Showing posts with label রুখসানা কাজল. Show all posts
Showing posts with label রুখসানা কাজল. Show all posts

08 May 2016

রুখসানা কাজল



অর্ধ সত্য
ট্রিং ট্রিং!
ইনবক্সে মেসেজ এসেছে।
-কেমন আছ?
রাত এগারোটা কুড়ি মিনিট। এই রকম নিরীহ আলুনি প্রশ্ন করার বন্ধু ত নয় রুহুল! শয়তানি করতে ইচ্ছা করল শামিমার আহারে আমার জন্যে কত ভাবনা আমার বাল্যবন্ধুর! ভাল আছি দোস্ত। তুই?
প্রশ্নটি করেই বুঝল মরিচ্চি। এবার সাত কাহন শুরু হবে। বউ থেকে বিছানা কিচ্ছু বাদ যাবে না।  
-তুমি তো আমার খোঁজ রাখো না। কেমন আছি কখনো জানতেও চাও না!  ন্যাকা নেকুমি শুরু করবে বুঝেই শামিমা আগে ভাগেই বলে দেয়, শরীর ভাল নেই তাই ফেবুতে বসা হয় না তেমন। আর ব্যস্ত ভীষণ । এবার আন্তরিক গলায় জানতে চায় রুহুল –কি হয়েছে? ডাক্তার দেখিয়েছ? 
-হ্যা রেস্ট করতে বলেছে। তা তোমার ছেলেমেয়ে কেমন আছে? মেয়ে ফিরেছে ইউএস থেকে?
–নাহ। বুঝলে ভেবেছিলাম মেয়ে বড় হলে আমাকে বুঝবে। আমার ভাগ্যটাই খারাপ মেয়েও ওর মার মত আমাকে কোন পাত্তা দেয় না। সংসারে সারা জীবন তেজপাতা হয়ে থাকলাম। তুমি কি কর এত রাতে? তোমার ভাবি ত খালি ঘুমায়। পাশে যে একটি পুরুষ মানুষ জেগে আছে তা বোঝে না। আবার নীল গলিতে ঢুকতে চাইছে রুহুল।  
-তা তুমিও ঘুমাও ।
–ঘুম যে আসে না। খালি তোমার কথা মনে পড়ে ময়না। তোমার জন্যে কেন এত মন পোড়ে বল ত সোনা?
কেস স্পন্ডেলাইটিস। হালকা গলায় শামিমা বলে, তুমি মনে হয় চৌকিদার বংশের লোক। এক কাজ কর হাফ প্যান্ট পরে বাঁশি হাতে নেমে পড়। পাড়ার চোর পালাক।
গভির দুঃখ নিয়ে রুহুল বলে, পাড়ার চোর পালালে কি মনের চোর পালায় ডার্লিং? আমার ঘুম তো তোমার কাছে। এই এই একটি সত্যি কথা বলবে মনা?  তোমার পেটে কি দাগ আছে? মানে প্রেগন্যান্সি স্টার্চ মার্ক?   
একেবারে মধ্য প্রদেশ থেকে শুরু করেছে । এরপর নিচে নামতে শুরু করবে ! কেস জাপানি তেল। শুয়োরের বাচ্চার সাহস নেই সানি লিওনদের দেখার। বউয়ের ভয়ে   মেয়েও তুলতে পারে না। দুজনেই বিসিএস ক্যাডার। বউ ঘুমালে ফোনে ফেবুতে মেয়ে বন্ধুদের সাথে কথা বলে সস্তায় গরম হতে চায়। গাধার বাচ্চাটা ব্লক খাচ্ছে। তাও বোঝে না।– তোর না সোসিওলোজি ছিল ? একটু পড়াশুনা ত করতে পারিস! এগুলো যদি ভালবাসিস তো বাৎস্যায়নের কামসূত্র পড়ে দেখ। রাখছিরে – অস্ট্রেলিয়ার ফোন এসেছে—ভাল থাকিস –বাইইইই--
হাসে শামিমা। রেকর্ড করা রিংটোন চালিয়ে দিয়েছে। রুহুলের সাথে এই করে ওরা। কতবার বুঝিয়েছে, সব অনুরোধ উপদেশ বৃথা করে যে লাউ সেই কদু। কুকুরের লেজ ঘি দিয়ে টানলে কি আর সোজা হয়!  



বৈধতা
ইচ্ছাপূরনের বাস স্টপেজ। আমরা এসেছি  ঘুরতে। বহুদিনের ইচ্ছা ছিল লাল  দোতলা বাসে চড়ে ঢাকার কোন এক শেষ বাস স্টপেজে নামব। দেখে নেব শহরের আপাত শেষ কামড় খেয়ে কেমন আছে শহরতলির সবুজ মাটি, মানুষ আর প্রকৃতি। সঙ্গী হিসেবে সচিবের কাছাকাছি এক কবি বন্ধুকে ডেকে নিই। পচা কুমড়োর মত মুখ করে এসে দাঁড়ায়। “ছাগল মার্কা সখ তোর। দিবে একদিন কেউ হাঁড়িকাঠে ঝুলিয়ে। তখন বুঝবি।”
বাতাসে উড়িয়ে দিই ওর তেহাই। কিছু কিছু মানুষ আছে সব কিছুতে অসুখী হতে ভালোবাসে। এই বন্ধুটি তেমন এক অসুখী ড্রামাবাজ। আমরা অনেকেই জানি ছুটির দিনগুলো হল ওর পরকীয়া দিবস। সারাদিনের ব্যস্ততায় জমা শরীরের জট ভাঙ্গে ও  নিত্য নতুন বান্ধবীদের ঘন গোপন সান্ন্যিধ্যে। বাচ্চা বাচ্চা প্রেমিকা জুটিয়ে আনে কি করে যেন। একটি ব্রান্ডের ব্যাগ, দামী সালোয়ার স্যূট কিম্বা ঘড়ি, স্মার্ট  মোবাইলেই কাজ সেরে নেয়। বেচারা লমেটু মুখ গোমড়া করে সিগারেট খাচ্ছে বসে বসে।    

ওকে পাত্তা না দিয়ে নতুন শিং ওঠা ছাগলাছানার মত ছুটে ছুটে দেখি চারপাশ।  কতদিন এমন আধা শহর দেখিনা। একটি কাঁঠাল গাছ হাত পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে ষ্টেশন চত্বরে। ছেলেবেলার মত লালচে পাতাগুলোর বোঁটায় শক্ত আঙ্গুল দিয়ে  নাড়া দিতেই ঘুরে ঘুরে ঝরে পড়ল পাতারা। দূরে মরিচ জবার বেড়া দেওয়া একটি বাড়ি দেখা যাচ্ছে। প্রশস্ত উঠোনের তারে  উড়ছে হরেক রঙের ছোট বড় জামা কাপড়। একটি কালো সাইকেল জানালার পাশে হেলান দিয়ে রেখেছে কেউ। তার পাশে লেবু, করমচা, গন্ধরাজ আর কাঠগোলাপসহ কি এক ঝাঁকড়া গাছ বোঝা যাচ্ছে না ঠিক। কাঠের গেট দুলছে অবারিত আহবানে। খুব ইচ্ছা করে একবার বাড়ির ভেতরে যেতে । এরকম বাড়িতে নিম, পেয়ারা, কৃষ্ণচূড়া আর হাসনুহেনা গাছের সাথে খুব মায়াময়ী একজন মা থাকে । গেট পেরিয়ে উঠোনে পা রাখলেই যে মা বলে উঠে, কখন এলি ছোটন ? আয় শরবতটা খেয়ে নে। ঘেমে গেছিস যে!”  চোখ ছেপে জল নামে। আমার মা নেই সেই কবে কিশোরী বেলা থেকে। আমি মনে মনে মার ছবি বানিয়ে কল্পনায় রঙ দিই। অদেখা মার মুখে ভাষা দিয়ে নিজেও কথা   বলি, এইত এলাম । মাগো বসন্তবরণের ফাংশনে কিন্তু হলুদ শাড়ি সবুজ রঙ কিনে দিতে হবে। মিস বলে দিয়েছে।”

