Showing posts with label গল্পামী. Show all posts
Showing posts with label গল্পামী. Show all posts

25 September 2018

সেই বসন্ত —অনুপ চক্রবর্তী



যৌবনা পদ্মানদীর পাড়ে শরৎকালের পড়ন্ত বিকেলে একা বসে আছে প্রতাপ। সময় কাটে না তার। তাই পদ্মার উন্মত্ততা দেখতে এসেছে সে। একসময় এখানে নিয়মিত আসত। কিন্তু এখন ইচ্ছে হলেও আর আসতে পারে না। তবে যখন তার মনটা স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠে তখন না-এসেও পারে না। আজও তেমনই একটা দিন। স্মৃতির সান্নিধ্য পেতেই যেন এখানে ছুটে এসেছে সে। মন ভালো নেই। ভালো লাগানোর জন্যই আসা। কিন্তু এখানে এলে আরেকটু বেশিই খারাপ হয়ে যায় মনটা।
নদীর দিকে একমনে চেয়ে ছিল। হঠাৎ একজন এসে হাত রাখল তার কাঁধে। চমকে উঠল প্রতাপ। পেছনে তাকিয়ে দেখে পল্লবী। নিরুপমার খুব কাছের বান্ধবী। তাকে দেখে অবাকই হয় প্রতাপ। এখানে, এ জায়গায় একসময় নিরুপমার সঙ্গে অনেক সময় কেটেছে। পল্লবীও আসত মাঝেমধ্যে। তখন থেকেই প্রতাপকে 'দাদা' ডাকে মেয়েটি।

শব্দ —ফারিয়া তাবাসসুম



বাইরে আষাঢ় এর বৃষ্টির শব্দ, ভিতরে ঝাপসা অস্পষ্ট-কোলাহল। বেশকিছু অগোছালো টেবিল চেয়ার। এক কোনায় বসে বই পড়ার মতো নিরিবিলি জায়গা, আরেক কোনায় দেয়ালে  পুরনো ভাব ফুটিয়ে তুলতে ইট-সিমেন্ট এর খেলা করান হয়েছে, আর আবছা আলো-আধারের খেলা। এসবের সাথে বোনাস হলো উষ্ণ কফির গন্ধ। জায়গাটাতে একটু ক্ল্যাসিক ভাব আছে তা বলতেই হবে। আজকে এসব কোনটাই মনঃপুত হচ্ছে না, কেবল মাত্র বৃষ্টিটার জন্য, সব কেমন স্যাঁতস্যাতে লাগছে। ক্যাফেটেরিয়াও অসহ্য লাগছে এই অপরিচিত কোলাহলের জন্য। অন্যান্য দিন ঘন্টার পর ঘন্টা পার করা যায় নিজের পছন্দের সল্ট কফি আর ল্যাপটপের সাথে। আজ সব অসহ্য লাগছে। বৃষ্টি বাড়ার সাথে তাল মিলিয়ে কেমন যেন অসহ্যটাও বাড়ছে। মানুষের মনে এত রং কোথা থেকে আসে? এই পানি পরা দেখে। কবিতা গল্প গান প্রেমিক প্রেমিকার প্রেমের সিনেও বৃষ্টি নামক পানির ব্যবহার থাকা চাই।

22 August 2017

শাপলা জাকিয়া


রূপসার সাথে ফোনেই প্রথম আলাপ মোহিতের। মোহিত একটা জনপ্রিয় বুটিকের মালিক। সেই সূত্রে রূপসা তার পত্রিকার ঈদ ফ্যাশান সংখ্যার জন্য মোহিতের একটি সাক্ষাতকার চায়। এ্যাপয়েন্টমেন্ট  নেয়ার উদ্দেশ্যে ফোন করেছিল মোহিতকে। রূপসার কন্ঠ শুনে প্রথম দিনই মুগ্ধতা কাজ করেছিলো মোহিতের মনে। দেখা হওয়ার পর সেই  মুগ্ধতা প্রেমের রূপ নেয়। ঠিক একইভাবে মোহিতেরও প্রেমে পড়েছিলো রূপসা।

সুধাংশু চক্রবর্ত্তী


মদের ঘোর কেটে যেতে হেমন্ত স্যান্যাল চোখ খুলে তাকিয়ে দেখেন পড়ে আছেন রাস্তার ধারে । গত রাত্রে অফিস পার্টিতে আকণ্ঠ মদ পান করেছিলেন বলে এই মুহূর্তে তাঁর কপালের রগদুটো প্রচণ্ড দপ্‌ দপ্‌ করছে । মনে হচ্ছে কপালটা এক্ষুনি ফেটে পড়বে । গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে ।   
হেমন্ত স্যান্যাল ধাতস্থ হয়ে রাস্তা থেকে উঠে দাঁড়ান । পা দুটো সামান্য কাঁপছে । টলমল করতে করতে হাঁটা দেন বাড়ির দিকে । একসময়ে কপালে হাত দিয়ে অনুভব করেন কপালের ডান দিকটা ফুলে আছে । গভীর ক্ষতের উপস্থিতিও অনুভব করেন সেখানে । আঙ্গুল চ্যাট চ্যাটে করায় বোঝেন সামান্য হলেও রক্ত ক্ষরণ হচ্ছে জায়গাটা থেকে । তাতেই মনে পড়ে যায় তাঁর । গত রাত্রে বাস থেকে নামার সময় টাল সামলাতে না পেরে দড়াম করে আছড়ে পড়েছিলেন পীচ রাস্তার ধারে । কপালের ক্ষতটা হয়তো তখনই হয়েছে কোনোকিছুতে লেগে ।
হেমন্ত স্যান্যাল ভাবনা ছেড়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করেন । তাঁর এই ছড়ে যাওয়া রক্তাক্ত কপাল, অবিন্যস্ত পদক্ষেপ, একমাথা উসখো-খুসখো চুল, ধূলিমলিন পোষাক দেখে তাঁকে পাগল ছাড়া আর কিছু ভাবা যায় না । বাড়ির সামনে এসে দেখেন স্ত্রী মন্দিরা দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন তাঁরই ফেরার পথ চেয়ে । স্বামীকে দেখেও চিনতে পারলেন না তিনি । হেমন্ত স্যান্যাল কাছে এসে একগাল হেসে কিছু বলতে যেতেই মন্দিরা অমনি চীৎকার জুড়ে দেন – “কে কোথায় আছো শিগগির এসো । একটা পাগল এসেছে আমাকে মারতে ।”

