Showing posts with label ছোট গল্প. Show all posts
Showing posts with label ছোট গল্প. Show all posts

17 May 2017

মোজাফ্ফর হোসেন





ক.
সুবীর ওর বাবাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে উঠেছে। বছরখানেক আগেই ওদের এখানে আসবার কথা ছিল। তখন বাবা বেঁচেছিলেন। সুবীরের বাবা হরিশঙ্কর কাকা লোকমারফত ভাঙা ভাঙা অক্ষরে পত্র লিখে পাঠিয়েছিলেন, আসবার কথা জানিয়ে। বাবা সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আপ্লুত হয়ে উত্তরও পাঠালেন। এরপর বাড়ির এটা ঠিক করো, ওটা ঠিক করো-এতদিন পর হরি আসছে! বাড়ির সবাইকে অস্থির করে তুলেছিলেন। সীমান্তে যারা কারবার করতো তাদের রোজই একবার করে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতেন- দেখবি, হরির আসতে সমস্যা হয় না যেন! তারপর বাড়ি আর পথ করতে করতে একদিন নিজেই চলে গেলেন। গতকাল সুবীর যখন হরিশঙ্কর কাকাকে নিয়ে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিলো, তখন কেবলই বাবার কথা মনে হচ্ছিল। আমার স্ত্রী তো পেছনে দাঁড়িয়ে কেঁদেই ফেলল। হরি কাকাকে ওই ধরে নিয়ে গিয়ে বসবার ঘরে বসালো। বেশ ভারী শরীরের মানুষটা। হাঁটবার সময় বাচ্চাদের মতো দেখে দেখে পা ফেলেন। সুবীর আমার বয়সই হবে। মিরাকে হাত তুলে নমস্কার করে একটু ইতস্তত করে একটা হাত আমার দিকে এগিয়ে দিল। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে খানিকটা ফিসফিস করে বলল- মেহেরপুরে পা দিয়েই কাকার সংবাদটা শুনলাম। বাবাকে বুঝতে দিইনি। এমনিতেই অনেক ধকল গেছে; এখনই কিছু বলবেন না প্লিজ। অন্যকিছু বলে ম্যানেজ করুন। হরি কাকার দিকে তাকিয়ে বিষয়টা বুঝতে আমার অসুবিধা হলো না। সঙ্গে সঙ্গে মিরাকে আড়ালে ডেকে বললাম- কাকাকে বলো, বাবা ক’দিন মেরেপুরের বাইরে গেছে। চলে আসবে। শরীরটা বিশেষ ভাল না, এখনই কিছু বললে বেশি আপসেট হয়ে পড়লে সমস্যা হতে পারে। হরি কাকাকে মিরার দায়িত্বে রেখে আমি আর সুবীর গেস্টরুমের বারান্দায় গিয়ে বসলাম। সুবীর লম্বা ছিপছিপে গড়নের। ক্লিন সেভড্। ফতুয়ার মতো একধরনের শার্ট আর বেগিজাতীয় ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে আছে। হরিকাকা সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরেছেন। 

14 May 2017

সাদিয়া সুলতানা




চুয়ানির ঢেকুর উঠে মুখটা কেমন টক টক হয়ে গেল বিল্লালের। ‘মালে নিশ্চিত ভেজাল দিছে সাত্তার হারামজাদা। ঠেকের লগে মাগিবাজি শুরু করায় সাত্তাইরার ব্যবসায় ভ্যাজাল ঢুকছে।’ সাত্তারকে গালি গালাজ করতে করতে থেকে থেকে বমি করে বিল্লাল। মনে হচ্ছে পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসবে। বমির দমকে রাস্তায় বসে পড়ে ও। একটা পুরি আর একটা সিঙাড়া পেটের ভেতর যেয়ে অতটা হয়ে গেছে ভাবতে অবাক লাগে ওর। মিনিট পাঁচেক পর বিল্লাল স্থির হয়। মুখে খানিকটা পানি দিতে পারলে আরাম হতো।