মেয়েটি কখন এলো দেখতে পাইনি। জিরো ফিগার। বুকের উপর লেপ্টে আছে শিশুটি। স্থলপদ্মের রঙ্গে রাঙা তার দুই গাল। মায়ের কোলে অথই নিরাপত্তায় থেকে জুল জুল করে দেখে নিচ্ছে আমাদের। কি আদর আদর মুখ। ছুঁয়ে দেব ভেবে এগিয়ে যেতেই বন্ধুটি এক তীব্র থাবা দিয়ে টেনে আনে। “ উহুম ছুঁতে নেই। ওরা রাতের মেয়ে।” “তো” “ন্যাকা  চৈতেন। চল—” বন্ধুর মুখে ঘৃণাময় তাচ্ছ্যিল্য। নিত্য নতুন নারীসঙ্গ প্রিয় বন্ধুটি একবারের জন্যেও চোখে চেখে নেয় না মেয়েটির বুক, পেট, ঠোঁটের অনন্য ভাঁজ । অন্য সময় মেয়ে দেখলেই লালা ঝরে ওর। এখন বৈধতার আস্ফালনে উড়িয়ে দিচ্ছে দামি ধোঁয়া। আমিও ছোবলে বিষ ঢেলে দিই। “ অহ রিয়েলি! তুই যে বউ ফেলে রোজ মেয়ে তুলিস তারা কোন বেলার মেয়ে রে?  কি দেয় তারা তোকে ? নিমের ঝোল ? তখন বৈধতার চুক্তিটা কোথায় রাখিস ? গল্পে, কবিতায় নাকি ইনবক্সে ?”  

মেয়েটির মুখেও ফিনকি দিয়ে উঠে ফিরতি তাচ্ছ্যিল্য। দুচোখে কখনো ঘৃনা, কখনো ঘন মেঘের কান্না কখনো বা বক্রবিদ্যুতে মাখামাখি শ্লেষ। কিন্তু সব ছাপিয়ে মাতৃত্ব  এসে মুছে দিচ্ছে ওর মুখের তেরিয়া ঘৃনাভাব। খুব চেনা চেনা লাগে এই মাতৃমুখ। 
বিপদে সংঘাতে, প্রতিবাদে প্রতিরোধে আমাদের মায়েরাও কি এমন খোলা তলোয়ারের মত মুখিয়ে উঠত না? সন্তানের জীবন রক্ষায় তাদের চোখেও কি জ্বলে উঠত না এমন ভয়াল আগুন ? মুহুর্তে একটি ত্রিনয়নের উন্মোচন ঘটল কি মেয়েটির মধ্য কপালে? অসুর বধে কত চেনা এই মাতৃমূর্তি। নাকি মাতা মরিয়মের মুখ ! শিশু যীশু কোলে ঝড় জল বরফগলা পথে হেঁটে চলেছেন একা একাকী এক সাধ্বী নারী! সভ্যতার আলো দিতে এই  শিশুকে যে বাঁচাতেই হবে। দু পায়ে দলে যাচ্ছেন হলুদ বিদ্রুপ বাণ। অশ্লীল বাক্যবাণ। চকিতে বদলে যায় সেই মুখ। এতো আদি জননী বিবি হাওয়া। জলপাই  গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শিশু কোলে। অনাবৃত বুকে তীব্র অহংকারে জমে আছে  মাতৃত্বের সজল ঘন উচ্চতা। দূরে জলপাই বনে খেলায় মেতেছে অন্য শিশুরা। ওই  যে বার বার হোঁচট খেয়েও আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে যে নগ্ন উদোম শ্যামা শিশুটি সে তো আমি! বাবা আদম গেছে কাঠ কুড়াতে।
আচ্ছা কে বলতে পারবে জননী হাওয়ার সাথে বাবা আদমের বিয়ে কবে, কোথায়  কোন স্বর্গ বা নরকে হয়েছিল? কে পড়িয়েছিল সেই বিয়ে ? সে কি কোনো হুজুর নাকি কোনো সোনালীডানা ফিরিশ্‌তা? কারা ছিল সেই বিয়ের সাক্ষী ? কত টাকার মোহরানা ছিল? বৈধতার চুক্তিপত্রটি কি আছে সযত্ন সমারোহে? নাকি আমরাও-



মাতালের সাম্য ভাবনা
চম্পা মিশন ইশকুলে আমাদের সাথে পড়ত। প্রথম কয়েকদিন আমাদের সাথেই বসেছে। গল্প করেছে। খেলেছে। হেসেছে। কিন্তু একদিন বড় সিস্টার এসে ক্লাশ মিসকে ডেকে বারান্দা দেখিয়ে কি যেন বলে দিল। চম্পাকে মিস ক্লাসরুম ঘেঁষা বারান্দায় গিয়ে বসতে বল্ল। চম্পা বসল কিছুদিন  তারপর একদিন ইশকুলে আর  এলোই না।
চম্পার বাপু সুইপার । রোজ সন্ধ্যায় মদ খেয়ে চৌরঙ্গিতে নাচে গায় তামাসা করে। লোকেরা ভিড় করে দেখে হাসে। দুখীরামের বউ হাত ধরে, ই মরদ ঘরকে চল্‌ না কেনে! যেতে যেতে দুখিরাম গান গায়, পৃথিবী আমাকে চায়, কিন্তু আমার বউকে কেউ চায়না। ভিড় জমে জনসভা। মাঝে মাঝে  চম্পাও আসে বাপুকে নিতে। আমরা এখন বড় হয়েছি। চম্পার সাথে কথা  বলিনা, খেলিনা। চম্পাও কথা বলেনা, দেখেও দেখে না। সরকারী ইশকুলে চান্স পেয়ে দল বেঁধে ইশকুলে যাই। একসাথে চীৎকার করে কবিতা পড়ি, গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান, নাই জাত পাত-
চম্পা ইশকুলের বারান্দা, মাঠ, বাথরুম পরিষ্কার করে। বাথরুমের কাছে বড় বড় বালতি, ইয়া বড় ডাইনি ঝাড়ুর পাশে মেঝেতে বসে থাকে। আমরা আরো বড় হতে থাকি । একদিন মাথায় সিঁদুর দেখে বুঝি চম্পার বিয়ে হয়ে গেছে। সুইপার কলোনির কাছে বাসা বন্ধু শামিমার। নাক সিটকে ঘেন্না ঘেন্না মুখ করে বলে ওরা মদ খায় জানিস। মেথর ত তাই মদ খায়।
ভদকা মার্টিনির গ্লাসটি মুখে নিয়ে গলে যাচ্ছে শামিমা। গমগম করছে বৈশাখী আসর। নাতাশা গাইছে, একদিন বাঙ্গালী ছিলাম রে – আমরা গ্লাস হাতে দুলতে দুলতে তাল দিই, বাঙ্গালী ছিলাম রে। মানিক কপালের উপর গ্লাস রেখে ক্যারিক্যাচার দেখায়। তুলিকাকে নিয়ে ড্যান্স করে, গান গায় জড়ানো গলায়, পৃথিবী আমাকে চায় -আমি শামিমাকে দেখি শামিমা আমাকে। বেহেশতি তরলে হাসতে হাসতে আমরা ভেসে যাই। গড়িয়ে পড়ি ইশকুলের বারান্দায়। বড় বড় বালতি আর ডাইনি ঝাড়ুর পাশে থেবড়ে বসে শামিমা বলে, মদের কোন ক্লাশ ফ্লাস নাই বুঝলি! আর অই জাতপাত? সব শালা মাইনষের বানানো! দেখ্‌ তো আমার লুক চম্পা চম্পা লাগছে কিনা!