শঙ্খসাথি পাল



রোজ রোজ আকাশের বুকে গোধূলির রং শৃঙ্গার করে না... মেঘের আড়ালে অভিমানী বৃষ্টি। কেমন যেন মনখারাপের অন্ধকার নামে। পশ্চিম থেকে আস্তে আস্তে দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত আকাশে। দিগন্তরেখায় খবর আসে, দিন ফুরোনোর।
শ্যাওলাধরা পুকুর পাড়ের সিঁড়ি... একখানি হাঁসের পালক.. ছোট্টবেলার স্পর্শমাখা। কিছুদিন আগে এই পুকুরেই মঙ্গলঘট ভরা হয়েছিল বিয়ের সকালে। কৈশোরের এক্কাদোক্কা চু-কিতকিত-এর পানসি ভাসিয়ে পুকুর জল থেকে আলতারাঙা সোহাগী পায়ের যাত্রা শুরু করানো হয়েছিল নতুন গন্তব্যে...।
একতলা বাড়িটায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট.. স্পষ্ট কেরানি বাবার অক্ষমতার নিশান ।মায়ের খুব শখ ছিল, বিয়ের আগে বাড়িটা রং করানোর ।কিন্তু বাবার সাধ্যে কুলোয়নি।

25 May 2017

নুসরাত জাহান আজমী




রফিকের পায়ে চকচকে এক জোড়া জুতা। সে জুতো পায়ে দিয়ে হাঁটছে না। চুপচাপ এক জায়গায় বসে আছে। এখান থেকে বাবাকে দেখা যায়। বাবা এক মনে কাজ করছে। রফিক আবার নিজের জুতো জোড়া দেখলো। তার নিজের পায়ে এমন চকচকে এক জোড়া জুতো! যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। রফিক শুধু বাবাকেই দেখছেনা, আশেপাশের সবার পায়ের দিকে তাকাচ্ছে। বেশির ভাগ মানুষের পায়ে জুতো। সম্ভবত অফিসে যাচ্ছে। যাবার আগে জুতো জোড়া আরেকটু পরিষ্কার করে নিচ্ছে। আর সে কারনেই বাবা এমন এক মনে কাজ করে যাচ্ছে। 

21 May 2017

শঙ্খসাথি পাল





পাহাড়ের গায়ে বর্ষা নেমেছে। অথচ সেই অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য কেউ জেগে নেই। ছোট্ট এই গ্রামে সামান্য কিছু মানুষের বাস ।সারাদিন ধাপ চাষ নয়তো পাশের গ্রামের চা-বাগানে কাজ করে সন্ধ্যে নামতেই কেমন যেন ঘুমিয়ে পড়ে এলাকাটাই। পূবালী মিত্র-এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের নতুন সাব ইনস্পেক্টর। টিমটিমে আলো জ্বলছে তার থানা সংলগ্ন কোয়ার্টারে ।সামনে খোলা বাইশ নাম্বার কয়েদী বিপুলের কেস হিস্ট্রির ফাইল। কালই কলকাতায় পাঠানো হবে তাকে। আজ অবধি তাকে কোনো কথা বলতে শোনে নি পূবালী। কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই, অথচ অপরাধ গুরুতর। নিজের বন্ধুকে গলার নলি কেটে খুন। কোনো মোটিভ নেই খুনের। 

17 May 2017

শাপলা জাকিয়া





প্রতিদিন বহু মানুষের মৃত্যু হয় ।মৃত্যুর দিনটি তাদের কেমন কেটেছিল,তারা সেটা কাউকে বলার আর সুযোগ পান না । তবু কিভাবে যেন দু’টি ঘটনা জানা গেলো ।
ঘটনা –একঃ
মিনহাজ সাহেবের বয়স ষাট। তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। নামিদামী হাসপাতাল নয় ,সরকারি হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ড। ছেলে তাকে কেবিনে রাখতেই পারতো কিন্তু রাখেনি, তিনি এখন বাতিলের খাতায়,তারজন্য টাকা খরচ মানে টাকা পানিতে ফেলা। নেহাৎ বুকে ব্যাথা উঠে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে এনে ভর্তি করে দিয়ে গেছে । তবে ছেলের দোষ তেমন তিনি দেনও না । ছোটবেলা থেকেই ছেলে তাকে লম্পট ও মদ্যপ বলে জানে। সারাজীবন স্ত্রী আর ছেলেকে তিনি আসলে বঞ্চনাই করে গেছেন। স্ত্রীর কথা মনে পড়তেই বিয়ের প্রথম দিককার কথা মনে পড়ে মিনহাজ সাহেবের। স্ত্রী কাবেরী তখন কি মিষ্টি দেখতেই না ছিলো। শান্ত, সরল একটা মেয়ে। কিছু বললে বড় বড় চোখ দু’টিতে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতো,যেন জীবনে প্রথম সে এই কথা শুনছে। সেই মিষ্টি কাবেরী সময়ের সাথে কতো বদলে গেলো। সে এখন একজন মোটাসোটা দজ্জাল রমণী! দোষ কাবেরীকেও তিনি দিতে পারেন না। কারন কাবেরীর সেই শান্ত,মিষ্টি স্বভাবকে তিনি কোন মূল্যই দেন নি বিবাহিত জীবনের শুরুতে। তখন তিনি বন্ধুর বউ এর প্রেমে দিওয়ানা ছিলেন। 

মাহবুব আলী





তেইশ-চব্বিশ বছরের দাম্পত্য জীবন। এখন মনে হচ্ছে কত ঠুনকো। সেই কথা শোনার পর সারারাত ঘুমে-আধো-জাগরনে পার করে ঘড়ি দেখে সোয়া তিন। নিস্তব্ধ গভীর রাত। ভোর রাত। মশারির বাইরে মশার ভন ভন গান। তখনো কানে বাজছে ভয়ংকর শব্দরাশি।
‘তার নাম কী ছিল?’
‘নাম কি ছিল জানা নেই, আমি দিয়েছিলাম। আমাদের পাড়ায় এক বদ ছোড়া ছিল, আলম; ওর নামে নাম রেখেছিলাম। বুঝলে আমাদের আলম কিন্ত বেশ শান্ত। একদিন ওর সাথে ভাব হয়ে গেল খুউব। আমাকে ভালবাসত।’
‌‌‌‘যেমন?’
‘এই ধরো স্কুল থেকে আসার পর গা ঘেষে দাঁড়াত। গল্প করত। এইসব আর কি?’
‘কত দিন মানে কত বছর ছিল তোমাদের বাসায়?’
‘বছর নয়...দু-আড়াই মাস।’
‘তুমি কোন্ ক্লাসে পড়তে তখন?’
‘সেভেন এইট...এত জিজ্ঞেস করছ কেন? গাধা কোথাকার?’