25 January 2017

মাহবুব আলী



  
চিৎকারের পটভূমি


আলো জ্বালতে দোমড়ানো আর্তনাদে ভরে গেল রাত। লোকটি দ্রুত উঠে বসে। ফেনিল অন্ধকারে বেরিয়ে যায়। প্রথমবার। যেনবা প্রথমবার নয়। অথচ কি ভয়াবহ পীড়ন! পরদিন কোনো তুলসীতলা নয়। বিছানায় কিংবা সিলিং’এর সঙ্গে লটকানো ফ্যানে নয়। মিলুর লাশ পুকুরের ধারে পাওয়া গেল। এঁদো কাদার হাঁটু জলে। ঘোলাজল। লোকে লোকারণ্য। ফিসফাস গুঞ্জন। কোনোটি বেদনার। কোনোটি নিরাসক্ত। কৌতূহলী প্রশ্ন। মেয়েটি মরল কেন? কীভাবে? নাকি কেউ মেরে রেখে গেছে?

14 August 2016

লিমন মেহেদী


আর মাত্র ছয় মাস তারপর এস.এস.সি পরীক্ষা। হাবিবা এবার পরীক্ষা দেবে। ডাগর ডাগর চোখ পনের বছর বয়সের হাবিবা। সেই এত্তটুকুন বয়স থেকেই মাথা চিবুক ঢেকে টাইট করে হিজাব পড়ে, একান্নবর্তী পরিবারের সদস্য হওয়ায়, বলে-কয়ে এ পর্যন্ত পড়েছে সে। চোখ জুড়ে তার বেড়ে ওঠার স্বপ্ন আঁকাশ ছুঁইছুঁই করে। পরিবারের অন্য কেউ ম্যাট্রিক পাস দেয় নাই এ নিয়ে কিছুটা অহংকারও কাজ করে মনের ভেতর। বড় ভাইয়ের বউরা তাই খোটা দিতেও ছাড়ে না।
-“মাইয়া বড় হয়া গ্যাছে এ্যাহন এ্যাতো পড়া কিসের ভাল পাত্র দেহাই বিয়া দিয়া দিক, সংসার করবো”।
হাবিবা চমকে যায় কিছুটা ভয়ও পায়। বিয়া? এ্যাহন কি বিয়ার বয়স? হাবিবা মনে প্রানে ছোট হতে চায় যাতে তার বিয়ের কথা না ওঠে বাড়িতে। কাজও করে বিস্তর। রোজ স্কুল যাওয়াকালে পাঁড়ার ছেলেরা তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। হাবিবার ভয় লাগে, তবে ইচ্ছে করে টং দোকানে চা খেতে। চা খেলে নাকি রাত জাগা যায় তবে তো সে রাত জেগে বেশী করে পড়তে পারবে। রোজকার এই ইচ্ছাকে একদিন পূর্ণতা দেবে হাবিবা ভাবে। কিন্তু কেই দেখে ফেললে তার পরে কি হবে সেই ভয়ে আতংকিত হয়ে থাকে, রোজকার এই আতংক হাবিবার ভাল লাগে না। ইচ্ছে করে সব ছেড়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যাবে যেখানে সে রাত হলে ছাদে জোসনা দেখতে পারবে সুমীদের সাথে ঘুরতে যেতে পারবে যেখানে টং দোকানে চা খেতে পারবে। হাবিবা দিন দিন বড় হয় আর তার প্রতি পরিবারের বাধ্যবাধকতাও বাড়তে থাকে সেই সাথে বাড়তে থাকে হাবিবার হারিয়ে যাবার প্রবল ইচ্ছা। একদিন কোচিংয়ে এক ছেলের সাথে পরিচয় হয় হাবিবার ওর নাম জামিল।