ইমফ্যাচুয়েশন
রুমকি মাঝে মাঝেই ধপাস ধপাস প্রেমে পড়ে। কারো ছবি দেখে, কারো গল্প কবিতা পড়ে কাউকে আবার  সামনা সামনি একটু হাসি, গোছানো দাঁতের সারি সংবদ্ধ ঠোঁট দেখে। পুরুষটি হয়ত  জানেও না । কিন্তু রুমকি মরে।  তবে অই একদিন দুই রাত। খাঁটি প্রেমিকার মত  সৎ, মায়াময়, একেবারে সব দিয়ে থুয়ে আস্তে ধীরে আবার নিজের কাছেই ফিরে আসে।
এই একদিন দুই রাত ধপাস প্রেমিকের সাথে সে সারাজীবন কাটিয়ে দেয়। বিছানা বালিশ থেকে তরিতরকারী মাছ মাংস ছেলেমেয়ে তাদের বিয়ে শাদি এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত কল্পনা করে তিনদিনের মাথায় ওর মায়াজমের ইতি ঘটে। বান্ধবীকে বলে, তোর হয়?  
স্বামির শার্ট ভাঁজ করতে করতে বান্ধবী জানায় , খুব হয়। ইনফ্যাক্ট সবার হয় রে  গাধা। পঁয়ষট্টি বছরের এক বিধবা নারীলেখক অকপটে  জানায়, হুম আমারো হয়। এই তো সেদিন নারায়ণগঞ্জে এক বিয়েতে একজনকে দেখে কিছুতেই রাতে ঘুমুতে পারিনি। শেষে কল্পনায় জড়িয়ে আদর করে একসাথেই ঘুমালাম।  
ওযযা, বলে কি!  তার মানে সে একা এই রোগে ভোগে না। 
রুমকির আবার একটু বাম রাজনীতির গন্ধ থাকলে হেভি লাগে। বাম হাতে এলাচ  লেবু কচলানোর মত। চুল ঠিক করার ফাঁকে ফাঁকে বামহাতের আঙ্গুল শুঁকে টুকটুক  চুমু খাওয়া এই আর কি। এই দুদিন ভাত পোড়ে, ডাল শুকায়, তরকারী আলুনে হয়, চায়ে নুন গলে , আলুভর্তায় সর্ষে তেলের জায়গায় মধু ঢালে। কর্তা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে চেয়ার উলটে অফিস চলে যায়।  অনেক রাতে বান্ধবীর সাথে ডিনার সেরে ঘরে ফিরে মেয়েদের রেসলিং  দেখে। 
বান্ধবী সাইকোলজির বই খুলে ইনফ্যাচুয়েশন চ্যাপ্টার বের করে বলে, ভাল করে পড়। মেয়েরা চুপিয়ে রাখে। কেননা মেয়েদের ডিল্যুশন বেশি। ছেলেরা পাকিয়ে ফেলে কারন তাদের সেক্স আগে। এই একদিন দুই রাতে কারো কারো চেনা পৃথিবী সারা  জীবনের জন্যে উল্টে যায়, কেউ কেউ সামলে নেয়।  সামলে নিলে বন্ধুত্বটা জমে ভাল। তোর আছে?

আছেই তো। দেখিস না কায়সারের অফিসে গিয়ে কত গল্প করি। যখন তখন ফোন করি। বরের নামে ছেলেমেয়েদের নামে সারা দুনিয়ার সবার নামে কত নালিশ করি। চা ফা খেয়ে আবার ঘরে ফিরি। বন্ধুত্বে একটি ভালবাসার নদী থাকে। ইচ্ছানদী। ন্যাংটো। মায়াবি। সে নদিকে সহজ সরল আনন্দে সব কথা বলা যায়। আমি খুব চঞ্চল তাই কি নদীটা পুকুর হয়ে ভরে যায় ? এত করে চাইলাম সায়ক কিছুতেই বন্ধু হল না ! 
পঁয়ষট্টি বছর হাসে। আমি আগেই বুঝেছিলাম। সব সময় ফর্মূলা খাপ টু খাপ খাটে না। সায়ক কখনো তোমার বন্ধু হবে না। ও তোমাকে রক্তমাংসে চেয়েছিল। পায়নি এবার ফাঁক পেলেই বরং খোঁচাবে। লেখায় দেখায় কথায় বন্ধুতে শত্রুতে আড়ালে সামনে। ওর অহং বোধ চরম। এরা প্রেমিক থেকে কিছুতেই বন্ধু হতে চায় না। একপেশে অন্ধ বদ্ধ টাইপ মানুষ। যতই বাম কবি হোক না কেন।

কায়সারের সাথে  ফোনে পিকনিক স্পট নিয়ে দুমিনিট ঝগড়া শেষে লাভ য়ু বলে হাসে বান্ধবী, সবাই কি বন্ধুত্বের ভালবাসা নিতে জানে নাকি রে পাগলি? নিতে এবং  দিতেও জানতে হয়। তুই চেষ্টা করেছিস ব্যস রেখে দে এবার। অনেস্টলি সরে আয়।
রুমকি ফুলকপি পাকোড়া ভেঙ্গে খেতে খেতে সায়ক থেকে সরে আসে। শালা বাঞ্চোত! নিজেই উইক হয়ে এখন নিজেই নিজেকে লুকোচ্ছে। বাজে খচ্‌ দিচ্ছে সবাইকে। রুমকি নাকি নিত্য নতুন পুরুষ চেটে আনন্দ পায়। রুমকি ঠিক করে ইনফ্যাচুয়েশনের দুই পাতা কপি করে সায়ককে পাঠিয়ে দিয়ে সিস্টার নিবেদিতাকে নিয়ে লিখতে বসবে। কার ইনফেচুয়েশন আগে কেটেছিল? সিওর নিবেদিতার। তাই তো পরম মায়া নিয়ে সিস্টার নিবেদিতা হতে পেরেছিল।   
 


03 March 2016

রুখসানা কাজল


হলুদ সম্পর্ক

ওদের বারান্দা আর এদের কিচেনের দূরত্ব মাত্র আড়াইফুটের। যে কোন মূহূর্তেই দেখা হচ্ছে দু পরিবারের যে কারোর সাথে। রাত বারোটায় ভাত গরম করছে রায়া, একতা বারান্দায় মোবাইল করছিল। গ্রিল ধরে ঝুঁকে পড়ে, আন্টি আপনার শার্টটা  ফাটাফাটি হইছে। কই থে কিনছেন? ঢাকা কলেজের সামনে থে?” রায়া হাসে, নারে। ধানমন্ডি আনাম মলে রিডাকশন সেল হচ্ছিল, সেখান থেকে।” মিনতি বউদি ডাক দেয়, ও ভাবি নলেন গুড়ের ক্ষীর রানছি, একটু দিলাম ছেলেকে নিয়ে টেস্ট কইরেন।” রায়াও দেয় তবে ফলমূল, বই, শো পিস ছাড়া অন্য কিছু নয়।    
আজ কদিন ধরেই বারান্দার দরোজা বন্ধ। কাপড় ঝুলছে তারে। তার মানে আসা যাওয়া হচ্ছে। শুধু রায়ার সাথে কারো দেখা হচ্ছে না। মিনতি বউদি তিনবেলা পূজো না করে খাবার খায় না। উলুধ্বনি এবং ঘন্টা বাজার শব্দও বাজছে কিন্তু কি আশ্চর্য কারো দেখা নেই বারান্দায়। হলো কি? রান্না করতে করতে রায়া ভাবে লাস্ট যেদিন বউদির সাথে কথা হয়েছে  তাতে কি খারাপ কোন কথা বলেছে সে? না তো! সেদিন কি করে মোটা কমানো  যায় তাই নিয়েই তো কথা হল। মিনতি বউদি সাতষট্টি থেকে ঊনষাট হয়েছে ডায়েট করে আর রায়া পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্ন হয়েছে সারাক্ষণ কম্পিউটারের সামনে বসে থেকে থেকে। কি হল তাইলে? পত্রিকার লেখাটি শেষ করেই খোঁজ নিতে হবে কারো অসুখ বিসুখ কিছু হল নাতো! 