11 April 2017

শঙ্খসাথি পাল




সোম কর্মকার...
রিসেপশন থেকে নামটা অ্যানাউন্স করতেই অপেক্ষারত দুজন মানুষ ছুটে গেছিল রিসেপশনে। কাছের মানুষের জন্য উদ্বিগ্নতা মানুষকে কী ভীষণ অসহায় করে তোলে। নামটা শুনেই ছুটে গেছিলেন, পদবীটা খেয়ালই করেন সোম সরকার। পাশের ছেলেটিই বোধহয় সোম কর্মকার। কে জানে সে কার অপেক্ষা করছে।

ছেলেটা ফিরে আসতে সোম বাবুই আলাপ করলেন নিজে থেকে। আসলে তিনি টেনশন কমাতে চাইছিলেন কথা বলে ।গতকাল মাঝ রাতে সুস্মিতার অ্যাটাকটা হয়েছিল। এখনও কিছু অ্যাসিওর করতে পারেননি ডাক্তারবাবুরা।
কে জানে, সুস্মিতা তার আগে চলে যাবে কিনা। একমাত্র মেয়ে জামাই থাকে দুবাই। সোমবাবু রিটায়ার করার পর থেকে বড্ড একলা বোধ করেন ।দুজন দুজনকে ঘিরে দিন কাটাচ্ছেন। দুজনের একজন চলে গেলে জীবনটাই তো থমকে যাবে। এসব চিন্তা ভাবনা মাথায় আসতেই হিমশীতল ভয় সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই সোমের সাথে কথা বলে একটু টেনশন ফ্রি হওয়ার চেষ্টায় জারি হলেন সোম সরকার।

25 January 2017

কামরুজ্জামান কাজল







বালিশদুটি পাশাপাশি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকে। ধবধবে সাদা কাভারে ঢাকা, শিমুল তুলায় পেট বাঁধানো—ধরলেই মনে হয় হাত গলে যাবে ।
.
লাল রঙের ফুল আঁকানো চাদর । টানটান হয়ে বিছানার সাথে লেপ্টে আছে । ঠিক সামনেই একটা ড্রেসিং টেবিল । পর্দাটা সরানো । আয়না দিয়ে বালিশ দুটি দেখা যায় । ভরাট বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে থাকে ।
.
বালিশদুটির মধ্যে অনেক অনেক কথা হয় । অনেক কথার মানে আছে,আবার অনেক কথারই নাই । অনেক কথা বলার আগেই, দুইজনই হেসে কুটিকুটি  ।

নয়নিকা সেন





(১)

চেয়ারে বসে ঝিমোচ্ছি । টেবিলের উপর এটোমিক মলিকুলারের শীট... ইতস্তত সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে ।
আগামী সপ্তাহ থেকে ফাইনাল একজাম, অথচ...
-
ঘটনাটা শুরু হয়েছিল মাস খানেক আগে।
রোজ সকালে কলেজ যেতে গেলে যাদবপুর - ডালহৌসি মিনিটাই ধরি । সেদিনও ব্যতিক্রম হয়নি... হঠাৎ অচেনা গলার স্বরে ঘুরে তাকালাম ,
"আপনি কি অত্রি?"
প্রশ্নটা যিনি করলেন তাঁকে অবশ্যই আমি চিনি না , কস্মিন কালেও দেখিনি , তবে ? তিনি জানলেন কি করে আমিই অত্রি সেন ?

জ্যোৎস্না রহমান






সবে নাইনে উঠেছে পৃথা। মিষ্টি ও নিটোল চেহারা। বাবা মা এর একমাত্র মেয়ে সে...  তাই ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। ওর পড়াশুনা নিয়ে দু'জনে খুব চিন্তিত থাকে সবসময়। তবে দু'জনেই নিজের কাজ নিয়ে খুব ব্যস্ত থাকে… ফলে সারাদিন পৃথাকে একাই থাকতে হয় একা একা পড়াশুনা করতে হয়।

বিলাল হোসেন



ভাদ্র মাসের একদিন 


শেফালি বলল—মানিকভাই, আমারে কয়টা কলমিশাক তুইল্লা দিবা?
ডালিম গাছের তলে মানিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাদ্র মাসের পানি দেখছিল । বর্ষা শেষ হয়েছে, কিন্তু থই থই করছে পানি । পায়ের কাছে ছলাত ছলাত শব্দ ।
ডালিম গাছের বয়েস হয়েছে । তিরিশ। ফুল নাই তার । ফলও নাই । কিন্তু  সামনে এসে যে দাঁড়িয়েছে তার গাল দুটি ডালিমের মতই রংধরা । মানিক দেখে আবার দেখে না ।

মেহেদী উল্লাহ




রিকশাচালক ও তাঁর দুই স্ত্রী
একবার এক নারীকে দেখলাম সন্তান কোলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছে। খুব মায়া হলো। থামিয়ে জানতে চাইলাম, ঘটনা কী? তিনি শোনালেন, কিন্তু কিছুই বুঝলাম না। তাই অনুরোধ করলাম, দয়া করে কান্না থামিয়ে যদি একটু বলতেন! এবার বুঝলাম।
তাঁর সঙ্গে গেলাম। গিয়ে দেখি, বৃষ্টি না থাকা সত্ত্বেও খাটের উপর বসে তাঁর স্বামী দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে শিমের বিচি ভাজা খাইতেছে। প্রথম স্ত্রীর দুঃখ, তাকে ডাকা হয় নাই। এমন আরো বহু ঘটনা ঘটেই চলেছে। প্রথম স্ত্রী তাই সমান অধিকার চান সংসারে। এই লক্ষে তিনি ইতোমধ্যেই বহু জায়গায় গিয়েছেন, বহুজন তাঁর স্বামীকে বোঝালেও বুঝতেছে না।
আমি অনেক চিন্তা করে তাঁদের স্বামীকে বললাম,‘ভাই আপনার প্রথম স্ত্রী এভাবে রাস্তায় রাস্তায় কান্দে। ব্যাপারটা খুবই বাজে। আপনি আমার একটা রিকুয়েস্ট রাখবেন?’
তিনি খানিক চুপ থেকে মুখ খুললেন,‘বলেন শুনি। ’
‘আপনি প্রতিদিন রিকশা চালানো শেষে বাসায় ফেরার আগে যে কোনো চাউলের আড়তের সামনে গিয়ে পনের মিনিট করে বসবেন। প্রয়োজনে চাও খাবেন।’ বলেই আমি বিদায় নিলাম।