জামিলের চোখে-মুখে যেন সবাইকে ভরসা দিতে পারার ছায়াটা খুব খেলা করে। হাবিবা মুগ্ধ হয় সেই সাথে হাবিবার সরল মুখখানার মাঝে জামিল ও বন্দী হয় গভীর মায়ায়। এক সময় হাবিবার বিষণ্ন সময় কেটে ছোট ছোট স্বপ্ন পূরণ হতে থাকে জামিলের সাথে। টিপটিপ করা ছোট্ট বুকে ধীরে ধীরে জন্মায় সাহস। জামিলও আগলে রাখে তাকে পবিত্র ভালবাসায়। হঠাৎ করে একদিন হাবিবার বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয় ঠিক হয়ে যায় দিনক্ষণ ও এস.এস.সি পরীক্ষা শেষেই বিয়ে। এলোমেলো ভাবনায় হাবিবার সত্যি সত্যি হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাটা প্রবল হয়ে ওঠে জামিলও শক্ত করে ধরে রাখে তার হাত। ভাল থাকার সীমাবদ্ধতাকে ছেড়ে ওরা পালায় অফুরন্ত ভালবাসার দিকে। মা-বাবা তার ভাল চায়না এই ভাবনার জল চোখে হাবিবা সমাজের নীতিকেও তিরস্কার করে। মাত্র ইন্টার শেষ করা জামিল ভালবাসার হাত ধরে কিছুদিন বাইরে লুকিয়ে থেকে বাসায় এসে ওঠে হাবিবাকে নিয়ে। জামিলের পরিবারে আকাশ ভেঙ্গে পড়ে প্রতিবেশীর সমালোচনায় মুখ ডাকে। কিছুদিন যাওয়ার পর সব ঠিক হয়ে যায়।মা-বাবা ও ছোট বোনটার জন্য মন খারাপ শেষে হাবিবাও গুছিয়ে ওঠে সংসার। দিন কাটতে থাকে একদিন রান্নাবান্না শেষ করে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় হাবিবা দৃষ্টি ফেলে বাইরে একদল মেয়ে খাতা-কলম নিয়ে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে হঠাৎ ছ্যাত করে ওঠে হাবিবার বুকটা জানালার শিকে শক্ত হয়ে ওঠে হাত। আজ এস এস সি পরীক্ষা হাবিবার চোখে পানি চলে আসে জানালার ওপাশে সমস্ত পৃথিবীটাই ঝাপসা হয়ে আসে। হাবিবার স্বপ্ন হারিয়ে যায়। এভাবে হারিয়ে যায় হাবিবা নিজেও।

08 May 2016

মাসুম বিল্লাহ


দুপুরের গল্প
চৈত্রের আগুনজ্বলা দুপুরে বাসায় এল আতাহার। ঠিক কতদিন পর দুপুরেবেলায় বাসায় এল মনে করতে পারে না। প্রতিদিন সকালে বাজারে তার নিজের দোকান খুলে বসে, আবার মাঝ রাতে দোকান বন্ধ করে বাসায় ফেরে। দুপুরের খাবার বাসা থেকে পাশের বাসার মন্টুর বাপ সোলেমান বকশির কাছে দিয়ে দেয় আতাহারের স্ত্রী রেশমা। অনেকবারই সে আতাহারকে বলেছে, আপনে দোকান বন্ধ কইরা দুপুরের ভাত ঘরে আইসা খাইলেতো পারেন।
আতাহার তখন সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলেছে, তুমি যদি ব্যবসার কিছু বুঝতা তাহলে আর এই কথা কইতে পারতা না বউ।

রেশমাও রাগ-অভিমান মেশানো গলায় বলেছিল, ব্যবসা আমার বোঝনের কাম নাই, আমি কী আমার জন্য কই, আমি তো কই আপনের ভালোর জন্য।
তখন আতাহারের সুর নরম হয়ে আসে, বলে, তা কও দেহি কী ভালো হইবো আমার?
রেশমা কণ্ঠ খাদে নামিয়ে মিহি স্বরে বলে, আপনে গা-গোসল দিয়া শান্তিমতন ভাত খাইতে পারতেন, তারপর ধরেন, ভাত খাওনের পর বিছানার উপরে গড়াগড়ি দিয়া আস্তেধীরে দোকানে গেলেন—
আতাহার তখন রেশমাকে কাছে টেনে নিয়ে বলে, ওরে বউ তাইলে আর দোকানে যাওন লাগবো না, ব্যবসা লাটে উঠবো।

