Showing posts with label মাসুম বিল্লাহ. Show all posts
Showing posts with label মাসুম বিল্লাহ. Show all posts

05 July 2016

মাসুম বিল্লাহ



চোখ
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল আদনান সাহেবের। স্ত্রী রুকসানাকে ঘুম থেকে টেনে তুলে বললেন, শোনো রুকু, রিয়ার জন্য একটা ভালো ছেলের খোঁজ পেয়েছি-।
রুকসানা আকাশ থেকে পড়লেন। ঘুম কেটে গেল। স্বামীর ওপর মেজাজ চড়িয়ে বলেন, রাতদুপুরে ঘুম ভাঙিয়ে মেয়ের বিয়ের কথা বলছো! মাথাটাথা গেছে নাকি?
- সরি। বলতে ভুলে গিয়েছিলাম...
- তা এখনই কী বিয়ের সব আয়োজন সম্পন্ন করবে?
- প্লিজ রুকু, মজা কোরো না, তুমি কাল সকালে রিয়ার সঙ্গে কথা বলে জেনে নিও, ওর কোনো পছন্দ টছন্দ আছে কিনা!
- থাকলে আমরা বুঝতে পারতাম না? ঠিক আছে সকালে কথা বলে তোমাকে জানাবো। এখন ঘুমুতে চলো।
.
রিয়ার কোনো পছন্দ নেই। আদনান সাহেব যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। থাকলেও তিনি অবাক হতেন না। মেয়ের পছন্দকে গুরুত্ব যেমন দিতেন, তেমনি মেয়ের খুশিতে ও সহায়তা করতেন বাবা হিসেবে। পাত্র তার ছেলেবেলার বন্ধুর একমাত্র ছেলে। বন্ধুর তরফ থেকেই প্রস্তাব এসেছে। দুই বন্ধুই রাজি।
.
শুক্রবার সন্ধ্যায় রিয়াকে দেখতে এল পাত্রপক্ষ। রিয়া আর পাত্রকে আলাদা কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হলো। রাতের খাবার সেরে পাত্রপক্ষ বিদায় নিল। রিয়া তার মাকে জানিয়ে দিল, ছেলে তার পছন্দ হয়নি। কারণটাও মাকে জানিয়ে দিল। কিন্তু আদনান সাহেব মানতে চাইলেন না। তিনি ভাবলেন মেয়ের নিশ্চয়ই কোনো পছন্দ আছে। এখন টালবাহানা করছে। মনে মনে মেয়ের ওপর অসুখি হলেন। তবুও তিনি মেয়েকে ধরলেন, পছন্দ না হওয়ার কারণটা আমাকে আবার বলবি মা?
- মাকে তো বলেছি বাবা।
- আবার বল-
- ছেলের চোখ ভালো না...
- চোখ ভালো না বলতে কী বোঝাতে চাচ্ছিস?
- আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলতে পারবো না, তবে মেয়েরা ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের চোখের ভাষা পড়তে পারে! আমাকে ভুল বুঝো না বাবা, প্লিজ...
.
রুকসানা বেগম মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর স্বামীকে বললেন, যেমন বাবা তেমন ছেলে!
চমকে উঠলেন আদনান সাহেব, মানে? কী বলছো তুমি?
- যা সত্য তাই বলছি। তোমার বন্ধুতো আর আমার অচেনা না। সেই স্কুল থেকে চিনি...
- হুম। তা রুকসানা ম্যাডাম, আমার চোখে কোনো সমস্যা নেই তো?
- নেই আবার...