ফারহানা সুমী




চিঠি

আজকাল আমার রুমের কথা কথা খুব মনে পড়ে।
মা, আগের মত আছে তো সব ? দেয়ালের রং কি পালটে দিয়েছো? সবুজ রঙের ওয়াল পকেট, দু'একটা ফুলের টব ছিল দরজার দু'পাশে ফেলে দিয়েছো মা?
বুক শেলফটা কি আগের জায়গায় আছে এখনো? জানালার পর্দাটা?
রাত হলে যখন তোমরা ঘুমিয়ে যেতে আমার চোখের অর্ধেক রাত সেখানেই ফুরিয়ে যেত।পাশে দু'একটা বিল্ডিংয়ের কথা আমার খুব মনে পড়ে। মাঝে রাস্তা, শুয়ে থাকা শরীরে ছাঁয়া হয়ে হেঁটে যেত রিক্সা চালক। কিছু বড় গাড়ি ওয়ালা ভদ্রমানুষ। আমি জানালার পাশে দাড়িয়ে দেখতাম রাস্তার লাইট গুলোর অসুখ।

08 October 2016

মেহেদী উল্লাহ



রেণুবালার ব্যস্ত গলার দিনগুলিতে

সেই দিনগুলিতে আমি নবনির্মিত তিনশ ফিট রাস্তায় শার্টের সবচেয়ে উপরের বোতামটাও লাগিয়ে সময় কাটাতে যেতাম। বোতামটা লাগানো শুরু করি এই ভেবে, গলার ওই অংশটুকুর অনেক অপচয় করেছি।এর আগে বোতামটা খোলাই থাকত। 
ব্যক্তিগত গাড়ির পেছনের ঢালে চা রেখে তাতে কুনুই পেতে ফোনে কথা বলছিল রেণুবালা। চায়ের কাপটা পিছলে পড়ে যাচ্ছে দেখে আমি ছুটে গিয়ে থামালাম। রেণু এজন্য আমাকে থ্যাংকস দিয়েছিল। আমি সে সময়ই তার সাথে প্রথম পরিচিত হলাম।
এরপর অনেক বার তিনশ ফিট গিয়েছিলাম, রেণুবালার একই স্টাইলে চা খাওয়াখাওয়ি দেখতে। সে আর আসেনি।

মনোজিৎকুমার দাস



লক্ষ্মীটেরা
বংশে মেয়ে নেই বলে বিন্দুবাসিনীর আপেক্ষের শেষ নেই। ছোট বেটার বউ বিজয়ার কোল জুড়ে ফুটফুটে জমজ মেয়ে জন্ম নেওয়ায় বিন্দুবাসিনীর আনন্দের সীমা নেই! সে নিজে দুই নাতনি নাম রাখে সরমা ও পরমা। দুই নাতনিকে নিয়ে তার আনন্দে দিন কাটে। দুজনের মুখে ভাত দেবার পর দিনে পর দিন, মাসের পর মাস কাটে। এক একটা বছর ঘুরে আর একটা বছর আসে। সরমা ও পরমা বড় হয়ে উঠে। দুজনের চোখ আর গালের দিকে ভাল ভাবে তাকালেই দুজনের চেহারার পার্থক্য বোঝা যায়। সরমা ও পরমা ঢাকার নাম করা কলেজে একই ক্লাসে পড়ে। বিন্দুবাসিনী ভাবে, আমার নাতনি দুটোকে সিনেমার নায়িকা মতো দেখতে হচ্ছে দিন দিন।

শ্যামলী চ্যাটার্জী





ফেসবুক খুলে আপডেট নিতে নিতে সায়ন্তিকার হঠাৎ একটি ছবি চোখে পড়ল.... “বাঃ বেশ তো, ওমা নিচে আবার লেখা, “ওয়ালে কিছু লেখার জন্য আমন্ত্রণ রইল... দি লিখে দু-চার লাইন..”
ব্যস পরিচিতির ঐ শুরুয়াত। তারপর এ-ওর লেখার উত্তর প্রতি উত্তর দিতে দিতে ফেসবুকেই ঘনিষ্ঠতা। লেখার তাগিদের চেয়ে লেখার প্রতি ভালোবাসা যেন পরস্পরকে বেশি ভাবায়। কর্মসূত্রে এরা একে অপরের থেকে বিস্তর দূরত্বে, অবশ্যই মনের দিক থেকে নয়। সায়ন্তিকা কেমন যেন একটু সোহাগী, ন্যাকামি করতে ভালোবাসে। মনন কিছুতেই মেনে নিতে পারেনা সেটা। তাই মেঘ ও রৌদ্রের খেলা চলতেই থাকে দুটি অন্তরে প্রায়শই। ভুল গুলি নিজ হাতে শুধরে দেয় মনন, দূরে থেকেও...তাই এত ভরসা। দিন-মাস কেটে যায় কণ্ঠস্বরের প্রেমে আর মন ভরে না । ফলে সাক্ষাতের তাগিদ তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় দুজনকেই। 