অবাক হয়ে রেশমা বলে, ক্যান দোকানে যাইবেন না, ক্যান ব্যবসা লাটে উঠবো?
রহস্যঘেরা কণ্ঠে আতাহার বলে, সেদিন কী আর তোমারে ফালাইয়া দোকানে যাওন যাইবো? আমার ইচ্ছা করবো না তোমারে জড়াইয়া ধইরা দিন-রাইত পইড়া থাকি?
লজ্জা পেয়ে রেশমা বলে, কী শরমের কথা যে আপনে কইতে পারেন! যান আপনেরে আর দুপুরে ভাত খাইতে আইতে কমু না। আজ অনেক দিন পর দুপুরে আতাহারকে চোখের সামনে দেখে ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না রেশমা। চমকে ওঠে সে। চোখ মুখে খুশির ঢেউ খেলতে দেখা যায় তার।
গামছা আর সাবানের কেস স্বামীর হাতে দিয়ে বলল, যান গা-গোসল দিয়া আসেন, এর মধ্যে আপনের ভাত গোছাইয়া দিতাছি।
—আগে ভাত দ্যাও, গোসল একবারে করমুনে বউয়ের থুতনি নেড়ে বলে আতাহার।
—দেরি করলে আপনের ব্যবসা লাটে উটবো না?
রেশমার খোঁচা টের পায় সে।
—উঠোনের কোনো চাঞ্জ নাই বউ, ঠাডা পরা রৌদের মধ্যে মানুষ দূরের কথা একটা কাক-পক্ষীও নাই বাজারে। এক সেকেন্ডের জন্য রেশমাকে ঠোট উল্টাতে দেখল আতাহার। সে কিছু বলার আগে রেশমা রান্নাঘর থেকে মাদুর এনে বিছিয়ে দিল।
ভাত খাওয়ার মাঝপথে আতাহারের মোবাইলের রিংটোন বেজে ওঠল—
ভাত মুখে নিয়ে বিড়বিড় করে সে—হালা কামাইল্লার বাচ্চা...
তারপর বাম হাতে মোবাইল কানের কাছে নিয়ে চেঁচিয়ে বলে, তোরে না কত্তদিন কইছি লাঞ্চ টাইমে মাল নিতে আইবি না, আজ দোকান বন, বউ লইয়া শ্বশুর বাড়ি আইছি—
কথা শেষ করে মোবাইল মাদুরের ওপর ছুঁড়ে মারল সে। মোবাইলের পাওয়ার অফটোন বেজে উঠতে শোনা গেল। রেশমাকে উদ্দেশ্য করে আতাহার বলে, বুঝলা বউ, এই হালা কামাইল্লা একটা ভ্যাজাইল্লা কাস্টমার!
রেশমা স্বামীর প্লেটে আরেকটা টেংরামাছ তুলে দিয়ে বলল, কাস্টমারের লগে মেজাজ দেখাইলে আপনের ব্যবসা লাটে উঠবো না?
—এ্যাঁ আইছে আমার দরদী, যার লাইগ্যা করি চুরি, হ্যায় কয় চোর, ঠিক আছে অখুনি তাইলে দোকানে যাই...
—থাউক হইছে, আর বেশি প্যাচালে কাম নাই, ধীরেসুস্থে খান...
—তুমি খাইবা না?
—আপনে জানেন না, ভাত খাইলে আমার শরীর ছাইড়্যা দেয়?
আতাহার আর কথা আগায় না, দ্রুত ভাত খেয়ে বিছানায় শরীর এলিয়ে দেয়। তারপর রেশমাকে কাছে ডেকে বলে, আসো,
এ সময় পাশের বাসার মন্টুর বাপ সোলেমান বকশি এসে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে চি
ৎকার করে ওঠে, "ওরে আতাহারইয়্যা মোবাইল বন্ধ কইরা রাখছো ক্যা, তোর দোকান তো পুইড়া শ্যাষ!"