রুকসানা কথা শেষ করেন না। তারা তিনজন মিলে হো হো করে হাসতে লাগলেন।





দায়বন্ধন

অফিস থেকে আধ ঘণ্টা আগে বের হলো সুমনা। রাস্তায় পা রাখতেই হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি। রাস্তার একটা দোকানের দিকে ছুটে যেতে যেতে ভিজে শরীর প্রায় জবুথবু । এরই মধ্যে দোকানের সামনে লোকজনের ভীড় জমে গেছে। গা বাঁচিয়ে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়াল। বৃষ্টির জোর কমতেই বাস স্টপেজের দিকে জোর পায়ে হেঁটে গেল সুমনা।
অনেকদিনের চেনা গন্তব্য। টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে দ্রুত বাসে উঠে বসে। অর্ধেক সিট এখনো ফাঁকা। বুক কেঁপে ওঠে। সময় মতো বাস না ছাড়লে পৌছাতে অনেক রাত হয়ে যাবে। মিসিরকে ফোন করে বাস স্ট্যাণ্ডে অপেক্ষা করতে বলা যায়, কিন্তু তা সে চায় না মিসিরকে এ কষ্টটুকু দিতে। সারাদিন বেচারা অফিস করে বিকেলে সাইকেলে অতদূর থেকে ফিরে আবার সবজি বাগানে পড়ে থাকে। মিসিরকে অযথা এত রাতে টেনে আনার কোনো মানে হয় না।
বাস ছাড়ল ঠিক এক এক ঘণ্টা পর। ভেতরে ভেতরে সুমনার রাগ জমতে শুরু করেছে। এমনিতে সে চুপচাপ শান্ত স্বভাবের। তবু আজ এবেলায় তাকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে।
সুমনা বসেছে জানালার পাশে। তার পাশের সিট এখন অবধি ফাঁকা। আজ আর কোনো যাত্রী উঠবে বলে মনে হচ্ছে না। জানালার কাচ পুরো খুলে দেয় সে। ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়ার এসে তার মুখে লাগে। মুহুর্তে সব অস্থিরতা ঠাণ্ডা হাওয়ায় উড়ে গেল। চোখ বন্ধ করে ফেলে সে। মনটাও বেশ চনমনে হয়ে উঠল। সুমনার মনে হলো, এভাবে পুরো রাত বসে থাকতে পারলে মন্দ হয় না। ভাবল-যদি ঘুমিয়ে পড়ি? যদি চেনা স্টপেজ পেরিয়ে যায়? যদি অচেনা স্টেশনে এসে নেমে পড়ি? তখন? তাহলে কী খুব বেশি ক্ষতি হবে?সুমনার চোখ বন্ধ। তার ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে ওঠে অন্ধকার ভেদ করে। ভাবনটা মাঝপথে কাটা পড়ে মোবাইলটা সুর তুলে বেজে উঠতে। মিসিরের কল। মিসির বাস স্ট্যাণ্ডে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সুমনার কণ্ঠে মিথ্যে রাগ ঝরে পড়ে। এসব ছেলেমানুষির দরকার ছিলো না। মিসির সুমনার কথা গায়ে মাখে না। মনে মনে খুশি হয় সুমনা। মনে অন্যরকম এক ভালোলাগা এসে ঘিরে ধরে। আবারো চোখ বোজে এবং ভাবনার অতলে হারিয়ে যায় সে।
বাস স্ট্যাণ্ডে মিসিরকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে। মিসির ছুটে এল। সুমনার চোখ পুরনো মিসিরকেই যেন দেখছে। প্রতিদিন চার মাইল পথ সাইকেল চালিয়ে অফিসে আসে। ছুটির পর আবার সে সাইকেলে চেপে ফেরা। তারপর সবজি বাগান নিয়ে সন্ধ্যা অবধি ডুবে থাকা। এই হলো মিসির। সুমনা মুখ খুলল, তোমার ক্ষেত-খামার কেমন চলছে?
- অফিস থেকে ফিরে যেটুকু সময় পাই তাতে কী আর ক্ষেত খামার হয়!
মলিন দেখালো মিসিরকে।
- তাহলে করো কেন? এত পরিশ্রম করে খাওয়াবে কাকে?
- তুমি আছো। ভাই, ভাবী, ভাইপো, ভাইজিরা আছে...
- আমার চিন্তা করো না। ভারী শোনায় সুমনার কণ্ঠ।
- হু।
মিসিরের পাংশুটে মুখ অন্ধকারের বন্ধ খাঁচায় আটকা পড়ে।
বাকি পথটুকু কেউ আর কথা বলে না। ঘরে ঢোকার আগে কলতলা থেকে ঠাণ্ডা জলে হাত মুখ ধুয়ে স্বস্তি ফিরে পায় সুমনা। এত রাতে ভাত মু্খে তুলতে ইচ্ছে না করলে মিসিরের এখনো খাওয়া হয়নি বলে তাকেও দুটো খেতে হয়। খাওয়ার সময় মিসির আচমকা প্রশ্ন করে, এবার কয়েককটা দিন থেকে যাও না?
- মানে?
- ছুটি নাও।
- সপ্তাহে একদিন ছুটি তাও তোমার কাছে এসে থাকি...
- মানে বলছিলাম...। মিসির কথা শেষ করে না।
- তুমি নাও না! পারবে অফিস থেকে কয়েকদিন ছুটি নিয়ে আমার কাছে গিয়ে থাকতে? জানি পারবে না, কারণ এখানে তোমার ভাই-ভাবীকে রয়েছেন, তাদের ছেড়ে তো যাওয়া চলে না; দায়িত্ব কর্তব্য বলে কথা-
- আচ্ছা থাক। মিসিরের গলা খাদে নেমে আসে।
খাওয়া শেষ হয়। দুইজনে খাটের ওপর পা ভাজ করে মুখোমু্খি এসে বসল। মিসির মুখ নিচু করে রেখেছে। সুমনা বলল, তুমি তোমার বউকে ছেড়ে থাকতে পারো কিন্তু আমি পারি না, আমি যে মেয়ে মানুষ!
- আবার পুরনো কথা তুলছো কেন সুমনা?
- কথা পুরনো হলেও ঘটনা তো আর পুরনো হয়নি। সুমনার কণ্ঠে খেদ ঝরে পড়ে।
- এবার কী তুমি এ সব কথা তুলে ঝগড়া করতেই এসেছো?
- আমি ঝগড়া করতে পারি না তুমি জানো, আর ঝগড়া করতে পারলেও হয়ত শান্তি পেতাম-
- আমার সব কথাই তুমি জানো সুমনা, তাই বলছিলাম আজ আবার এ সব কেন...
- যতদিন তুমি তোমার সিদ্ধান্ত না পাল্টাবে ততদিন...
- ছোটবেলা থেকে যে বড় ভাই আমাকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন তাকে ছেড়ে দূরে যাওয়া, আলাদা সংসার করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
- বেশ তো কে তোমাকে মানা করেছে! তাই বলে তুমি তোমার স্ত্রী, নিজের সংসারের কথা ভাববে না? এতটা মহামানব হবার কারণে যে আমার জীবনও তুমি নষ্ট করে দিচ্ছো!
- আমি নিরুপায় সুমনা। আমি দায়বন্ধনে আটকে আছি, যে দায়, যে বন্ধন ছিন্ন করার শক্তি আমার নেই।
- ঠিক আছে। কিন্তু তোমার সঙ্গে আমি কোন বন্ধনে আটকা পড়ে আছি? বিয়ের এত বছর হয়ে গেলেও আমাদের এখনও কোনো সন্তান হয়নি, সে কথা তুমি ভেবেছো কখনো? ভুল আমারই বার বার একই প্রসঙ্গ সামনে টেনে আনি! পৃথিবী উল্টেপাল্টে গেলেও তুমি তোমার...
সুমনা হাঁপাচ্ছে। কথা শেষ করতে পারে না। বাস্তবে ফেরে। সবি
ৎ ফিরে পায় বাসের কনন্ট্রাকটরের ডাকে, আপা, নামেন বাস আর যাইবো না।