নিরাপত্তার খাতিরে ফেসবুক সাময়িক বন্ধ। তীব্র অসন্তোষ তরুণ তরুণীদের মধ্যে। ফোনে কি আর সব কথা বলা যায়! অনেক রাতে মিনতি বউদির ব্যালকনি থেকে কথা বলার আওয়াজ আসে। রায়া বোঝে একতা কথা বলছে। এ বয়সের একটি  মেয়ে বা ছেলের একজন প্রেমিক বা কাছের বন্ধু থাকা খুব স্বাভাবিক। কিন্তু কিছুক্ষন  পরেই ব্যালকনিতে চাপা হুলুস্থুল এবং দড়াম করে  দরোজা বন্ধের শব্দ হয়। শব্দটির সাথে মিনতি বউদির রাগী গলায় “মাইরে ফেলা, মাইরে ফেলা—অরে নিমতলা শ্মশানে পুড়াইয়া আসিগে”এ জাতীয় কথা শুনে একতার জন্যে খারাপ লাগতে শুরু করে। পান্থপথের মোড়ে সাধারণ চেহারার একটি শ্যামলাপানা ছেলে একতার জন্যে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করে। দেখেও না দেখার ভান করে চলে আসে রায়া। ও জানেনা ছেলেটি কি জাতের। নিজে থেকে কখনো জানতেও চায়নি। তারুণ্য আগ বাড়িয়ে কথা বলা একেবারেই মানতে চায় না। একতার জন্যে ভাবনা হয়। হিন্দু সমাজে জাত পাতের বড় মান্যতা। মেয়েটি কি অন্য জাতের কারো সাথে জড়িয়ে পড়ল? 

বিকল্প পথে ফেসবুক চালাচ্ছে সবাই। একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী সাকা  মুজাহিদের ফাঁসির সাথে ফেসবুকের সম্পর্ক বোঝা যায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাঠানো কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখে। এরাও বাংলাদেশি নাগরিক। অথচ মানবতা বিরোধী অপরাধীদের পক্ষ হয়ে অশ্রাব্য হুমকি আর পা তুলে সরকারকে ভারতের পা চাটা দালাল বলে লাথি দেখাচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশের এই নব্য পাকিদের দুঃসাহস দেখে লজ্জা পেতে হয়। এদিকে সারা পৃথিবী জুড়ে রক্তের হোলি খেলছে আইএস সংগঠন। ইসলাম শব্দের অর্থ বদলে দিয়েছে এরা। এখন পৃথিবীর কোন রাষ্ট্রের কোন নাগরিক মুসলিমদের আর বিশ্বাস করে না।  সাধারণ মুসলিমরা  অসহায় হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে ধর্মের হাতছানিতে অনেক শিক্ষিত অশিক্ষিত ছেলেমেয়ে্রা জড়িয়ে যাচ্ছে উগ্রতায়। অবস্থা এমন হয়ে পড়েছে যে মুসলিম তরুন ছেলেমেয়েদের মা বাবারা  আতংকিত তাদের ছেলে বা মেয়েটি ঠিক পথে আছে তো ! পত্রিকার লেখা শেষ করে  কাকডাকা ভোরেই উঠে পড়ে রায়া । একটু চা খাবে। কিচেনের আলো জ্বেলেই চমকে উঠে। একতা বারান্দায়, আন্টি একটু নীচে আসবেন ?
দু কাপ চা আর বাদাম বিস্কুটের প্যাকেট নিয়ে নীচে এসে দেখে পাতলা চাদরে মাথা মুখ ডেকে একতা আগেই চলে এসেছে । কি করব আন্টি আমি ? রায়ার শংকাই সত্য হয়। ছেলেটি মুসলিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। একতা ইডেনের। শাহবাগে পরিচয়। তারপর মিছিলে, স্লোগান দিতে দিতে ঝালমুড়ি ফুচকা তেলেভাজার সাথে একান্তে চিকেন বিরিয়ানি ভাগ করে খেতে খেতে প্রেম জমে ঘন হয়েছে।  একতা ফুঁসে উঠে, আমি ওদের বাসায়ও গিয়েছি আন্টি। ওদের বাসার কেউ কিছু বলেনি আমাকে। এই যে এই আংটি দিয়েছে  নিলমের আম্মু ছেলের পছন্দকে সন্মান করে। আর এদিকে আমার বাবা মা দাদা আমাকে মেরে ফেলার কথা ভাবছে!” 

রায়া মনে মনে হাসে।  মুসলিম পরিবার তেমন কিছু বলবে না। কারণ তারা জানে মেয়েটি আসবে  ধর্মান্তরিত হয়ে। কিন্তু হিন্দু ধর্মে তো গ্রহন নেই। খুব অল্প হিন্দু পরিবার আছে যেখানে মুসলিম মেয়েকে বউ হিসেবে গ্রহন করে।  রায়ার চেয়ে ভাল আর কে জানে যে মুসলিম মেয়ে বিয়ে করে কোন কোন হিন্দু ছেলে দেশ ছেড়ে বাবা মা  আত্মীয় স্বজন ছেড়ে বিদেশে থেকে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে আর ইসকনের মন্দিরে গিয়ে আত্মার সন্তুষ্টি পূর্ণ করছে অথবা মুসলিম হয়ে আজীবন বেঁচে  থাকছে । রায়ার নিজের বোনের স্বামিও তো  হিন্দু। কত বছর একঘরে হয়ে  থেকেছে রায়ারা। কত গঞ্জনা কত অপমান সহ্য করতে হয়েছে  ওদের। রায়ার বাবাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল মসজিদ  কমিটি। আর বোনের শ্বশুর একটু একটু করে সমস্ত ব্যবসা গুটিয়ে একরাতে পরিবারসহ ইছামতী পেরিয়ে বসিরহাটে বড়দিদির বাড়িতে বসে প্রায়শ্চিত্ত করেছে ছেলের অপরাধের। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে ত্যাজ্য করেছে ছেলে এবং তার উত্তরাধীকারদের। অথচ দুই পরিবার কত বন্ধু ছিল। প্রতি বছর বিসর্জনের দিন গাড়ি ভাড়া করে খুলনা থেকে ইছামতির তীরে  চলে আসত তারা । পুরুষরা ব্যস্ত থাকত বিসর্জনের কাজে মহিলারা স্থানীয় মেলা থেকে কিনে  নিত সংসারের নানান দ্রব সামগ্রী। ওপারের চুড়ি, শাড়ি, জয়পুরী বিছানার চাদর, বাবা জর্দা, টিপ।    
     
মিনতি বউদির মত  রায়ারও বলতে ইচ্ছা করে একতা কি মিছিলে শ্লোগানে কোন স্বধর্মের স্বজাতের ছেলে খুঁজে পেলো না ! শুকনো খটখটে লাবণ্যহীন  ব্রণেভরা মুখটি  চোখের জলে ভিজে আছে। মাটি মায়ের কোলে গজিয়ে উঠা একটি  নতুন পবিত্র সম্পর্ককে প্রতিষ্ঠা করতে জাতপাত ধর্মকে অস্বীকার করে সাহসের ঘোলা জলে কাদামেখে জোর কদমে মুখ উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইছে  ভালবাসার  চারাগাছটি। “ আন্টি সব মুসলিম তো আইএস নয়। নিলমের বাবা বাম রাজনীতি করে। উনি কি কখনো আইএসের সমর্থক বা ধর্মান্ধ হতে পারে ?” একতার কথায়  এবার চরম ধাক্কা খায় রায়া। তাই তো এভাবে ত ভেবে দেখেনি। ক্রমশ পৃথিবী ধর্মের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। ধর্মের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে একেকটি পরাশক্তিসহ ছোট ছোট দেশগুলি। এই মূহূর্তে উগ্রতায় আইএসের তুলনা  কেবল আইএস। প্রতিটি মুসলিম আইএস করে না সত্যি কিন্তু প্রতিজন আইএস তো মুসলিম ! মিনতি বউদির দুঃশ্চিন্তা এবার ছুঁয়ে যায় রায়াকে। ইসরাইলের হাতে  নির্যাতিত একজন প্যালেস্টাইন, আইএসের হাতে হাতে নির্যাতিত কোন ইয়াজিদি মুসলিম, বাংলাদেশ  থেকে উৎপাটিত হিন্দুরা আর মোজাফফরপুর, গুজরাট, দাদরির  মুসলিমরা কখনো কি বিশ্বাসের জমিন খুঁজে পাবে এই পৃথিবীতে ?  