ভাস্কর চৌধুরী




সিজোফ্রেনিয়া
বাবা নাম রেখেছিলেন দীপান্বিতা। হয়ে গেলো দীপা। গোলগাল মিষ্টি চেহারা। বাবার আদরের মেয়ে। তখনও বড় হয়নি। বড়বোন কেবল বড় হচ্ছে। তার বাবার বন্ধু মইনুল। লম্বা আর মিষ্টি কথা। জলের বোতল আনতো। বাবাকে দিতো। এগুলো অন্যরকম বোতল। এরকম বোতলের ছোট ছোট কিছু রূপও ছিলো। সেসব থেকে তার বাবা আর মইমুল কাকা জল মিশিয়ে খেতো। তারপর তারা পৃথিবীর অবোধ্য কোন এক বিষয়ে গল্প করতো। তাদের মা গল্পে যোগদান করে গল্পকে ভরাট করে তুলতো। তারপর বাবা ও মইনুল কাকাকে তাদের মা রাতের খাবার দিতো। তারা খেতো। এই সুখের সংসারে বাবা না থাকলেই মইনুল কাকা তাদের জন্যে জামাকাপড়সহ চমৎকার পুতুল গিফট করতো।একদিন দীপা দেখলো, তার মা বুকের কাপড় সরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর মইনুল কাকা পেছন থেকে জড়িয়ে আছে।আরেক দুপুরে খোলা জানালা দিয়ে দেখলো তার বাবার মতোই মইনুল কাকা মায়ের বুকের উপরে মুখ রেখে নড়াচড়া করছে। বড়বোনকে দৃশ্যটা সে দেখাতেই সে চিৎকার করে উঠলো আম্মা! এরপর বাবা ফিরলে বড়বোন তাদের গল্পটা বললো গোপনে। এক বৈশাখের দুপুরে তার বাবা শান্ত মনে ঘর থেকে বাইরে গেলো। তারপর ঘর আলাদা করে কয়েক দিন থাকার পর মইনুল কাকার কথাতে বাবাকে তার মা তাড়িয়ে দিলো। সে স্বল্পবাক আদুর বাবা চলে গেলো দূরে। আর সকাল বিকেল ও রাতে কেবল মইনুল কাকা। বছর খানেক যা তা দেখার পর তারা একযোগে মইনুল কাকার আসাটা বন্ধ করতে গিয়ে দীপা মায়ের প্রচন্ড একটা চড় খেলো। এই স্মৃতি নিয়ে বহুদিন পরে বিয়ের বাসরে গেলে তার স্বামী মইনুল কাকার মতো তাকে চেপে ধরতেই অজান্তে সে গালি দিলো খবাব সব, pardon me, i am undone এরপর পর এই অক্ষমতা দীপার জীবনে প্রকট হলো। হায় মা। হায় মইনুল কাকা। আমি আর পারছি নে বাবা।এই বলে বাবার কাছে গিয়ে মনের কষ্ট বলে আসলো সে।বাবা বার বার নিজের দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলে দীপা বাবাকে মস্ত একা চুমু খেয়ে ঘরে ফিরলো। সকালে লোকে জানলো দীপা আর নেই। নিজের জীবন সংহার করেছে। ডাক্তার বলেছিলো, সিজোফ্রেনিয়া। এমনটা ঘুরতে পারে। সিজোফ্রেনিয়া এমন কি ঘটায়।


অনুভব
মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে যখন ছোট ছেলেটা মারা যায় এবং তারও ছয় বছর আগে তার স্ত্রী মারা যান তখন থেকেই থড়-বড় সংসারে সাত সন্তানের পিতা নুরুল ইসলামকে তার সাধের পালঙ্কের নির্ভেজাল ঘুম ছাড়তে হয়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মরন রোগে ছেলে ভারতে চিকিৎসায় গেলে ঢাকায় তৃতীয় ছেলের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সব ছেলেই তখন ছোটকে বাঁচানোর জন্যে চিকিৎসার ত্রুটি রাখছে না। সে কারণে যতোটা মন খারাপ তার, তার চাইতেও তাঁর নিরাপদ পালঙ্কের দীর্ঘজীবনের আয়েস ত্যাগের ব্যাপারটি তিনি মানতে পারছিলেন। সকল ছেলে মেয়ে ঢাকায় এলে কিভাবে কার কাছে নিরাপদ ঘুম পাবেন তিনি? তিনি ঘুম ও আপন জীবন নিয়ে বার বার এইসব ঝামেলা থেকে পালাতে চেয়েছেন। এ নিয়ে ছেলেমেয়েদের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে কি ফারুকের একটা গতি না হওয়া পর্যন্ত তোরা আমার বাড়িতে থাকার একটা ব্যবস্থা করবি নে ? সব শুনে বড় মেয়ে বললো, এ আল্লাহ, আব্বা বিয়ে করতে চায় যে। তখন নুরুল ইসলামের বয়েস ছিয়াত্তর বছর। এবং বিয়ের আগে বাবার কাছে, বিয়ের পরেও বাবার কাছে এবং তার বাবা কুড়ি বছর আগে মারা যাবার পর ছেলের কাছেই ঘরে থাকার নিরাপত্তা খুঁজেছেন তিনি। কিন্তু শেষ দশটি বছরে তিনি এ বাড়ি সে বাড়ি করে পাঁচ বছরের মাথায় অপারেশন করা ফারুককে নিয়ে ফের নিরাপদ পালঙ্কের স্বাদ দুটি বছর পেয়ে তৃপ্ত ছিলেন। দু-বছর পর তিনি ফারুককে হারিয়ে ফের পালঙ্কহারা হলেন। তখন থেকেই যাযাবর জীবনে তিনি তার বেঁচে থাকার বাকি পাঁচ বছর তার ভাষায় কেঁচোর জীবনে ঢুকে গেলেন। কিন্তু স্বাধীন মাটি পেলেন না। ছেলেরা বললো, আপনার অসুবিধে কোথায়? শুধু বড় মেয়ে বুঝেছিলো, সব বিপদ থেকে সরে থাকার জন্যে আশি বছর বয়সেও তার একজন স্ত্রীর দরকার ছিলো। এটি তিনি তখন বললেন, যখন ছোট ছেলে বললো, আপনি হজে যান আব্বা। তখন তিনি মোক্ষম কথাটি বললেন, হজ্বের চে বুড়ো বয়েসে আমার মতো বয়েসী মানুষের বিয়ে ফরজ, আমার বয়েসে বৌ মরলে তোরা বুঝবি।