দুপুরের গল্পের পর...
আগুনে পুড়ে যাওয়া আতাহারের দোকান ঘরটা কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল কিছুদিন। বাজার কমিটি তাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু নগদ অর্থ দিতে চেয়েছিল কিন্তু সে সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেয়। নিয়তির ওপর কারো হাত নেই, তাছাড়া অন্যের সাহায্য নিতে চায় না সে। সবাই তখন অবাক হয়ে বলেছিল, কী কও মিয়া, ট্যাকা লইবা না ক্যান?
আতাহার স্বহাস্যে বলেছিল, নতুন কইরা দোকান করার ইচ্ছা নাই।
আবারও সবাই দ্বিগুন অবাক হয়ে জানতে চায়, তাইলে করবা কী? ব্যবসাপাতি না করলে চলবা ক্যামনে?
আতাহার রহস্যঘেরা কণ্ঠে বলে, কিছু না কইরা তো আর থাকোন যাইবো না, তয় অখনও কিছু ঠিক করি নাই, ভাবতাছি কয়দিন ঘরে মইদ্যে শুইয়া-বইস্যা পার করমু।
আতাহারের এ কথায় সবাই মুখে কিছু না বললেও মনে মনে তারা নিশ্চিত হয়, দোকানের শোকে মাথামোথা আউলা হইয়া গ্যাছে।
আর্থিক সাহায্য ছাড়াই আতাহার ঘুরে দাঁড়াতে চায়, অতীতেও সে নিজের চেষ্টায় সে এই দোকানটি দাঁড় করেছিল। আবারও সে কিছু একটা করবে, সে জানে সে পারবে। পুড়ে যাওয়া দোকানটির শোক তাকে গত সতেরো দিন ঘরের ভেতর বন্দি করে রাখল। প্রতিদিন চোখের সামনে তার ব্যস্ত দোকানটি ভেসে উঠত, একটার পর একটা কাস্টমার সামলাতে ব্যস্ত সে। ঘোর কাটতেই বুকের ভেতর থেকে নীরবে দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসতে লাগল।
স্ত্রী রেশমাও ঘুরেফিরে নিজেকে দোষ দিতে লাগল, দুপুরে না আইলে এই বিপদ হইতো না।
আতাহার জোরে হাসি দিয়ে বলে, তোমার যত বেহুদা কতা, দোকানে থাকলেই কী আগুন আমারে দেইখ্যা নিবভা যাইতো? একটু থেমে নিজেই বলে, যাইতো না বউ, তুমি এইসব কতা আর কইবা না কইলাম।
-এখন কী করবেন, ঠিক করছেন কিছু?
-হ ঠিক কইরা ফালাইছি, ঘরেই বইসা থাকবো আর তোমার লগে গপসপ করবো।
হো হো করে বেদম হাসিতে ফেটে পড়ে আতাহার।
কিন্তু রেশমা সে হাসিতে যোগ না দিয়ে বলে, বইসা খাইলে রাজার গোলাও শ্যাষ হইয়া যায়, কামকাইজ কিছু একটা করেন।
-ঠিক করছি বিদ্যাশ যামু, ট্যাকা কামামু তারপর দ্যাশে ফিইরা পায়ের ওপর পা তুইল্লা খামু।
-বিদ্যাশ যাইবেন, তা ট্যাকা পাইবেন কই?
-আরে বউ ক্যাশপাতি কিছু তো আছে, তোমার স্বামীরে এত ফকির ভাবলা কেমনে?
-হাছাই বিদ্যাশ যাইবেন আপনে?
-তোমার লগে মিছা কতায় কাম কী বউ?
-কবে যাইবেন, কবে আইবেন, ব্যাবাক ঠিক কইরা ফালাইছেন নাকি?
-আগামী মাসেই যামু, পাঁচ বছর ছাড়া আর দ্যাশে আইতে পারুম না।
-ও।
রেশমা আর কিছু বলে না। সে এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, আতাহার যা বলল তা কতটুকু সত্য, তবে স্বামীকে সে পুরোপুরি অবিশ্বাসও করেনি কখনো।