08 May 2016

মাসুম বিল্লাহ


দুপুরের গল্প
চৈত্রের আগুনজ্বলা দুপুরে বাসায় এল আতাহার। ঠিক কতদিন পর দুপুরেবেলায় বাসায় এল মনে করতে পারে না। প্রতিদিন সকালে বাজারে তার নিজের দোকান খুলে বসে, আবার মাঝ রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরে। দুপুরের খাবার বাসা থেকে পাশের বাসার মন্টুর বাপ সোলেমান বকশির কাছে দিয়ে দেয় আতাহারের স্ত্রী রেশমা। অনেকবারই সে আতাহারকে বলেছে, আপনে দোকান বন্ধ কইরা দুপুরের ভাত ঘরে আইসা খাইলেতো পারেন।
আতাহার তখন সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলেছে, তুমি যদি ব্যবসার কিছু বুঝতা তাহলে আর এই কথা কইতে পারতা না বউ।

রেশমাও রাগ-অভিমান মেশানো গলায় বলেছিল, ব্যবসা আমার বোঝনের কাম নাই, আমি কী আমার জন্য কই, আমি তো কই আপনের ভালোর জন্য।
তখন আতাহারের সুর নরম হয়ে আসে, বলে, তা কও দেহি কী ভালো হইবো আমার?
রেশমা কণ্ঠ খাদে নামিয়ে মিহি স্বরে বলে, আপনে গা-গোসল দিয়া শান্তিমতন ভাত খাইতে পারতেন, তারপর ধরেন, ভাত খাওনের পর বিছানার উপরে গড়াগড়ি দিয়া আস্তেধীরে দোকানে গেলেন—
আতাহার তখন রেশমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, ওরে বউ তাইলে আর দোকানে যাওন লাগবো না, ব্যবসা লাটে উঠবো।

অবাক হয়ে রেশমা বলে, ক্যান দোকানে যাইবেন না, ক্যান ব্যবসা লাটে উঠবো?
রহস্যঘেরা কণ্ঠে আতাহার বলে, সেদিন কী আর তোমারে ফালাইয়া দোকানে যাওন যাইবো? আমার ইচ্ছা করবো না তোমারে জড়াইয়া ধইরা দিন-রাইত পইড়া থাকি?
লজ্জা পেয়ে রেশমা বলে, কী শরমের কথা যে আপনে কইতে পারেন! যান আপনেরে আর দুপুরে ভাত খাইতে আইতে কমু না। আজ অনেক দিন পর দুপুরে আতাহারকে চোখের সামনে দেখে ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না রেশমা। চমকে ওঠে সে। চোখ মুখে খুশির ঢেউ খেলতে দেখা যায় তার।
গামছা আর সাবানের কেস স্বামীর হাতে দিয়ে বলল, যান গা-গোসল দিয়া আসেন, এর মধ্যে আপনের ভাত গোছাইয়া দিতাছি।
—আগে ভাত দ্যাও, গোসল একবারে করমুনে বউয়ের থুতনি নেড়ে বলে আতাহার।
—দেরি করলে আপনের ব্যবসা লাটে উটবো না?
রেশমার খোঁচা টের পায় সে।
—উঠোনের কোনো চাঞ্জ নাই বউ, ঠাডা পরা রৌদের মধ্যে মানুষ দূরের কথা একটা কাক-পক্ষীও নাই বাজারে। এক সেকেন্ডের জন্য রেশমাকে ঠোট উল্টাতে দেখল আতাহার। সে কিছু বলার আগে রেশমা রান্নাঘর থেকে মাদুর এনে বিছিয়ে দিল।
ভাত খাওয়ার মাঝপথে আতাহারের মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠল—
ভাত মুখে নিয়ে বিড়বিড় করে সে—হালা কামাইল্লার বাচ্চা...
তারপর বাম হাতে মোবাইল কানের কাছে নিয়ে চেঁচিয়ে বলে, তোরে না কত্তদিন কইছি লাঞ্চ টাইমে মাল নিতে আইবি না, আজ দোকান বন, বউ লইয়া শ্বশুর বাড়ি আইছি—
কথা শেষ করে মোবাইল মাদুরের ওপর ছুঁড়ে মারল সে। মোবাইলের পাওয়ার অফটোন বেজে উঠতে শোনা গেল। রেশমাকে উদ্দেশ্য করে আতাহার বলে, বুঝলা বউ, এই হালা কামাইল্লা একটা ভ্যাজাইল্লা কাস্টমার!
রেশমা স্বামীর প্লেটে আরেকটা টেংরামাছ তুলে দিয়ে বলল, কাস্টমারের লগে মেজাজ দেখাইলে আপনের ব্যবসা লাটে উঠবো না?
—এ্যাঁ আইছে আমার দরদী, যার লাইগ্যা করি চুরি, হ্যায় কয় চোর, ঠিক আছে অখুনি তাইলে দোকানে যাই...
—থাউক হইছে, আর বেশি প্যাচালে কাম নাই, ধীরেসুস্থে খান...
—তুমি খাইবা না?
—আপনে জানেন না, ভাত খাইলে আমার শরীর ছাইড়্যা দেয়?
আতাহার আর কথা আগায় না, দ্রুত ভাত খেয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়। তারপর রেশমাকে কাছে ডেকে বলে, আসো,
এ সময় পাশের বাসার মন্টুর বাপ সোলেমান বকশি এসে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে চি
ৎকার করে ওঠে, "ওরে আতাহারইয়্যা মোবাইল বন্ধ কইরা রাখছো ক্যা, তোর দোকান তো পুইড়া শ্যাষ!"