গরু রচনা
আমার কপাল। তাই অল্প বয়েসেই রাখালের চাকুরীটা পেয়েছিলাম। সূত্র আমার মা। মহাজনের চাকরানির প্রধান। ভাত রাঁধে আর ছোট বৌ এর ফাই ফরমাইস খাটে। তাতে মহাজন আমাকে একটু আদর করে। যেদিন গরু নিয়ে বরেন্দ্র চরাতে যাবো সেদিন মহাজন আমাকে তিনটে কথা বলেছিলো, তুই হইলি হামার গরুর রাখাল। গরু ছাড়া আর কিছু দেখিবি না। বুঝিলে বুঝিবি, না বুঝিলে হামাকে পুচপাচ করিবি। আর ঘরের কথা পরকে আর পরের কথা ঘরকে বুলিবি না। তাকাবি, ফের চোখ ফিরাইবি। গরুর রাখালি শেষে তোকে কিষান করিবো। আমি মহাজনের কথা যথাসাধ্য মান্য করেই চলি। কিন্তু একদিন গরু খাদ্য বন্ধ করিলে মহাজনকে পুচপাচ করলাম। মহাজন বলে, ওরে খাবু কবিরাজের কাছে যা। এইভাবে গরু, গোবর, ও গরুর খাদ্য সম্পর্কে আমার জ্ঞান হলো। একদিন মহাজন হুকুম করলো, আইজ থাইকা গরু গাড়ির গাড়োয়ানের কাম করিবি। গরু গাড়িতে জুড়ে ডাহিনের বলদ ডাহিনে দিবি। বাঁয়ের বলদ বায়ে দিবি। কাদায় পড়িলে বলদ উলটা জুড়িবি। গাড়ি উঠিবে। ছোট বৌ এর কাছ থেইকে বিদায় লিয়ে যাবি আর ঐঠে যা দিবে যার জিনিস তার কাছে দিবি। কাহারো জিনিস অন্য কাহাকেও দিবি না। বুঝিলি? এভাবে গরু গাড়ি চালানো গাড়োয়ান হলাম আমি। মালিক বললো,এ্যার পরেই কিষান হবি। তো আমি মহাজনের কথামতো কাজ করতে করতে বুঝলাম গরু গাড়ি বানানোর নানা বুদ্ধি। চাক্কা লাগানোর আগে ধুরিতে পাট আর চর্বির তোলান দেয়াটাও শিখে গেলাম। জ্ঞান আমার বেড়ে গেলো। রাখালের কাজ তখনও ছাড়ি নি। ফলে ভোররাতে আমাকে গোয়ালঘরে যেতে হয় রোজ। হঠাৎ একদিন দেখি মহাজনের ছোট ছেলে গোয়াল ঘর থেকে বের হচ্ছে। পিছনে ঘোমটা টানা একটা মেয়ে। মাথা আমার ঘুরে গেলো। ঘোরলাগা চোখে মহাজনকে কথা বলতেই মহাজন আমার গালে এক চড় মেরে বললো,তোকে আগেই বুলিছি যে, গরু ছাড়া কিছু দেখবি না।তো এইটা দেখতে গেইলি ক্যানে রে গরুর বাচ্চা। মাথা ঠিক হইছে? আমি বললাম,হয়েছে। মহাজন বলে,যে লোকটাকে দেখিছিস সেইটা হামার ছোট ব্যাটা আর পিছনের মাইয়াটা তোর মা।কিন্তুক হামার বাড়ির চাকর যে হয়, তার কুনো বাপ থাকে না। মা থাকে না।তাইলে তুই কে ? আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলি, হামি গরু।মহাজন গায়ে আদর দিয়ে বলে এই তো বুঝিলি। কে বেশি দ্যাখে রে গরু। আমি বললাম, মহাজন দ্যাখে। মহাজন বললো, এই তো বুঝিলি। সামনে বছর তোকে কিষান করিবো।



ঘোর লাগা ঘোর
অতসী।নাকি অতশী। যাই হোক, নামটা ভুলতে পারি না আমি। কি করেই বা ভুলি? তার কবিতার নাম কান্না। গান তো জ্যোস্না চুঁইয়ে পড়ে। সেই রাতে বরেন্দ্রে মতি বাগদী যখন আমাকে পোয়ালের উপর দেয়া চটের সিংহাসনে বসিয়ে চুয়ানি গিলাতে গিলাতে ঘোরটা লাগিয়ে বললো, দাদা বাহিরের মাচায় শুয়ে পড়। দিদিমনি বাতাস দেবে। দিদিমনিটা কে রে হারামী মতি। মতি বলে, কেনে এমন বুলছো গো? সাতে কইরে বরিন্দে আনিলা। সাধ কইরে দিদিমনিটা ঘোর খাইলো, তখন অলরেডি আমি মাচানে পাশে ঐ অতসী। গলায় গুন গুন চলছে, হরি দিন তো গেলো সন্ধে হলো, পার করো আমারে। আহা! আহা! এ যে মধু। জ্যোস্না চোখে টলমল করছে, আর খাবেন? খান। সারারাত গান শোনাবো। আমি বলি, মইত্যা রে। আরেকটু দে বাবা, ঘোর না থাকিলে বাবা গানের ধাত ধরিতে পারিছি বটেক। মতি ফের চার গ্লাস চড়িয়ে দিয়ে বৌ আরতি নিয়ে মাচার পাশে বসলো। এর মাঝেই আরতি দু গেলাস অতসীর পেটে চালান দিয়েছে। গান কি আর থামে।গান আর কান্নাভরা কবিতা। ঘোরের ভেতরেই ভাবি, বিয়েটা করতে হবে। অতসী,তোমাকে ছাড়া আর বাঁচবো না। এটি শব্দে বর্ণিত হলে অতসী, বুকের পাঁজরে কেঁদে দিলো। মানা তৌ করি নি শ্যাম। আজই লাগাও। লাল শাড়ি দাও। হলুদ দাও। পুকুরে চান করে এসো মন্ত্র পাঠ করি। আমি বলি মইত্যা। আরো দে বাবা, শাড়ি হলুদ আন। আমাকে ফের চার আর অতসীকে দুই চালান দিয়ে মইত্তা উধাও।লাল শাড়ি ডিগরামের দোকান থেকে এলো। জমির কাঁচা হলুদ গায়ে পায়ে পড়লো দুজনের। তারপর হাঁটিয়ে পুকুরে নামালো। আরতি আর কটা বাগদীর বৌটা গান লাগালো। স্নান করে উঠোনে একটা বড় ধান পেটানো তক্তায় বসিয়ে দেখি পাশে লাল শাড়িতে অতসী বসছে। মতি আগুন জ্বালিয়ে সাক্ষি বানালো। কি সব বলে ধান দুর্বা দিয়ে বললো, মালিক এই অমৃত স্বর্গের। দুজনে খাও। খেলাম। অতসী খেলো। তারপর আমাদের ঘরের ভেতর খড়ের বিছানায় রেখে বললো বাসর করো। ভোররাতে এলোমেলো শাড়ি পরা অতসীকে হাতের নাগালে পেলাম। অতসী বললো, একি?
কাপড় পরি ক্যামনে?
আমি ভোরের বাতাসে তাকে জড়িয়ে আলে আলে ঘুরে এলাম।
শাড়ি ধানের আর ঘাসের শিশিরে ভিজে একাকার।অতসী ফিরে ঘরে এসে সমার্পিতা হলো। এদিন আর জীবনে ফিরবে না বিভু দাদা।আইসো।অতসীকে ভুলি কি করে। অতসী এলোমেলো অবস্থা গুছিয়ে জলে নামলো।আমি ঘরে ঘোরের ভেতর। একটু সূর্য উঠলে আরতি আমাকে ডেকে উঠানে বসালো।তখন আমার দাদার ইজিচেয়ারে অতসী গাল পেতে দিয়েছে। আর আরতি বাটিতে আনা শিশির সাদা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে তার গালে মেসেজ করে দিচ্ছে। অতসী বলছে আহা বৌদি, কি ঠান্ডা সুখ গো। হামি আর যাইবো না।এইঠে সংসার পাতিবো। ঘোর দাও।খায়। পৃথিবীর জ্বালা থেইকে বাঁচি।এই হলো আমার আর অতসীর ঘোরের সংসার।ভাংবে কি আর। অতসীকে ভুলি কি করে?


