Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts
Showing posts with label মুক্তগদ্য. Show all posts

12 April 2018

মুক্তগদ্য- দেবাশীষ ধর



□▫□
অনেকদিন পর শ্যামু একটি লাল শাড়ি পড়েছে, কপালে লাল টিপ। বুকের উপর লাল ব্লাউজ,যখন এইমাত্র সূর্য ছাদে এসে দেয়ালে মানচিত্র আঁকে শ্যামুর লাল শাড়িতে মানচিত্র সাজতে থাকে। এখানে কোন কাঁটাতার বাসা বাঁধে না, রেডলাইট সিগনাল নেই, ব্যারিকেডের কোন আওয়াজ নেই। আছে শুধু বাতাসের কাই মাখা ছান্দিক মিছিল, এরপর অনেক অনেক লাল চুড়ির শব্দ, হাতের উপর গ্রাফিতির রংধনু। এবার শ্যামু তাঁর কোমরের উপর ট্যাটু আঁকে, সেই ট্যাটু নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ডাংগুলির খুঁজে।তাঁর প্রিয় ঘাসের উপর যেখানে শঙ্খনদী এসে প্রতিরাতে আদর করে যায়। তখন অমাবস্যা ছিলো, ডাঙ্গুলিটি হারিয়ে গিয়েছিলো ঘাসের ভেতর...          

25 October 2017

নাহিদা নাহিদ





সুখেন,
যেদিন চলে গেলে , পিছন থেকে ডাকতে গিয়েও ডাকতে পারিনি , গলার মধ্যে কিছু একটা বিঁধে ছিলো, কিছু একটা! তোমার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেলো, তুমি ফিরে চাইলেনা আর! এভাবেই হয়তো চলে যেতে হয়, চলে যায় কেউ!- কি হতো যদি একবার ফিরে চাইতে?
সুখেন, তোমার সাথে কিছুই মেলেনি আমার, কিছুই না; তবুও বুকের ভেতরটা শূন্য করেছো তুমিই আমার। তোমার বাঁকা বাঁকা কথা, চোখের চকচকে তেজ, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝামেলা করার বাহানা, কিছুই না। তুমি ঘাড় কুচকে থাকা থুত্থুড়ে বুড়ো , দণ্ডে দণ্ডে খুঁজে ফেরো ভুল, অসভ্য আদিম মানুষ তুমি! তবুও জানো তুমি, তোমার সবটাতেই আমার কেমন ঘোর! তোমার খেয়ালিপনা, তোমার তুচ্ছতায়ও আমার আসক্তি, জেনে রেখো একমাত্র তুমিই ছিলে আমার বুকের ভেতরে জমে থাকা সবটুকু হেমলক বিষ! আমার সুখ! 

20 September 2017

সৌমিত্র চক্রবর্তী




রঙরসিয়া বিদেশিয়া কঁহা তেরা দেশ রে…

সময় কে জানতে হয়, চিনতে হয়। অঙ্ককষা হিসেবী জগতে সময় কে বুঝে নিজেকে ছড়াতেও হয় আবার গুটাতেও হয়। যারাই এটা পারে না বস্তুবাদী দেওয়া নেওয়ার পরিপাশ তাদের হেনস্থা করে, অবহেলা করে, পেছনে কুকুর লেলিয়ে দেয়। নিজের খেয়ালে মাইল না গুনে হেঁটে যাওয়া রঙরসিয়া বিদেশিয়া গতের অনুগত হতে না পেরে পিছিয়ে পড়া মানুষ বলে গণ্য হয় এক সময়। নাম, যশ, টাকা, পয়সার ভাইরাস আক্রান্ত দুপেয়েরা নিজেদের পিঠ নিজেরাই চাপড়ে অট্টহেসে বিদ্রুপ করে বাতিলের খাতায় নাম উঠে যাওয়া যাযাবরের।