দুপুরের গল্পের পর...
আগুনে পুড়ে যাওয়া আতাহারের দোকান ঘরটা কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিছুদিন। বাজার কমিটি তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু নগদ অর্থ দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেয়। নিয়তির ওপর কারো হাত নেই, তাছাড়া অন্যের সাহায্য নিতে চায় না সে। সবাই তখন অবাক হয়ে বলেছিল, কী কও মিয়া, ট্যাকা লইবা না ক্যান?
আতাহার স্বহাস্যে বলেছিল, নতুন কইরা দোকান করার ইচ্ছা নাই।
আবারও সবাই দ্বিগুন অবাক হয়ে জানতে চায়, তাইলে করবা কী? ব্যবসাপাতি না করলে চলবা ক্যামনে?
আতাহার রহস্যঘেরা কণ্ঠে বলে, কিছু না কইরা তো আর থাকোন যাইবো না, তয় অখনও কিছু ঠিক করি নাই, ভাবতাছি কয়দিন ঘরে মইদ্যে শুইয়া-বইস্যা পার করমু।
আতাহারের এ কথায় সবাই মুখে কিছু না বললেও মনে মনে তারা নিশ্চিত হয়, দোকানের শোকে মাথামোথা আউলা হইয়া গ্যাছে।
আর্থিক সাহায্য ছাড়াই আতাহার ঘুরে দাঁড়াতে চায়, অতীতেও সে নিজের চেষ্টায় সে এই দোকানটি দাঁড় করেছিল। আবারও সে কিছু একটা করবে, সে জানে সে পারবে। পুড়ে যাওয়া দোকানটির শোক তাকে গত সতেরো দিন ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখল। প্রতিদিন চোখের সামনে তার ব্যস্ত দোকানটি ভেসে উঠত, একটার পর একটা কাস্টমার সামলাতে ব্যস্ত সে। ঘোর কাটতেই বুকের ভেতর থেকে নীরবে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসতে লাগল।
স্ত্রী রেশমাও ঘুরেফিরে নিজেকে দোষ দিতে লাগল, দুপুরে না আইলে এই বিপদ হইতো না।
আতাহার জোরে হাসি দিয়ে বলে, তোমার যত বেহুদা কতা, দোকানে থাকলেই কী আগুন আমারে দেইখ্যা নিবভা যাইতো? একটু থেমে নিজেই বলে, যাইতো না বউ, তুমি এইসব কতা আর কইবা না কইলাম।
-এখন কী করবেন, ঠিক করছেন কিছু?
-হ ঠিক কইরা ফালাইছি, ঘরেই বইসা থাকবো আর তোমার লগে গপসপ করবো।
হো হো করে বেদম হাসিতে ফেটে পড়ে আতাহার।
কিন্তু রেশমা সে হাসিতে যোগ না দিয়ে বলে, বইসা খাইলে রাজার গোলাও শ্যাষ হইয়া যায়, কামকাইজ কিছু একটা করেন।
-ঠিক করছি বিদ্যাশ যামু, ট্যাকা কামামু তারপর দ্যাশে ফিইরা পায়ের ওপর পা তুইল্লা খামু।
-বিদ্যাশ যাইবেন, তা ট্যাকা পাইবেন কই?
-আরে বউ ক্যাশপাতি কিছু তো আছে, তোমার স্বামীরে এত ফকির ভাবলা কেমনে?
-হাছাই বিদ্যাশ যাইবেন আপনে?
-তোমার লগে মিছা কতায় কাম কী বউ?
-কবে যাইবেন, কবে আইবেন, ব্যাবাক ঠিক কইরা ফালাইছেন নাকি?
-আগামী মাসেই যামু, পাঁচ বছর ছাড়া আর দ্যাশে আইতে পারুম না।
-ও।
রেশমা আর কিছু বলে না। সে এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, আতাহার যা বলল তা কতটুকু সত্য, তবে স্বামীকে সে পুরোপুরি অবিশ্বাসও করেনি কখনো।

আতাহার একটুও মিথ্যে বলেনি, ভেতরে ভেতরে সব ঠিক করে ফেলেছে, সে বিদেশই যাবে, একবারে বেশ কিছু টাকা কামিয়ে তারপর দেশে ফিরে আসবে।
মাঝের এই কয়েকটা দিন তার বেশ দৌড়ের ওপরই গেল। দেখতে দেখতে তার যাওয়ার দিন সামনে চলে এল।
এবার যেন রেশমার মন খারাপ হওয়া শুরু হলো কিন্তু স্বামীকে তা টের পেতে দিল না, কারণ পুরুষ মানুষ তো বাইরেই থাকবে, টাকা-পয়সা রোজগার করবে, তা না হলে যে সংসার চলবে না। সবই বোঝে রেশমা।


রাত ভোর হলে আতাহার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে। রাতটা রেশমার সঙ্গে গল্পে-অালাপে কেটে গেল।
দুপুরের আগেই সে ঢাকায় পৌছে যায়। রাতে তার ফ্লাইট। হোটেলের রুমে ঘন্টা খানেক বিশ্রাম নিয়ে বিমানবন্দর পৌঁছে গেল সন্ধ্যার পরই।
রাত দশটার ফ্লাইট আতাহারকে ছাড়াই উড়াল দিল। আতাহার বিমানে উঠেনি, সে উঠেছে তার বাড়ির ঠিকানায় যাওয়ার বাসে। ভোরের আগেই সে বাড়ির উঠোনে পা রাখল। চি
ৎকার করে ডাকল, ও রেশমা ও রেশমা দরজা খোল...
রেশমা স্বামীর কণ্ঠ চিনতে দেরি করেনি, তবে বুকের ধুকধুক বেড়ে গেল, দরজা খুলে আতাহারকে দেখে বলল, আপনে বিদ্যাশ যান নাই?
-আমারে কি পাগলে কামড়াইছে যে বিদ্যাশ যামু?
-ট্যাকা-পয়সা খরচ কইরা কীসব কইতাছেন আপনে?
-ট্যাকা-পয়সার কোনো ব্যাপার না রেশু, বউরে দ্যাশে ফালাইয়া বিদ্যাশ যামু, তোমার আতাহার এতো বলদ না।