কারিগর
কাসা পিতল আর রাং। এই নিয়ে কাঁসার থালা বাটি আর বাসন কোসন। এলাকার সব লোকের খাবার আর সংসার করার জিনিসে জীবনে এইঠে এই কাঁসা পিতল লাগিবে। কিন্তুক কাঁসা পিতল আর রাং গলাইতে কুনটাই কতো তাপ দিবি? আর এক নম্বর মাল তৈরিতে কতোটুকু কাঁসার সাথে পিতল আর পিতলের সাঁতে রাং দিয়া গলাইবি। ততো তাপ দিবি? এইটা যখন শিখিবি তখন হইবি কারিগর। এখন কাম কর। লোক কাজ করে।পুরাতন কারিগরে নতুন মিস্ত্রি বানায়। মাল তো বানাইবি। এক নম্বরির দাম সবাই কি দিবে। তাইলে দু নম্বর আর তিন নম্বরের মিশালও জানিতে হইবে। তাইলে তুই পাকা কারিগর। এইটা মহাজনে শিখায়। তারপর হামরা। বুঝিলি বাবারা। ভোর রাতে উঠে কাঁসা পিতলে ঠোকাঠুকিতে এলাকার লোক বুঝতে পারে ফজর আসছে। সেই কতো শত বছর থেকে এই কাজের শুরু। এখন তামা পিতল রাং ভারতে দেদার সে চোরাচালানের পর মহাজনেরা ব্যবসা থেকে অন্য পেশায় সরে গেছে। শুধু এই গাজলী মাহাজনের গুষ্টি চৌদ্দপুরুষের টাকার উৎস কারখানা ধরে রেখেছে। তারই বড় ছেলে আজ মাহাজন হয়ে গদিতে বসে কারিগরকে সন্ধ্যায় বলে, খবিশ। সে ফের বললো খবিশ। সামনে থেকে মোটা কালো খালি গা লোকটা উত্তর না। কাজে চলে গেলো। আরেকজন এলো। হাতে তৈরি তার তিনটে কলস। এইটুকু? কলস নিয়ে আসা লোকটি বললো, এর চেইয়ে বেশি পারা যাইচ্ছে না। গরমে কাজ করা কঠিন। আকাশ আগুন। ফের কয়লার আগুন। ফের ভোররাইত থেইকে পিটুনি। সোজা করা। গলা ঠিক করা। সব তো হামার হাতে নাই। পাঁচটা কলস ফিনিসিং এ আছে। সবগুলান শেষ হইলে আটটা পুরিতো। যে লোকটা খবিশ বলেছিলো সে লোকটা মহাজন। গাজলি মাহাজন। তিনটের মজুরী দিয়ে কলসের মিস্ত্রীকে বললো, অর্ডার আছে দশটার। জবাব কি? হামি তো আটটাই ফিনিসিংকে দিয়াছি। আট টার টাকা পাবো। দশ না পুরলে হামি কাইল খরিদ্দারকে কি কহিবো? খবিশ।এ বড় জ্বালার কথা। খবিশ নয়। টাকা না পাওয়া। কারিগর গর গর করতে করতে বের হতে হতে বললো, তোমার কাজ আর করবো না। আলেপ মাহাজন ঠিক মতন টাকা দ্যায়। মাহাজন মুখে বললো, তো যা গা। তামা পিতল আর রাং এর মিশেলটা আলেপ জানে? কারিগর বললো, তোমার বাপ জানিতো। শিখিছি। এখন যাই গা। এর ভেতর মোটা খালি গা লোকটা গায়ে সার্ট ঝুলিয়ে এসেছে। সে বললো, সেলাম মহাজন। হামি যাইচ্ছি। কাইল আলেপ মহাজনের কাম ধরিবো। এভাবে ফিনিসিং এর লোকটা এসে কাজ বুঝিয়ে যেতে উদ্যোত হলে, মাহাজন বললো, তো হামি উঠিনু। এইঠে টাকা থাকিবে। কাম কইরে নিজের মজুরী লিয়া যাবি বাবারা।খাম শিখাইলো বাপে। আর এখন যাবি আলেপের কাছে। ইটা কি খবিশি হইলো না, কহা। কাইল ছোট বসিবে। তার কাছে টাকা লিস। তবু বাপের কাম হামি আলেপকে দিবো না। এ কথায় মিস্ত্রিরা চুপে গেলো। তারা চোখ চাওয়া চাওয়ি করে ঘরে ফিরলো। চোখে জল এলো। বুড়ো মাহাজনের কাছে শিক্ষা রাং পিতল আর তামার মিশাল যে জানে সে কারিগর হয়। কারিগর বানাইতে রক্ত পানি হয়। কতো তাপে রাং গলে আর কতো হাতুড়ির বলে তামা সোজা হয় এই শিক্ষা একজীবনে শিখা কঠিন। কারিগর যে বানায়, তার ঘর কি ছাড়া যাইবে? বড় কারিগর কে?