আতাহার একটুও মিথ্যে বলেনি, ভেতরে ভেতরে সব ঠিক করে ফেলেছে, সে বিদেশই যাবে, একবারে বেশ কিছু টাকা কামিয়ে তারপর দেশে ফিরে আসবে।
মাঝের এই কয়েকটা দিন তার বেশ দৌড়ের ওপরই গেল। দেখতে দেখতে তার যাওয়ার দিন সামনে চলে এল।
এবার যেন রেশমার মন খারাপ হওয়া শুরু হলো কিন্তু স্বামীকে তা টের পেতে দিল না, কারণ পুরুষ মানুষ তো বাইরেই থাকবে, টাকা-পয়সা রোজগার করবে, তা না হলে যে সংসার চলবে না। সবই বোঝে রেশমা।


রাত ভোর হলে আতাহার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে। রাতটা রেশমার সঙ্গে গল্পে-অালাপে কেটে গেল।
দুপুরের আগেই সে ঢাকায় পৌছে যায়। রাতে তার ফ্লাইট। হোটেলের রুমে ঘন্টা খানেক বিশ্রাম নিয়ে বিমানবন্দর পৌঁছে গেল সন্ধ্যার পরই।
রাত দশটার ফ্লাইট আতাহারকে ছাড়াই উড়াল দিল। আতাহার বিমানে উঠেনি, সে উঠেছে তার বাড়ির ঠিকানায় যাওয়ার বাসে। ভোরের আগেই সে বাড়ির উঠোনে পা রাখল। চি
ৎকার করে ডাকল, ও রেশমা ও রেশমা দরজা খোল...
রেশমা স্বামীর কণ্ঠ চিনতে দেরি করেনি, তবে বুকের ধুকধুক বেড়ে গেল, দরজা খুলে আতাহারকে দেখে বলল, আপনে বিদ্যাশ যান নাই?
-আমারে কি পাগলে কামড়াইছে যে বিদ্যাশ যামু?
-ট্যাকা-পয়সা খরচ কইরা কীসব কইতাছেন আপনে?
-ট্যাকা-পয়সার কোনো ব্যাপার না রেশু, বউরে দ্যাশে ফালাইয়া বিদ্যাশ যামু, তোমার আতাহার এতো বলদ না।