01 January 2016

মাসুম বিল্লাহ






কাচের প্লেটের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে পাশের বাসা থেকে। প্রতিদিন দেয়াল ঘড়িতে রাত বারোটা বাজলেই টুংটাং শুরু হয়। রাতের খাবার খাওয়ার এটাই সঠিক সময় কিনা-তা বুঝে উঠতে পারে না বাদল। তিন বছর ধরে পাঁচ তলার ফ্ল্যাটের দ্বিতীয় তলার পূর্ব পাশের রুমটি ভাড়া নিয়ে থাকছে সে। ইচ্ছে করেই বাড়তি একজন রুমমেট নেয়নি। অবিশ্যি শুরুর দুই মাস একজন রুমমেট ছিল নোয়াখালীর। রুমমেটের নাম তার মনে নেই। রাতের অবসরে রুমমেটের নাম মনে করার চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ে না। একটা মানুষের নাম মনে করতে না পারায় বেশ হতাশ হয়ে পড়ে সে। এদিকে পাশের বাসায় কাচের প্লেটের টুংটাং শব্দও তাকে বেশ অস্থির করে তুলছে। শুধু কি টুংটাং-ওই বাসার অল্প বয়সী কাজের মেয়ের ঢং করে কথা বলা-‘জ্বী আম্মা, একটু অপেক্ষা করুন, পিলিজ। ওদের পিচ্চি ছেলেটার চিৎকার চেঁচামেচি, তার উপর হাই ভলিউমে টেলিভিশনে জীবন মানে জি বাংলার গুণগান প্রচার। হাঁট বাজারের সাথে তুলনা চলে বাসাটির। একটা কথা বাদল কিছুতেই ভেবে পায় না-মাঝ রাতে ঘুম বাদ দিয়ে খাওয়ার কি দরকার? এতক্ষণে ঘুমের প্রথম পর্ব শেষ হয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হওয়ার কথা, নাকি আমার মতো ওদেরও ঘুমের সমস্যা।

বাদলদের দুই রুমে দশটার মধ্যে রাতের খাওয়ার পর্ব সেরে ফেলে। পাশের রুমমেটরা রাতের খাবার খাওয়ার পর নিয়ম করে তাসের আসরে বসে। সাথে চলে বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকানো। তাসের অভ্যাস বাদলের নেই, তবে বিড়ির নেশা ছিল ভয়ংকর রকমের। ভয়ংকর নেশাটাকে কোনো রকম কসরত ছাড়াই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। এই ক্ষেত্রে বীর আলেকজেন্ডার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সে নিজেও এমনটি ভাবে-‘আমার মতো কেউ সিগারেট ছাড়–ক দেখি!’ তার রুমমেটরা তাসের আসরে বসার জন্য তাকে ডাকত, কিন্তু বাদলের সাড়া না পেয়ে রণে ভঙ্গ দিয়েছে। তাসের আসরে যোগ না দেওয়ায় বাঁকা কথা শোনাতে ছাড়েনি রুমমেটরা-‘বাদল ভাই কি বাসর রাইতে ভাবির মাথায় হাত দিয়া কিরা কসম খাইছেননি?’ রুমমেটদের কথায় তাজ্জব বনে গিয়ে মিনমিন করে উঠে-‘কী যে বলেন না! খুব বুঝি বাংলা সিনেমা দেখেন!’ কোনো পক্ষই কথার সঠিক জবাব না পেয়ে হাসির ভেলায় ভেসে যায়।

পাশের রুমে রাত দশটার পরে যখন শাদা আলো জ্বেলে টেক্কার চাল চলে, তখন বাদলের রুমে একটা জিরো পাওয়ারের ভায়োল্টে বাল্ব জ্বলে উঠে। টান টান হয়ে মাথার বালিশে নিজেকে সঁপে দেয়। তারপর এক দৃষ্টিতে জিরো বাল্বটির দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখের পলক পড়ে সময় নিয়ে। আবারো চোখের পলক না ফেলে বেগুণী আলোর দিকে তাকিয়ে থাকা। একবার নয়, দুইবার নয়, একটানা রাত বারোটা অবধি এই অদ্ভুত খেলা খেলে চলে সে। এসময় বাদলের মনে পড়ে বিহারী মেয়ে কেয়ার কথা। কেয়ার গাল দুটো বেশ পাকাপোক্ত দেখতে, মানে ফোলা ফোলা ছিল। দুষ্টুমির ছলে একবার বাদল কেয়াকে বলেছিল-‘এই কেয়া, তোর গাল দুটো এমন ফুলেছে কি করে রে? সত্যি করে বলতো- তোর গাল কে টিপে দিয়েছে?’ বাদলের কথা শুনে কেয়া বেশ ক্ষেপে যায়। তারপর বাসায় গিয়ে মাকে বলে দেয়ার হুমকি। আতঙ্কে কয়েকটা দিন কেটেছে। কিন্তু পরে এই নিয়ে আর কিছু হয়নি।

ক্লাসের ফাঁকে কেয়া আর বাদল চোখের খেলাটি খেলত। চোখের পলক না ফেলে দু’জনের চোখের দিকে কে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে। প্রতিবারই বাদল কেয়ার পলক না ফেলা চোখের কাছে হেরে যেত। কেয়াকে হারানোর নেশায় নয়, বরং কেয়ার গভীর চোখে চোখ রাখতে পারার লোভেই বাদল কেয়াকে বলত-‘দেখিস এবার তোর আগে পলক পড়বে। চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার নেশায় সে বয়সে কিভাবে পড়েছিল, আজও তা বাদল বুঝে উঠতে পারেনি। এখন বেগুনি আলো দেয়া জিরো বাল্বটিকে হারানোর নেশা চেপে বসেছে। মনে মনে হিসাব রাখতে ভুলে যায়-চোখের পলক না ফেলা খেলার। ঠিক এই সময় বাদল আর বেগুনি আলোর জিরো বাল্বটির মাঝে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে আর্বিভাব হয় একটি আধ লেজওয়ালা টিকটিকির।