ঘরে যাও একতা। যা করবে তা ভাল করে ভেবে করো।” অনেকটা পালিয়ে আসে রায়া। সে আপোষের দুধ ভাতে মানুষ । কোথায় পাবে হিন্দু মুসলিম জাত পাত ঘোচানোর দুঃসাহস! কলকাতা ঘুরতে গিয়ে কফি হাউসের সিঁড়িতে  নির্মলকাকুর সাথে দেখা হয়েছিল। রায়াদের ছোট শহরের হিরো। নির্মলকাকু আর স্থানীয় কচিকাঁচা ইশকুলের টিচার আরজু আপার প্রেমের বিয়েতে তাদের শহরে প্রায় দাংগা সৃষ্টি  করেছিল। আরজু আপার ভাইরা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি এই বিয়ে। হাতাহাতি থেকে মারামারি হয়ে শেষ পর্যন্ত খুনোখুনি হয়ে যায় । আরজু আপার বড় ভাই যখন বন্দুক বের করে  আরজু  আপাকে খুন করতে এলেন নির্মলকাকু আর সহ্য করতে পারেননি। আরজু  আপাদের উঠোনে নেড়ে দেওয়া চ্যালাকাঠের বাড়ি মেরে মাথা দু ভাগ করে দিয়েছিল বড়ভাইয়ের। আরজু আপার বাবা ঘটনা বেশিদূর ছড়ানোর আগেই নির্মলকাকুকে সরিয়ে দেয়। “পালা নির্মল, কোনদিন আসবি না আর। পালিয়ে যা।” আরজু আপাও পায়ে পড়ে নির্মলকাকুর। এত ভালবাসত যে আরজু আপাকে শেষ পর্যন্ত তাকে ছেড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল নির্মলকাকুকে।  প্রতিটি চেকপোস্টে ইনফর্মেশন দেওয়া হয়েছিল। পুলিশের কাছে খবর ছিল মুরগীর গাড়িতে করে পালিয়েছে নির্মল সেন।  সে গাড়ির লক্ষ্য বেনাপোল । কিন্তু তার আগেই গাড়ি পালটে পালটে  সাতক্ষীরা পেরিয়ে জেলে নৌকার বইঠা ধরে জলের নিচে লুকিয়ে ইছামতি সাঁতরে ভারত সীমান্তে পৌঁছে গেছিল কাকু। ভারতীয় জেলেদের হাতুয়া হিসেবে কাজ করে সাতদিন পর বিরাটির এক গ্রামে দূর সম্পর্কের আত্মীয়বাড়ি উঠেছিল। তারপর কি করে যেন রাজনীতির রঙ মেখে মেখে নির্মলকাকু এখন সেখানকার এক পরিচিত মুখ। 
 
নির্মলকাকুই ছুটে এসেছিল, কোথায় উঠেছিস মা ? চল—কফিহাউসের ভেতরে উপরে একটি টেবিলও ফাঁকা ছিল না সেদিন। বসন্ত কেবিনে চা খাওয়াতে খাওয়াতে খুঁটে খুঁটে জেনে নিচ্ছিল খুলনার সবকিছু । রায়া অপেক্ষা করছিল কাকু কখন আরজু আপার কথা  জানতে চাইবে। কিন্তু একবারের জন্যেও কাকু আরজু আপার কথা জানতে চায়নি। রায়া ভাবে কাকু হয়ত জানে আরজু আপা কেমন আছে।  আজ পর্যন্ত আর বিয়ে করেনি আরজু আপা। কিন্তু কাকু কি জানে স্বাগতের কথা ?  কাকুর ছেলে । যে কিনা দেখতে অবিকল কাকুর ছায়া। কাকুর মতই টেনিস চ্যাম্পিয়ন। স্বাগতের পিতার নামের জায়গায় লেখা আছে আরজু  আপার দাদুর নাম। ধর্মের জায়গায় ইসলাম । সব জানে স্বাগত। পারিবারিক ঝগড়ায় মালাউনের বাচ্চা বলে মাঝে মাঝে আঘাত দিয়ে  কথা বলে কোন কোন স্বজন। চোখে রক্ত তুলে মারতে ছোটে স্বাগত। বড়রা কেউ কেউ আঁতকে উঠে, ওরে এ যে নির্মলের ডুপ্লিকেট। সেই রকম রগ চটা মাথা গরম। এদেশে থাকা  নির্মল কাকুর এক জ্যাঠা স্বাগতকে দেখলেই গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কেঁদে উঠেন। স্বাগত পারত পক্ষে তার সামনেই যায় না।   

এখানে বিয়ে করেছে নির্মলকাকু। বউ কমরেড । রায়া চলে আসার আগে এক ভোরে নির্মলকাকু আর সেই কাকিমা এসেছিল দুই ছেলেকে নিয়ে দেখা করতে। কিছু উপহার দিয়ে কাকিমা বলেছিল, দিদিকে দিও। আর স্বাগতকে বল কখনো দরকার পড়লে বা মন চাইলে সে যেন চলে আসে। তার অধিকার এই মা আর ভাইরা রক্ষা করে আছে।” আরজু আপা উপহারগুলো লুকিয়ে ফেলেছিল। বাবার দেওয়া একটুকরো জমিতে পাকা ঘর তুলে থাকে প্রাইমারী ইশকুলের শিক্ষিকা আরজু আক্তার। মাঝে মাঝেই ভাইরা হুমকি দেয় জমি ঘর কেড়ে নেওয়ার। আরজু আপা তখন নিজের ঘরে দরোজা বন্ধ করে কাঁদে । কেউ আসেনা সান্ত্বনা দিতে। সবার মুখে বিদ্রুপ খেলে যায় হায়েনার মত। ভাইয়ের বউরা তো সরাসরি বলেই  দেয়, কেমন লাগে হিন্দু বিয়ে করার! মজা টের পাও এখন।” 

দুঃশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠে রায়া।  একতাদের বারান্দার দরোজা বন্ধ থাকে আজকাল। কদিন ধরে কাপড় শুকানো,  উলুধ্বনি আর ঘন্টা বাজার শব্দও শুনতে পাচ্ছে না। কিচেনে রান্নার ফাঁকে ফাঁকে দেখে নেয় একেক বার। নাহ দরোজা বন্ধ। বিকেলের চা নাস্তা বানাচ্ছে রায়া হঠাত বারান্দা খুলে মিনতি বউদি একমুখ হাসি দিয়ে মিষ্টির প্লেট বাড়িয়ে দেয়, ভাবি একতার বিয়ে হয়ে গেল।  হঠাত করেই হল। আপনাদের কাউকে জানাতে পারিনি। সাতক্ষীরার ছেলে। তবে ওপার থাকে। একবারে পার করে দিয়ে এলাম।” বাড়ানো মিষ্টির প্লেটের দিকে হাত বাড়িয়ে রায়া  ভাল করে দেখে নেয় মিনতি বউদির মুখ। স্বস্তি আর নিষ্ঠুরতার আনন্দ মাখানো।


মিস্টির প্লেট পড়ে থাকে টেবিলে। ষ্টিলের জগে রায়ার মুখ ভেসে উঠে।  মিনতি বউদির মতই তাতে স্বস্তির রঙ মাখানো । শুধু মাঝে মাঝে বেদনা এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে । সেও তো চায়নি একতার জয় হোক! আর তখনই সেই বন্ধুটির কথা মনে পড়ে যায়। ইছামতির জিরো পয়েন্টে দাঁড়িয়ে গেরুয়া জলের দিকে তাকিয়ে যে নিজেই যেন নিজেকে শুনিয়ে বলেছিল, আমাদের মনও এক ইচ্ছামতি মেয়ে জান তো। তাতে বাঁধ দিলে আত্মার মৃত্যু ছাড়া আর কি পরিণতি হতে পারে বল তুমি?   