সামান্য একেলা
সমাজ তাকে ছেড়েছিলো।সেখানেই থেকে ষে পেলো স। সাহস করে একাকী বৌটা নিয়ে কিছুকাল খেলো। কেউ তার সাথে মেশে না। পাশের গাঁ এর লোকের কাজ তো কম ছিলো না। মজুরী দিয়েই তারা কাজ করাতো। সাধারণ। অতি সাধারণ কাজ। বেড়া বাঁধা ঘর ছাওয়া অথবা গোয়ালঘর পরিস্কার করা। এসব করে একাকী লোকটি এক ঘড়া জল নিয়ে বাড়ি ফিরতো। বৌটা চুপচাপ রেঁধে বেড়ে খেতে দিতো। খেতো। অতি সাধারণ একটা বৌ। ভীষণ সাধারণ। তাকে স্নান করতে যেতে হতো, হাঁটতে হাঁটতে বহুদূর। মাথা নিচু করে সে সেটা করে একটা ময়লা জোলাতে গা আর কাপড়টা ধূয়ে ফিরে এসে দুটো চাল আর আসার সময় পর গাঁ থেকে কিছু সবজী তুলে এনে একা একা কেটে বেছে খেতো। লোকটার যেদিন কাজ থাকে না, পর গাঁয়ের ডোবায় কাদা খুঁচিয়ে চারটে টাকি মাছে ধরেও এনে বলতো, বৌ রে, তোর বড় কষ্ট। আজ মাছ এনেছি। কেটে দিই। তুই রাঁধ। বৌটা রেঁধে দিতো। যেদিন মাছ থাকতো সেদিন ভাতের কমতি। গলতি টা কি করেছিলো সে যে সমাজ ছাড়া করেছিলো লোকে? মানুষকে পাড়া সমাজটা খেতে দিক বা না দিক শাস্তিটা তারা দিতে পারতো। পুকুর কল চাল ডাল আগুন বন্ধ, তুই হিঁদুর বাড়ির কাজের বেটি এনেছিস ঘরে। ক্যানে? এটা ঠিক লয় বটেক। বৌ ছাড়। লোকটা সাধারণ। নগন্য সাধারণ হয়ে বলেছিলো, ওর কেহ নাই গো। ছাড়ি তো ছাড়ি কোনঠে? থাইকা গা। ক্ষ্যামা দ্যাও। গাঁ বললো, দ্যাকো তো। ইঁদুর বাড়ির কাজের বেটি। জাত আছে রে? নাই। আর তো বেজাইত্তা বাপে যে তোকে থুইয়া মরলো, দুকাঠা জমিতে ঘর আর উঠোন। ধান সিঁজিয়ে খেতে পারিস। তো কামে গেলি একা। আনলি হিন্দুর বাড়ির কামের বেটি। জাতে বাগদি। কে কাম দিবে? একঘরে হয়্যা থাক। এ গাঁ তোকে কামও দিবে না। আগুন পানিও দিবে না। হয়ে গেলো। তো এই জীবনটা সমাজের স টেকে ব্যথা নিয়ে বাপের ভিটায় কবে খায় আর কবে খায় না সেটা কেউ আর দেখে। এই মাছ হলো তো ভাত হলো না তার। সেটাই বা দ্যাখে কে? কেউ আগেও একটা আসতো না। একা থাকতো সে। একাকিত্ব কাটাতেই, ধান কাটতে গিয়ে, ধান কাটা বাগদি মেয়েটাকে দেখে, সেও বড় চুপচাপ। খেদি বুঁচি চেহারা। ধান কাটা শেষে কয়েক মন ধান আর মেয়েটিকে যখন বললো, যাবি কোনঠে? মেয়েটা বললো যাইবার তো জাগা নাই। পরের পাড়িতে কাম কইরে উঠানে থাকিবো। আহা! এ কথাটা মনে লেগেছিলো তৈমুরের। গাড়ি উঠ বলে তাকে তুলে ভোর রাতে গাঁয়ে নেমেছিলো। সকালে পাড়ার মেয়েরা দেখলো পুকুরে একটা সিঁদুর পরা মেয়ে। তাতে গাঁ রটলো। গাঁ রাতেই বললো, দোষ করেছিস। থুয়ে আয়। কোনঠে যাইবে? থাইক। বলে সমাজের সব ছেড়ে একা হতে হলো তাকে। এই ভাতহীন মাছ আর আগুনহীন চুলাও ঠিক ছিলো তাদের। চলার মতো না হলেও অতি নগন্য তৈমুর আর আরতি মিলে দু কাঠা বাপের ভিটেতে চলে যাচ্ছিলো। তাতেও দুজনে পাড়ার ভিতর বিজনে, সে বৌকে জিজ্ঞেস করছিলো, হামার লাগি কষ্ট হয় রে ? চুপচাপ বৌটা বলেছিলো। বেশি চাহি নাই। ঠিক আছে। এই যে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা, এটাও পাড়া প্রধান মানে কি করে? রোজ তো পর পাড়াতে কাজ জোটে। ধান কাটার মৌসুমে দুজনে ধান কেটে খায়। ভিটেটা আর থোয়া যাইবে না বলে ঘরে থাকা আরতি রেখেই যখন বাঁশ বনে তৈমুর গেলো, আগুন জ্বলে নিমেষেই ঘর পুড়লো, কটা ধান বের করার চেষ্টা করতে গিয়ে গরে আটক হয়ে বৌ পুড়ে মরলো। স এর স আর বৌ এর ব। সব হারা তৈমুর ভিটেতে ফের একটা চালা বানালো। এবার সে শোবে। ফের আগুন লাগলে, বাইরে এসে তৈমুর দেখলো, মোড়লের লোক। একশো টাকা দিয়ে বললো, ভিটে মোড়লের। টিপ দিয়া এই টাকা লিয়ে পাড়া ছাড়। তৈমুর কিছুই নিলো। কিছুই দিলো না। শুধু লাঠির আগায় একটা লুঙ্গির পোটলা বেঁধে সে ভিটে ছেড়ে একেলা পথ ধরলো। ঐ পোটলাতে ছিলো, আরতি দুটো সাদা শাঁখা।