টিকটিকির আগমনে বাদলের খেলায় বিরতি পরে। বিরতি ঠিক নয়, বলা চলে নতুন করে শুরু হয় বাদল আর টিকটিকির মধ্যকার আলাপ-পরিচয়। বেগুণী আলোর বাতিটিকে ছেড়ে টিকটিকির পানে মনোযোগ দেয় সে। পূর্ণ আগ্রহের দৃষ্টি নিয়ে টিকটিকির পানে তাকিয়ে থাকার খেলায় মেতে ওঠে।

দেয়াল ঘড়ির অববয় চোখের তারায় দেখা গেলেও ঘণ্টার কাটাটি এখন ঠিক কোথায় অবস্থান করছে বুঝে উঠতে পারে না। বালিশের তল থেকে পুরনো সস্তা হাত ফোনটি বের করে। মোবাইলের বাটনে চাপ দেয়, কিন্তু আলো জ্বলে না। ভুলে যায়-রাত দশটা বাজলেই মোবাইলের সুইচ অফ করে রাখে সে। বাধ্য হয়ে মোবাইলের সুইচ অন করে। টেক্সট টোন বেজে উঠল, নিশ্চয় মোবাইল কোম্পানীর নতুন কোনো অফার। রাত এক’টা পেরিয়েছে অনেক আগে। পাশের বাসার টুংটাং শব্দ মিলিয়েছে, জানালার আলো মুছে গিয়ে অন্ধকার স্থায়ী হয়েছে। পরিবারটিও ঘুমের দেশের বাসিন্দা হয়েছে, শুধু বাদল জেগে আছে, জেগে আছে ঘুণপোকা। 

বাদল ছোটবেলা থেকেই টিকটিকি ভয় পায়। ছবি দেখলেও গায়ের ভেতর কেমন সুড়সুড় করে ওঠে। পেট গুলিয়ে উঠা একটা ভাব গলার কাছে চলে আসে। অথচ আজ টিকটিকি দেখে বাদলের ভেতর পূর্বের ভাবান্তর হলো না। টিকটিকির ওপর থেকে একবারের জন্যও চোখ ফেরাচ্ছে না সে। টিকটিকির চলাফেরার দিকে লক্ষ্য রাখছে, যেন কেউ তাকে এই কাজে নিয়োগ দিয়েছে। ফাঁকি দেয়া চলবে না, শেষে না জবাব দিহি করতে হয়। হঠাৎ করে বাদল তার শরীরের উপরের অংশ বিছানা থেকে তুলে আবার নামিয়ে ফেলল, কি কারণে বুঝা গেল না। আবারো স্থির হয়ে পড়ে রইল বিছানায়, কিন্তু দৃষ্টি তার টিকটিকির দিকে। ঠিক তখনই ন্যানো সাইজের একটি রাত পোকার আগমন লাইটের পাশে। টিকটিকির অর্ধেক লেজটিতে সাপের দুলুনি শুরু হলো। রাতের খাবার মুখের সামনে এসে পড়লে কে না খুশি হয়? গুটি পায়ে একবার সামনে গেল অর্ধ লেজের অধিকারী। এবার ক্ষুদ্র পোকাটির কাছাকাছি চলে গেল। নিবিড় পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত শিকার কি না তাই হয়তো ভাবছে। আবার একটু পেছনে সরে এলো টিকটিকিটি। এদিকে বেশ অধৈর্য হয়ে পড়ছে বাদল। মনে মনে গালি দিচ্ছে-‘টিকটিকির বাচ্চার মতিগতি তো বুঝতে পারছি না, কি করতে চাইছে। খাবি তো খা, অতো নাটক করছিস কেন?’ বাদলের গালি শুনে, না হয় বাদলকে খুশি করতে, ঠিক সেসময়ই খপ্ করে পোকাটিকে মুখে পুড়ে নিল। একবার মাথা তুলে ঢোক গিলল টিকটিকিটি। তারপর কিছু সময় স্থির হয়ে রইল। বাদলের মনে হচ্ছে, টিকটিকি তার দিকে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। চোখের ভাষায় বলছে, ‘কী হে রাতের বন্ধু, এবার খুশি তো?’ বাদলের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল।

মিনিট দুই পরে হেলেদুলে আরেকটি টিকটিকির আগমন রাতের নিশ্চুপ দেয়ালে। বাদল আবারো দেয়ালের বুকে দৃষ্টি ফেরাল। অদ্ভুত এক রাত পার করছে বাদল। গতকালের চেয়ে আজকের রাতটা তার কাছে বেশ আনন্দদায়ক বলে মনে হচ্ছে। গতকাল তার সঙ্গী ছিল বেগুনী আলোর বাতিটি। আজ সঙ্গীর সংখ্যা বেড়েছে। বেগুনী আলোর বাতি, একটি রাত পোকা, একটি অর্ধেক লেজবিশিষ্ট টিকটিকি ও তার প্রেমিকা। এদের নিয়ে বাদল বেশ মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছে আজকের রাতটা।
লেজ না-হারানো টিকটিকিটি ঘুরে অর্ধেক লেজওয়ালার দিকে ফিরল। মুখোমুখি ওরা দু’জন। দু’জনের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। দুজনকে একসাথে আগে কখনো দেখেনি বাদল। নাকি ওরা পূর্ব পরিচিত, ঠিক বুঝে উঠতে পারে না সে।   
 
ঠিক এই মুহূর্তে বাদল যে দৃশ্যটি দেখছে, ইতিপূর্বে যা দেখেনি। সেকারণে ভেতরে ভেতরে আগ্রহী হয়ে উঠল। বিছানা থেকে উঠে সোজা হয়ে হাঁটু গেড়ে দেয়ালের পাশে চলে এলো। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকিয়ে রইল টিকটিকি যুগলের দিকে। বাদল এবার নিশ্চিত হয়েছে, ওরা যুগলই হবে। যুগলের মেলামেশা দেখে বাদলের মনে আরেকটি প্রশ্ন জাগে, রাতই কি মিলনের উপযুক্ত সময়? প্রশ্নটি মনের ভেতর আসতেই বাদল রাতের নিস্তবদ্ধতা ভেঙ্গে মুখ ফুটে বলে ফেলে, ‘ধ্যাত!’

