নিয়ে এপারে আসে। এপারেরটা ওপারে নেয়। এই ওদের কাজ। আস্তে আস্তে বেশ উন্নতি হয় আনারের। সত্যি সত্যি বিয়ের বাদ্যি বাজিয়ে বিয়ে করে ঘরে আনে শরিফাকে।
কিন্তু হঠা একদিন আনারের খোঁজ পাওয়া যায় না। আফতাব খাঁর সাঙ্গ-পাঙ্গরা ও লাপাত্তা।  শরিফার হাতের মেহেদীর রঙ এখনো জানান দিচ্ছে সদ্য ফুলসজ্জা পার করেছে সে। খাটের স্ট্যান্ডে এখনও ঝুলছে ঝকমকে ফিতা আর কাগজের ফুল।
কোথায় গেল আনার? রাতের বেলা কী এক কাজের কথা বলে, বিয়ের দুটো রাত পার হওয়ার পর থেকে, শরিফাকে নিজ হাতে ঘুম পাড়িয়ে কোথায় যায় আনার। আবার ভোর রাতে ঠিকই আনারের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয় শরিফা। কী করে? কোথায় যায় আনার? তা জানা হয়না শরিফার। আজ ভোর পার হয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে অথচ তার কোন খোঁজ নেই। বাড়ির সবাই চিন্তায় অস্থির। চিন্তিত গ্রামবাসীও।
ওরা ছয় বন্ধু ভাবছে আর ভাবছে, কী করবে ওরা! নদীর ধারে গিয়ে অপেক্ষা করে। সবাই যে যার মতো বাড়ি ফিরলেও ছয় বন্ধু নদীর কাছ থেকে নড়ে না এক পাও। ছয় বন্ধু ছয় বন্ধুর বাড়ি থাকবে বলে বের হয়েছে বাড়ি থেকে। তাই তারা ছয় জন নদীর পাড়েই বসে থাকে। রাতের নদী কখনও দেখা হয়নি ওদের। আকাশের চাঁদটা নদীতে পড়ে। পানিতে আলোর ঝর্ণাধারা খেলা করছে। মিটমিট করে তারাগুলো  জানান দিচ্ছে আমরাও আছি। ছয় বন্ধুর রাত বাড়তে দেখে ভয়ের মাত্রাও বাড়ছে। কী করবে? বাড়ি ফেরার পথও খোলা নেই! সারারাত নদী দেখেই কাটাতে হবে। মাঝে মাঝে জেলেদের কথা শোনা যাচ্ছে। উড়ে যাচ্ছে রাত জাগা পাখি। দূরে ওপারের চরে দেখা যাচ্ছে কুপির হালকা আলো। ছয় বন্ধু জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে বাঁধের কিনারে। একে ওপরের গায়ে হেলান দিয়ে দেখছে রাতের নদী, ভাবছে আনারের কথা, ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ে ওরা। হঠা পাখির ডাক আর মুয়াজ্জিনের "আসসালাতু খায়রুম মিন্নানাউম" শব্দে ঘুম ভাঙে ওদের। আড়মোড়া ভাঙতেই শুনতে পায় একটা ক্ষীণ গোঙানির শব্দ। কাছে গিয়ে দেখে নদীতে ভাসছে একটা হাওয়া দেয়া বালিশ...

 -------------------------------------------------------------------------------------------------

No comments:

Post a Comment