01 January 2016

রুখসানা কাজল


আজকের পৃথিবী যখন হিংসা, সন্ত্রাস আর অসহনশীলতার আগুনে জ্বলছে পুড়ছে। প্রতিদিন বিশ্বের কোন না কোন জায়গা রক্তে  স্নাত হচ্ছে শিশু কিশোর, নারী পুরুষের নির্মল রক্তে তখন অনেকেই আমরা শান্তির খোঁজে সেই সব মনীষীদের সুস্থ ভাবধারার দ্বারস্থ হচ্ছি যারা একদিন অন্তরের অন্তঃ স্থল হতে মানুষকে ভালোবেসেছিল। মানুষের জন্য শান্তি, সৌভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতার আর বন্ধুত্বের আকাশ প্রদীপ জ্বেলে রেখেছিলেন। পৃথিবীর এই করুণ কণ্টকময় সময়ে আজ সেই সব মহান ব্যক্তিত্বের অবদানকে বার বার স্মরণ করছি। স্বামী বিবেকানন্দ স্বমহিমায় বিরাজমান কেবল ভারত বর্ষের নয়, ভারত বর্ষের বাইরেও। এই মানুষটির জীবনপাতার পাশে আর একটি মুখ খুব সপ্রতিভভাবে স্মরণে আসে তিনি ভগিনী নিবেদিতা বা মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। একজন অ্যাংলো আইরিশ যাজক কন্যা। পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে যিনি শিখেছিলেন মানব সেবাই ঈশ্বর সেবা তুল্য।  
 
মার্গারেট ছিলেন শিক্ষক। ছোটদের পড়িয়ে তিনি অপরিসীম আনন্দ পেতেন। শিশুমনের সার্বিক বিকাশে তিনি তাদের ভেতর সুকুমার ভাবনা চিন্তার পক্ষপাতি ছিলেন। ছবি আঁকা, সাহিত্য জানতে এবং চর্চা করতে তিনি শিশুদের উৎসাহ দিতেন। পরবর্তীতে মার্গারেট শিশুদের জন্য একটি ইশকুলও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তিনি খ্যাতি পেয়েছিলেন প্রচুর। সুনাম ও সম্মানও পেয়েছিলেন যথেষ্ট। মানুষের সেবা করার চিন্তাটা তার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি জ্ঞান এবং সমাজ সেবামুলক বিভিন্ন আলোচনা চক্র, সভা বৈঠকে যোগ দিতেন। সাহিত্য ও শিল্পচর্চা সম্পর্কে তাঁর লেখা প্রকাশিত হচ্ছিল লন্ডনের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয় ছাড়াও শিশু শিক্ষণ এবং শিশু মনের বিকাশ, নারীর অধিকার বিষয়ে তার বক্তৃতা এবং লেখা প্রবন্ধগুলো অনেকের দৃষ্টি আকর্ষন করেছিল। তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন একজন আদর্শ শিক্ষাব্রতী হিসেবে। 

জ্ঞান অর্জনের অপরিসীম ক্ষুধা ছিল তাঁর অন্তরে। তিনি প্রচুর পড়াশুনাও করতেন। এই সময় বুদ্ধের জীবন কর্ম, শিক্ষা তাকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করেছিল। তিনি বুদ্ধ সম্পর্কে পড়াশুনা শুরু করেন আরো বেশী করে জানার আগ্রহে। নিজেকে  নির্লোভ সুশিক্ষিত সুরুচির মানুষ হিসেবে তৈরি করতে তিনি ত্যাগ এবং সেবার পথ গ্রহন করেন। তার অন্তরে সর্বদা জানার আকুলতা প্রচুর প্রশ্নের জন্ম দিত। তিনি নানাভাবে এই প্রশ্নের উত্তর জানার চেস্টা করতেন। লোভ ,হিংসা, অজ্ঞানতা দূর করে কি করে জ্ঞানের আলো দিয়ে মানুষের মনের মুক্তি আনা যায় এই বিষয়ে তিনি সারাক্ষণ চিন্তিত থাকতেন।

 ১৮৯৫ সালের নভেম্বরে লন্ডনের এক বিদুষী  পরিবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বামী বিবেকানন্দের সাথে মার্গারেটের  পরিচয় হয়। স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা এবং ব্যক্তিত্বে তিনি  মুগ্ধ হন। এই সময়ে স্বামীজির কাছ থেকে তিনি ভারতবর্ষের ইতিহাস,দর্শন, সাহিত্য, লোকাচার, প্রাচীন ও আধুনিক ভারতবর্ষের বিভিন্ন বিষয় জেনে নেন। স্বামী বিবেকানন্দের কাছ থেকে তিনি ভারত বর্ষের  প্রাচীন এবং আধুনিক মহাপুরুষদের জীবনী জেনে অত্যন্ত বিস্মিত এবং কৌতূহল অনুভব করেন। ভারতবর্ষের দর্শন, সাহিত্য এবং জ্ঞানের প্রতি তিনি এক অভাবনীয় টান অনুভব করেন। মার্গারেট বুঝতে পারেন, “ মানুষের মধ্যে যে পূর্ণতা আছে, তাকে প্রকাশ  করার নামই হল শিক্ষা।” তাই তিনি তার ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্র হিসেবে ভারতকেই স্থির করেন। 

স্বামী বিবেকানন্দ মার্গারেটের আগ্রহ দেখে অনুভব করলেন ভারতবর্ষে শিক্ষার আলো ছড়াতে, বিশেষ করে ভারতীয় নারীর মধ্যে অশিক্ষা, কুসংস্কার আর দুঃখ দৈন্য দূর করতে মার্গারেটের ছিলেন উপযুক্ত শিক্ষিত সম্মোহনী একজন নারী। তিনি মার্গারেটের আগ্রহ দেখে পরামর্শ দেন, কাজে ঝাঁপ দেওয়ার আগে ভাল করে ভেবে দেখার। স্বামীজি বুঝেছিলেন ভারতবর্ষের সেবার জন্য, ভারতীয় নারীদের মানসিক শৃংখল মুক্তির জন্য, স্বনির্ভরতা ও শিক্ষাদানের জন্য মার্গারেটের মত শিক্ষিত, পবিত্র, অসীম ধৈর্য্যশীল, দৃঢ় ও প্রীতিপূর্ন মনের অধিকারী নারীর একান্ত প্রয়োজন। তাই তিনি এই কর্মবীর কন্যাকে আন্তরিকভাবে ভারতবর্ষে  স্বাগত জানান।  