জীবনে প্রথমবারের মতো বাদলের মনে হলো, দেয়ালে থাকা ওই অর্ধেক লেজ হারানো টিকটিকির কাছেও সে কতো অসহায়! টিকটিকিটির যে বিশেষ ক্ষমতাটি আছে, মানুষ হয়েও সে ক্ষমতাটি তার নেই।

03 December 2015

মাসুম বিল্লাহ



গতকাল বাবুই’র এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। কয়েকদিনের জন্য মাঠে ক্রিকেট নিয়ে মেতে থাকতে পারবে। পরীক্ষার জন্য ব্যাট-বল হাতে নিতে পারেনি। বিকেলে সবার আগে মাঠে এসে বসে আছে বাবুই। মাঠের এক কোণে বসে আছে একা। বন্ধুরা কেউ নেই মাঠে। কিছুক্ষণ পরেই সবার দল বেঁধে মাঠে চলে আসবে। 
মাঠে এসেও বাবুই’র মন ভালো হচ্ছে না। পরীক্ষার দেড় মাস আগেই ওর দাদুভাই মারা গেছেন। দাদুর মৃত্যুর কারণে বাবুই পরীক্ষাও ভালো হয়নি। বাবা-মাও সে কারণে বাড়তি চাপ দেয়নি। দাদুকে বাবুই অনেক পছন্দ করত। দাদু ছিল ওর সব সময়ের সঙ্গী। সময় পেলেই দাদুভাইয়ের কাছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে। গল্প বলার সময় দাদু সহযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের কথাই বেশি বলতেন। কিন্তু বাবুই বলত, দাদুভাই, তোমার নিজের কথা বলো। বাবুইয়ের কথা শুনে দাদু বলতেন, ‘নিজের কথা বলতে কেমন শরম লাগে দাদুভাই।’ 
এই মাঠেই দাদুর সাথে বাবুই কতো ঘুরে বেড়িয়েছে। আজ কেন জানি দাদাভাইয়ের কথা বেশি বেশি মনে পড়ছে। একটা কারণে বাবুই দাদুভাইয়ের ওপর অনেক মন খারাপ করেছিল। দাদু মাঝে মাঝেই কী সব যেন লিখত ডায়েরিতে। ডায়েরিটা দেখতে চাইলে, না না বলতেন। একবার চুরি করে পড়তে গিয়েও পারেনি বাবুই। একদিন দাদুভাই নিজেই বললেন, ‘যখন আমি থাকব না, তখন তুই এটা পড়িস দাদা ভাই।’ এতোদিন লেখাপড়া নিয়ে ব্যস্ত থাকার ফলে ডায়েরির কথা ভুলেই গিয়েছিল। আজ মনে মনে বাবুই বলল, বাসায় গিয়েই দাদুভাইয়ের ডায়েরিটা পড়তে হবে তো।


২.
বিকেলের সূর্যের রঙ কুসুম লাল রঙের হতে শুরু করেছে। দূরে গাছের মাথার ওপর দিয়ে নিচে নামছে একটু একটু করে। নীল-সাদা আকাশটা আর নেই। মন খারাপের আকাশ এখন। বকের সারি নীড়ে ফিরছে। বাবুই বন্ধুদের বিদায় জানিয়ে বাসার দিকে একা একা হাঁটা শুরু করে।
বাসায় ফিরে মাকে খুঁজছে। কাছে পিঠে মাকে দেখতে না পেয়ে, মা মা বলে ডাকতে লাগল বাবুই। পাশে রুম থেকে মা ছুটে এসে বললেন, ‘কী  রে বাবু, তোর কী হয়েছে, এভাবে ডাকছিস কেন?’ ‘মা, দাদু ভাইয়ের আলমারির চাবিটা দাও।’  বাবুই আবার চাবি চাইলে মা বলেন, ‘তুই এই চাবী দিয়ে কী করবি?’
‘দাদু ভাইয়ের ডায়েরিটা আমার দরকার।’ জোর দিয়ে বাবুই বলল মাকে।
একটু রাগের স্বরে বলেন মা, ‘কী দরকার তোর। যত্ন করে রেখে দিয়েছি আলমারিতে।’
‘মা, দাদুভাই ডায়েরিটা আমাকে পড়তে বলেছিলেন না? পরীক্ষার জন্যই তো এতোদিন পড়তে পারিনি। কিন্তু আজ পড়ব।  দাও তো মা ডায়েরিটা।’
মা আর কথা না বাড়িয়ে ডায়েরিটা বের করে দেন বাবুইয়ের হাতে। ডায়েরি হাতে পেয়ে খুশী মনে রুমে চলে আসে বাবুই।


৩.
বাবুই ওর পড়ার টেবিলে টেবিলে রাখল ডায়েরিটা। পুরনো হয়ে পরা ডায়েরিটা ধীরস্থির হাতে মেলে ধরল। বাবুইয়ের বুকের ভেতর ধকধক্ করছে। মন বলছে, ‘কী লেখা আছে এতে। আমাকে পড়তে বলেছিলেন কেন দাদুভাই?’
প্রথম পাতা থেকে পড়া শুরু করল বাবুই। দাদুভাইয়ের জীবনের একান্ত কথা। সাথে অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনার বিবরণ। কিছু কিছু পৃষ্ঠায় এসে বাবুই আপন মনে হেসে উঠে। কিছু সময় পর বাবুই মন খারাপ করে অন্যদিকে চেয়ে থাকছে।
এভাবে বেশ কিছু পৃষ্ঠা পড়ে ফেলে বাবুই। একসময় আর পড়ে না। রুম থেকে বের হয়ে আসে। মিনিট বিশেক বাইরে কাটিয়ে ঘরে ফিরে আসে বাবুই।