তাপসকিরণ রায়




চুমকি ছিল দশ বছরের। রমাকান্তর বার হবে। 
মন বন্ধ করে রাখার দরজা থাকে না। তাই ফেলে আসা জীবনের স্মৃতিকে বেশী দিন দূরে সরিয়ে রাখা যায় না। রমাকান্তর কাছে সেদিনের চুমকি ছিল ক্ষণিক বিচ্ছুরিত হয়ে উঠা একটি মেয়ে। টানা টানা চোখ, একটা আলাদা ছাপ মাপের সাঁচে যেন তৈরি ছিল সে। ওরা দু জনেই এক ক্লাসে, এক স্কুলে পড়ত। 
উঠতি বয়সের টান ছিল না, তবু আলতো একটা মন ছিল, ভাল লাগার একটা মন। 
চুমকি বলত, রমা তুই আজ পড়ে আসিস নি বুঝি!
রমাকান্তর মনে লাগত, তিনি বলে উঠতেন, কেন?
গালে হাসি ধরা থাকত চুমকির আমি দেখছিলাম, ক্লাসে তুই ঝিমচ্ছিলি?
সত্যি রমাকান্ত ঝিমচ্ছিলেন, তবু নিজের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে তিনি বলে উঠে ছিলেন, কই-না তো? একটা ছোট মেয়ের কাছে তাঁর দুর্বলতা ধরা পড়া সাজে না। 
-দুপুরে খুব টো টো করে বেড়াস বুঝি? 
-তোর এত পাকামির কি আছে? তুই আমার গার্জিয়েন নাকি?
-আমি তোর সব খবর রাখি, এমনটা বলে চুমকি হাসত--রমাকে রাগিয়ে ওই বয়সী মেয়েটা যেন মজা পেত! 
সত্যি, রমাকান্তর কিন্তু সে সময়টায় পড়া লেখায় তেমন মন ছিল না। দুপুরে সুযোগ পেলেই টোটো কোম্পানি করে বেড়াতেন। 
সেদিন রমাকান্ত দেখলেন, চুমকি ভর দুপুরে একলাটি ওদের বার বারান্দায় দাঁড়িয়ে। 
রমাকান্ত বলে উঠলেন, এ সময় তুই এখানে দাঁড়িয়ে কি করছিস?
চুমকির মুখে দুষ্টুমির হাসি, তোকে পাহারা দিচ্ছি--দেখি রোজ দুপুরে তুই কোথায় যাস!
-আমি যেখানেই যাই তোর কি রে? রমাকান্ত কথাটা বললেন বটে, খানিক পরে তাঁর মনে হল, চুমকি তাঁর সঙ্গে আসলে, খারাপ কি?
ভাল লাগা ছুঁয়ে থাকার বয়েস হতে পারে এটা কিন্তু এ বয়সে ভাল লাগা ঘন হয়ে উঠতে পারে না। ওদের মন তো তখন ডাঁসা হতে পারেনি। তবু ছেলে আর মেয়ের শারীরিক আঁচ পরস্পরকে স্পর্শ করতেই পারে ! রমাকান্ত সেদিন বলেই বসলেন, যাবি নাকি আমার সঙ্গে ?
-কোথায়?
-আমায় পাহারা দিতে?
-না রে, কথাটা বলে তারপর চুমকি এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল, না চল, যাবো
দুজনে চলেছে। তাদের মাঝে প্রখর রোদের অনুভব নেই, সতেজ একটা ছন্দ ফুটে উঠছিল ওদের চলনে। সামনে মল্লিকদের ইটখোলা। আশপাশে ঝোপঝাড়ের জঙ্গল।
-এখানে কি করতে এলি?
-খেলব বলে
-না, আমার ভয় করছে
তবু ওরা রোদছায়া মেখে ঘুরছে।
-খুব ভাল লাগছে, চুমকি বলে। 
-এবার চল চুমকির একটা হাত ধরেন রমাকান্ত। 
চুমকি রমার গা ছুঁয়ে আছে। ওরা উচ্ছল, ওরা গাছের ছায়ায়, রোদের আবডালে, ইটখোলার ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের মুখে কথা নেই, সেদিনের পড়ন্ত দুপুর এত ভাল লাগছিল কেন তা বোধহয় ওরা নিজেরাও জানে না!  বয়সের মাঝেই বয়সের লুকিয়ে থাকা। খেলাগুলি আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছিল। বারবার ওরা একে অন্যের দিকে তাকাচ্ছিল। চুমকির গায়ের লাল রাঙা ফ্রক হাওয়ায় উড়ছিল। ওরা দেশ কাল ভুলে ছিল, সেই অকাল বসন্ত বেলায় ওরা হাত ধরাধরি করে দুলছিল। গায়ে গা মাখাচ্ছিল। চুমকি ও রমাকান্ত কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছিল, আবার জেগে উঠছিল। মলয়জ শীতল বাতাস ওদের অনুভবের রন্ধ্র দ্বার না খুলতে পারলেও স্তিমিত জেগে ওঠা মন সে দিন ওদের দুজনকে আরও আরও কাছে টানতে চাইছিল।