স্বামীজির আহবানে সাড়া দিয়ে এবং সকল সাবধান বাণীকে উপেক্ষা করে মার্গারেট ১৮৯৮ সালের ২৮ জানুয়ারী  আত্মীয় স্বজন এবং প্রিয় স্বদেশ ছেড়ে চলে আসেন নব্য জ্ঞানপীঠ কলকাতা। এসেই তিনি কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। স্বামীজি এই বিদেশিনী তেজস্বিনী নামকরণ করেন ভগিনী নিবেদিতা। ভারতবর্ষের জন্য তীব্র ভালবাসা নিয়ে ১৮৯৮ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ভারতীয় নারীদের শিক্ষাদানের জন্য কলকাতায় একটি ইশকুল প্রতিষ্ঠা করেন। সমস্ত সামাজিক, পারিবারিক এবং ধর্মীয় বাঁধাকে অতিক্রম করে এই বিদেশিনী নারী খালি পায়ে হেঁটে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বুঝাতেন যে কন্যা সন্তানের জন্য শিক্ষা কত প্রয়োজন। আজকের ভারতবর্ষের আলোকিত নারীদের জন্য সিস্টার নিবেদিতা রচনা করে দিয়েছিলেন প্রগতির পথ। মেয়েরাও যে এই সমাজের মানুষ , দেশ, কাল, সমাজ, রাজনীতিতে মেয়েরাও যে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে এই কথাটি তিনি সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হন। ১৮৯৯ সালে কলকাতায় মহামারী আকারে প্লেগ দেখা দেয়। নিবেদিতা স্থানীয় যুবকদের সহায়তায় এই সব রোগিদের সেবা কাজে নির্দ্বিধায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। এখানেই এই বিদেশিনী সিস্টার নিবেদিতার মাহাত্ম্য। কত বড় ভালবাসাময় অন্তর থাকলে এরকম কাজ করা যায় ভাবা যায়!

ভারতবর্ষের ইতিহাসে সিস্টার নিবেদিতা একটি শক্তিময়ী নাম। সকল শ্রেণির নারীদের জন্য সমান আগ্রহ নিয়ে তিনি কাজ করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যার জগদীশচন্দ্র বসু এবং তার সহধর্মিনী লেডি অবলা বসু, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত তৎকালীন সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে নিবেদিতার চমৎকার বন্ধুত্ব ছিল। তিনি শিল্পের সমঝদার ছিলেন বলে ভারতের আধুনিক চিত্রকলার সৃজনে অন্যতম অনুপ্রেরণার কাজ করেন। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এই ছিল যে নিবেদিতা ভারত বর্ষের স্বাধীনতার স্বপক্ষে বৃটিশ বিরোধী কাজে সক্রিয় সমর্থন দেন। ভারতের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তিনি স্বদেশ প্রেম, ধর্মের সারল্য, সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ রচনা করেন। 

তিনি স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী নেতা ঋষি অরবিন্দের সান্নিধ্যে আসেন এবং ভারতবর্ষের স্বাধীনতার স্বপক্ষে সোচ্চার ভুমিকা পালন করেন। তার ১৬নং বোসপাড়া লেনের বাড়িটা ছিল ভারতবর্ষের অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা স্থল। বিপ্লবী ঋষি অরবিন্দ নিবেদিতাকে “শিখাময়ী” নামে অভিহিত করন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিস্টার নিবেদিতাকে “লোকমাতা” নামে ডাকতেন । শিল্প সাহিত্য ভাষা চর্চা, দেশপ্রেম নারী জাতির শিক্ষা ও উন্নতি, মানবসেবার পাশাপাশি এই মহিয়সী নারী ভারতবর্ষে আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার প্রসারতায়ও নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সস্ত্রীক বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সাথে গভীর আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। জগদীশচন্দ্র বসুর বিজ্ঞান চর্চায় তিনি পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগীতা করেছেন।   
  

সব কিছুর উর্ধ্বে তিনি নিজেকে একজন শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন। তার শিক্ষাপদ্ধতির মূলে ছিল সার্বজনীনতা। গতানুগতিক পদ্ধতির পরিবর্তে তিনি সৃজনীশক্তির উপর বেশি গুরুত্ব দিতেন। শিক্ষাকে তিনি করে তুলেছিলেন মানব কল্যাণমুখী। ভারতবর্ষের মানুষদের প্রতি এক নিগূঢ় ভালবাসার বন্ধনে তিনি নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। সেই সময়ের ভারতবর্ষের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর গণ্ডি ছাড়িয়ে সিস্টার নিবেদিতা ছিলেন ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে জ্ঞান ও মানবসেবার এক অনন্য আলোকস্তম্ভ। একজন বিদেশিনী হিসেবে সাধারণ মানুষের এই ভরসা অর্জনের পেছনে ছিল সিস্টার নিবেদিতার গভীর নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা। 
তিনি আভিজাত, ধনী, মধ্যবিত্তের বাইরেও কৃষক- শ্রমিকের জীবনের মান উন্নয়নেও অবদান রেখেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভারতের জনগন এবং তাদের স্বাধীনতার জন্য কাজ করে গেছেন। অতিরিক্ত কাজের ভারে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ১৯১১ সালের ১৩অক্টোবর দার্জিলিং এ এই মহিয়সী নারী মৃত্যুকে বরণ করে নেন। তার মৃত্যু তাকে  আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে নিতে পারেনি। সিস্টার নিবেদিতা বেঁচে থাকবেন অনুপ্রেরণার আলোকদাত্রী হয়ে।
বর্তমান অস্থির সময়ের দোলাচলে অস্থিতিশীল এই পৃথিবীতে সিস্টার নিবেদিতার মত মানুষদের আজ আমাদের বড় প্রয়োজন ।  

02 December 2015

রুখসানা কাজল



বিপ্লব, বিক্ষোভ, বিদ্রোহ আর ‌চে’একটি আদর্শ ছবি। যে কোন শিল্পী বা স্থপতির কাছে চমৎকার ভাস্কর্য হয়ে উঠতে পারে এই চিত্র কর্মটি। কিন্তু এই ছবি ছাড়াও চে’র অন্য একটি ছবিও আছে। আকণ্ঠ  কবিতা নিমগ্ন চে। পাবলো নেরুদার কবিতা ছিল তার খুব প্রিয়। চে’কে হত্যার সময় তার কাছে নেরুদার কবিতার বই পাওয়া গেছে। কবিতা ছিল চে’র খুব প্রিয় বিষয়। কবিতা ছিল চে’র অন্যরকম এল প্রেমিকা। কবিতা চে’কে দিয়েছে বিপ্লবের পথে অমরত্বের শক্তি।       

যুদ্ধ সংকুল অস্থির সময়ের সামান্য অবসরে ‘চে’ কবিতা পড়ত। কিম্বা প্রাণের বন্ধু ফিদেলের জন্যে লিখে যেত উদ্দীপনার গান। তাতে থাকত মানুষের জন্যে এক আশ্চর্য সবুজ ভালবাসা। দ্বিতীয় স্ত্রী আল্যাইদার জন্যেও চে’ কবিতা লিখেছে। সেই কবিতার ছত্রে ছত্রে  রয়েছে জীবন  জয়ের গান। 

কবিতা লেখার সময় চে’র মুখ থেকে বিপ্লব, বিক্ষোভ আর বিদ্রোহ মুছে গিয়ে হয়ত ফুটে উঠেছে আশ্চর্য নরম কোমল কোন আলো। সে আলোয় এই বুড়ি পৃথিবীর জন্যে ঝরে পড়েছে অফুরন্ত মায়াবী ভালোবাসা। বিপ্লবের  সাথে প্রেম আর কবিতা মিলেমিশে ‘চে’ হয়ে উঠেছে এক অশান্ত আগুনপাখি। পাখায়-পাখায় বিপ্লবের আগুন নিয়ে উড়ে গেছে কিউবা থেকে আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া সমগ্র ল্যাটিন আমেরিকা। চে’র মৃত্যুর পরে লক্ষ লক্ষ তরুণদের সমাবেশে ক্যাস্ট্রো তাই বলেছিলেন আমরা ভবিষ্যতের মানুষদের চে’র মত করে দেখতে চাই। আবেগী, দরদী ভালবাসা প্রীতিতে ভরপুর। সাম্রাজ্যবাদী  শোষকের বিরুদ্ধে অবিচল সংগ্রামে চির উন্নত শির।