৪.
ফাল্গুনের মাঝামাঝির এক বিকেল। ফুরফুরে বসন্তের মিষ্টি বাতাস সর্বত্র। মুক্তিযোদ্ধার দাদুর ডায়েরিটা আবারো পড়া শুরু করে বাবুই। কিছু অংশ পড়ার পর চমকে ওঠে। এ কী লিখেছে দাদুভাই, নিজের মনে প্রশ্ন করে। বাবুই অবাক হয়। এত দিন ধরে শুনে আসছি এক রকম, কিন্তু দাদুভাই কী লিখে রেখেছে এখানে? বাবুই যেখান থেকে শেষ করেছিলো সেখান থেকে আবার পড়তে লাগল। দাদু ডায়েরিতে লিখেছেন,

...তাদের মধ্যে আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। ৯ (নয়) মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে লাল-সবুজের পতাকা নতুন করে উড়ল। বুক ভরে দেশের মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিলাম। সবার চোখে আনন্দ। কে বলবে গতকালও সবাই যুদ্ধ করেছে। এরপর বাড়িতে ফিরে এলাম। আবার নতুন করে বাঁচার আনন্দ অনুভব করছি। কখনও ভাবিনি ফিরে আসতে পারবে জীবন নিয়ে।

...বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলো। বিধ্বস্ত দেশটা শক্ত হাতে পুন:নির্মাণ শুরু করল। সরকারকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিল। এভাবে চলতে লাগল সব কিছু। কয়েক বছরের মধ্যে আমরা একটি সুন্দর বাংলাদেশ পেলাম। যেখানে, কোনো অভাব অভিযোগ নেই। কোথাও কোনো অন্যায়-অনিয়ম হয় না। যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সবাই মিলেমিশে বসবাস করছে দেশজুড়ে।

...একটানা দুই মেয়াদে দেশ পরিচালনা করল একটি দল। পরবর্তীতে তারা অন্য দলের কাছে স্বইচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দিল। ক্ষমতা পেয়ে অন্য দলও মন-প্রাণ ঢেলে দেশ ও মানুষের সেবার নিজেদের নিয়োজিত করল। শেষে...

***
ডায়েরির এই পর্যন্ত পড়ে বাবুইর মনে প্রশ্ন জাগলো, এইসব কি লিখেছে দাদুভাই? দাদুর লেখার সাথে তো আমার জানার সাথে কিছু মিলছে না। আজ এত বছর পরেও দাদুর  লেখার সাথে কোন মিল খুজে পাই না। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশটা কেমন করে পরিচালিত হয়েছে, তা আমি বই পড়ে জেনেছি। বর্তমানে কেমন করে দেশটা পরিচালিত হচ্ছে, তাও তো দেখছি। কিন্তু দাদুভাই...! আর ভাবতে পারে না বাবুই। গায়ের জামা ভিজে ওঠে। বাবুই’র মনে প্রশ্ন জাগে, তবে কি দাদুভাইয়ের কোন প্রকার বিকার দেখা দিয়ে ছিল? তাই এমন লিখেছে?
রাতের খাবার খাওয়ার জন্য মা এসে বারবার বাবুই কে ডেকে যাচ্ছেন। মা বিরক্ত হচ্ছে দেখে বাবুই খাবার রুমে গেল।


৫.
বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়লে বাবুই আবার ডায়েরিটা পড়া শুরু করে। কিছুক্ষণ পর বাবুই চমকে উঠল। মনে মনে বাবুই বলে, না আমার দাদুভাইয়ের মাথায় কোন গণ্ডগোল দেখা দেয়নি; তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

দাদু ডায়েরিতে লিখেছেন,

...এমনই সুন্দর একটা দেশের স্বপ্ন দেখে ছিলাম সবাই। মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের জন্য যুদ্ধ করেনি। কোনো স্বার্থের জন্য, ক্ষমতার জন্য যুদ্ধ করেনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের আজ চরম অবস্থা। বলতেও লজ্জা হয় আমার। মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ ভিক্ষা করে,  কেউ রিক্সা চালায়। কেউ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছেন। যুদ্ধে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁরা বেঁচে গেছেন। আমি যুদ্ধ করে একা এত বছর পর্যন্ত  বেঁচে থাকলাম, কিন্তু দেশের কোন পরিবর্তন হলো না, হলো না দেশের মানুষের। তবুও স্বপ্ন দেখি এই প্রজন্ম অথবা এর পরের প্রজন্ম নতুন করে দেশটাকে সাজাবে। আমরা তা দেখে যেতে পারলাম না, কিন্তু বাবুইরা হয়তো পারবে। বাবুইদের তো পারতেই হবে। কারণ চিরদিন একই রকম চলতে পারে না।

...স্বাধীনতার নতুন সূর্য উঠবেই। দেশটা বদলে যাবে, উন্নত হবে, শান্তির দেশে পরিনত হবে। স্বাধীনতার মানে, স্বাধীনতার সুখ খুঁজে পাবে আগামী মানুষ। হয়তো-তা আরও অনেক অনেক বছর পর। জানি, আমার স্বপ্ন সত্যি হবেই।

***
ডায়েরি পাতা ঝাপসা দেখছে বাবুই। জলে ভরে গেছে  চোখ। হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছে নেয়। তবুও এক ফোটা অশ্রু ডায়েরির পাতায় পড়ে। টের পায় না বাবুই। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মনে দৃঢ় শপথ নেয় বাবুই। দাদুভাইয়ের স্বপ্নটা সত্যি করতে হবেই। রুম থেকে বের হয়ে বাইরে এলো ও। পা বাড়ায় আঁধার রাত পেরিয়ে নতুন সকালের খোঁজে।