কেউ কি কবরের গান শুনতে পায়? চে’র গান? পৃথিবীর বাতাসে ভাসছে তার বিপ্লবীর গান। আহত ক্ষোভ, প্রতিবাদ, জাগরণ আর মানবতার জয়গান গেয়ে চলেছে চে। সে গানের অন্তে থাকে অসমাপ্ত বিপ্লবের জন্যে হাহাকার আর আকুতি। থাকে মানুষের জন্য মানবতার পথে আসার আহবান। অসমাপ্ত বিপ্লবকে সম্পূর্ণ করার  জাগ্রত চেতনার জয়ধ্বনি। এই গান কত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে গেছে। পৃথিবীর সব গোলার্ধে এখনে সসম্মানে বেঁচে আছে ‘চে’। তার স্মৃতির কোন ক্ষয় নেই লয় নেই। পৃথিবীর বয়েস যত বেড়ে যাচ্ছে চে’র গান ততবেশি ছড়িয়ে পড়ছে কবর থেকে কারখানায়, ফসলের মাঠ থেকে ছাত্রদের কণ্ঠে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশ ছুঁয়ে সাম্রাজ্যবাদের ঘাঁটি মার্কিন মুলুকে। হয়ত একদিন অবরুদ্ধ আফগানিস্তান থেকে সিরিয়া মিশর লিবিয়া হয়ে আরব ভূমিতে। যে গাইছে তাকেও চিনে নিচ্ছে এই পৃথিবীর নতুন মানুষেরা। তাই বাংলাদেশের কিশোর কিশোরী তরুণ যুবা প্রৌঢ় বৃদ্ধদের মত অন্য দেশের কিশোর কিশোরী যুবা তরুন প্রৌঢ়  বৃদ্ধদের কাছে চে’ এক আলোকস্তম্ভ। চে’র টুপি থাকে মাথায়, চে’র গেঞ্জি ঢাকা বুক আর কাঁধে থাকে চে’র দৃপ্ত মুখের ছবি।     মানুষকে ভালবেসে জীবন  দিয়েছে যে চে’। 

বিপ্লবের মানসপুত্র  আর্নেস্ত চে গুয়েভারা জন্মেছিলেন আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্সের উত্তর-পূর্বে রোসারি গ্রামে ১৯২৮ সালের ১৪ জুন। চে’র  বাবা মা দুজনেই যাপিত জীবনে নিত্য আচরন এবং মননে ছিলেন প্রগতিপন্থী। প্রচলিত সামাজিক প্রথার সব কিছুই তারা অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে হবে এই ধারণার অন্ধ বিশ্বাসী ছিলেন না। তারা তাদের সন্তানদের স্বাধীন মুক্তমনা করে গড়ে তোলার জন্য উদার পারিবারিক পরিবেশ গড়ে  তোলেন। হাই ইশকুল পাশ করে ডাক্তারি পড়ার সময় চে জড়িয়ে পড়ে রাজনীতিতে । যে সে রাজনীতি নয় । মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়  সাম্যবাদী রাজনীতিতে নিজেকে সঁপে দেয় । সাচ্চা কম্যুনিস্ট ছিলেন চে’। সমস্ত ভয় ভাবনা বাঁধা মায়া এমনকি অর্জিত ক্ষমতাকে আঙ্গুলের তুড়িতে উড়িয়ে দিয়ে বিপ্লবের পথে মৃত্যুকে উপেক্ষা করেছিল চে গুয়েভারা।  

মৃত্যুর পরেও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মন ও মস্তিষ্কের পর্দা জুড়ে সাদাকালো একটি সত্য ঘটনা লাল হয়ে জেগে থাকে। বলিভিয়ার জঙ্গলাকীর্ণ ইশকুল ঘর, আহত ও বন্দী চে গুয়েভারা। তাকে হত্যা করতে অসাহসী ভীরু তোষামোদে ভাড়াটে  বলিভিয়ান সেনাদের সদরদপ্তর। তারা মার্কিন মুলুকের  কাছে সাহস ভিক্ষা চেয়ে  পাঠায়। নড়ে  উঠে পুঁজিবাদের লেজ। চে’কে খুন করার এমন মোক্ষম সুযোগ কিছুতেই হাত ছাড়া করে না মার্কিন প্রশাসন। দুপুর একটা দশ, অক্টোবর ৯, ১৯৬৭। নির্জন জঙ্গলের নৈঃশব্দ কে খান খান করে শোনা যায় তিনটি গুলির শব্দ। চে’সহ তার দুই সহযোগীকে হত্যা করে সাম্রাজ্যবাদের দোসর বলিভিয়ান সৈন্যরা। পৃথিবী থেকে মুছে দিতে তারপর সেখানেই তারা কবর দেয় চে’ এবং তার সঙ্গীদের। কবর দেওয়ার আগে চে’র দুটি হাত কবজি থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেটে নেয় সৈনিকরা। পৃথিবী থেকে ‘চে’কে মুছে ফেলতে চাইলেও তারা পারেনি। বেঁচে থাকতেও  বিপ্লবের অমৃত পুত্র‘চে’কখনো একা ছিল না। অন্তিম সময়েও প্রিয় কমরেডদের সাথে নিয়েই তিনি মৃত্যু বরণ করে। উদ্যত রাইফেলের সামনে মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনে ‘চে’ হেসেছিল সেই ভুবনজয়ী নির্মল হাসি। পৃথিবীর মানুষের প্রতি  অনির্বাণ আস্থা  রেখে তার হাসি যেন বলেছিল, মৃত্যু আমার দেহকে স্তব্দ করে দেবে সত্যি কিন্তু এই বিশ্বের যেখানে যখনই কোন অন্যায়ের প্রতিরোধ গড়ে উঠবে সেখানে অন্যায়ের মুখে ঝামা ঘষে দিতে বারবার হাজারবার লক্ষ কোটিবার জীবন্ত হয়ে উঠব আমি, আর্নেস্ত চে’ গুয়েভারা, বিপ্লবের পরিযায়ী পাখি। 

অশান্ত বাংলাদেশের বিষণ্ণ বিকেলে আমি চে র কবিতা শুনতে পাই। স্পর্ধিত সাহসে ম্যাড়মেড়ে স্বপ্নহীন হেমন্তের বিকেলে অনিরাপত্তার ডুবোজালে বাঙ্গালী যখন পথ খুঁজছে অন্তরের গভীরে তখন বেজে উঠে চে’র কবিতা। মৃতেরা কফিনবন্দী হয়ে  চলে যায় মাটির দেশে। যারা বেঁচে থাকে তাদের কেউ সাহসের গল্প বলে না। জানায় না মানুষকে ভালবেসে যীশুর মত অনেকেই জীবন দিয়েছে। এই বীরেরা আসলে কেউ মরেনি। তাদের আত্মা প্রতি মূহূর্তে ডেকে যাচ্ছে, জাগো মানুষ।  কেবল আমাদের অন্ধ বদ্ধ ভীরুতার জন্যে তাদের আমরা দেখতে পাচ্ছি না, শুনতে পাচ্ছি না। অথচ প্রতিদিন সাহসী মানুষের আত্মারা ডেকে যাচ্ছে , বলে যাচ্ছে , জেগে উঠো। অনেকেই শুনতে পায়, বলিভিয়ার মাটির গভীর থেকে চে’গেয়ে যাচ্ছে বিপ্লবের গান, মানুষকে ভালবাসার জয়গান।