22 August 2017

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য




অনঙ্গ শৃঙ্গার
রাত্রির চক্রে কোনো মন্ত্রধ্বনির দিকে অবাক তাকিয়ে থাকে পৃথিবী। আর তুমি চিরদিন গীতবিতান, বাগানের ঘরে আলো আলো অলকানন্দা, একটি গানের ভিতর থেকে তাকিয়ে আছো ঘরজুড়ে, একটি বিজলিশব্দের মুখোমুখি যেনো বা একটি প্রার্থনার রূপ, অনুরূপ তুমি বুঝতে চাইলে নিজের বাইরে একটি বাতাস গাছ উপড়ে এলোমেলো করে ঘর। এবং আরো প্রলোভনসঙ্কুল দৃষ্টিতে অব্যাহত থাকে। আমিই সেই এলোমেলো বিবাগী ঘর।
তোমার চিত্রাঙ্গদাপর্বে আমি একটা জিরাফ এঁকে দিই, কালো রঙে। জিরাফ দেখেছি চিড়িয়াখানায়। চলো, চিড়িয়াখানার জিরাফগুলোকে বের করে নিয়ে আসি। তারপর আসো তোমার সঙ্গে ঘুরি। আর আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। ঝড়ে ভেঙে পড়ে ঘুমগাছের শুকনো একটি ডাল। আর তুমি আমার হাত ধরে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামিয়ে নাও। তোমার সহসা স্পর্শে আমার রক্তের ভিতর বিঁধতে থাকে বৃষ্টির ফোঁটাগুলি। আর নীরবে হেসে যায় তিনটি জিরাফ।
যে অজাত নোনা পৃথিবীর সঙ্গে এত গভীর প্রণয়, আকাক্সক্ষা যেমন অনুভূত হবে তা থেকে অপহৃত রাস্তার আলো, মানে সোডিয়াম লাইটের অধীনে নীল ছায়া হাতাহাতি করে। মেঘ আর চাঁদ ভিড় করে। তুমি কার মুখ বহন করে দাঁড়িয়ে থাকো উত্তরের রাস্তায়, প্রশ্নের আকরে? একটি মধ্যরাত্রির পুকুর, জবুথবু ফিরে আসে যে প্রথম বাড়ি ছেড়ে জলাশয়ে নেমে গিয়েছিলো রাত্রিপাওয়া সেইসব জিরাফের মতো।

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু



সুমেরুপ্রভা
গভীর কোনো বেদনাবোধে পাটোয়ারি পাড়ায় আল্লার আযান ছড়িয়ে পড়ে- আসসালাতু খাইরুম্ মিনান নাউম...

ধীরে কুয়াশা কাটতে শুরু করে দূর গ্রামে...
ঊনত্রিশ রজনী পার হলে বেলিফুল-ফোটা ভর সন্ধ্যায় রায়পুরার দাদীর ইন্তেকাল হবে... ইন্নাহ লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজেউন

এমন সুন্দরী দাদীর পাকনা কেশর আর উড়বে না দক্ষিণমুখি বাতাসে। পিতলের বাটাল দিয়ে সুপারি কুটতে কুটতে দাদী বলবেন না- আমি মা ফাতেমা, হযরত আলীর বউ; আমি মা ফাতেমা, হযরত আলীর বউ...

অপরাহ্ণ সুসমিতো



আমার মৃত্যু সংবাদ লিখছি। খটাখট টাইপ করছি। নামের বানান লিখতে গিয়ে উত্তেজনায় অপরাহ্ন লিখে ফেলছি যেমন অধিকাংশ বন্ধুজন লেখেন। আবার টাইপ করতে গিয়ে নিজের কাছেই দ্বন্দ্ব হচ্ছে। কম্পিউটারে বানান ভুলে সমস্যা নেই,মুহূর্তে ঠিক করতে পারছি।
অগ্রিম দেখতে পাচ্ছি নূরজাহান চক্রবর্তী লাইক দিচ্ছেন। জাহ্নবী মাসী সংক্ষেপে আরআইপি লিখছেন। যে সূচালু আহমেদের কাছে ১৪৩০০ টাকা পেতাম,তিনি সবচেয়ে বড় কমেন্ট লিখছেন বিনিয়ে ইনিয়ে। মধু ভাই এখনো জানেন না। উনি প্রতি মাসের ২৮ তারিখ বেতন পান,সেদিন ফেসবুকে লগইন করেন। উনি খুব কষ্ট পাবেন ভাবতেই একটা কষ্ট কাবেরী নদীর মতো তিরতির করল বুকের হিমালয় পাদদেশে ।
আমি যে মন্ত্রণালয়ে কাজ করি,সেখানে বেশুমার ঘুষ। সহকর্মীরা চটজলদি চাঁদা দিতে শুরু করেন স্মরণ সভার । ঘুষখোর লোকজন খুব উদার হয় এরকম দান খয়রাতে। বেতনের টাকায় গয়া কাশী যায়,হজ্ব করে আর ঘুষের টাকায় বউকে বাদামী ব্রা কিনে দেয়। ফেসিয়াল করে, এবেনটি বায়স্কোপ করে ।

হুমায়রা হারুন



জানি আমি জানি সখি
যদি আমাদের দোঁহে হয় চোখাচোখি...
কে, কে বলে উঠলো অমন করে? আজও শুনতে পেলাম? কন্ঠস্বর অবিকল তার মত। কিন্তু এ কি সম্ভব? সুমন আসবেই বা কোত্থেকে আর কথাই বা বলবে কিভাবে? ও যে কোথাও নেই। ঘরের দুয়ার ছাড়িয়ে দূরের ঐ মাঠটা পেরিয়ে চেরি ফুলের বাগানে ঘেরা যে সমাধিস্থল সেখানেই তো সুমনকে রেখে আসা হয়েছে। সুমন এ ঘর ছেড়ে চলে গেল, আর আমার কি রইল? স্মৃতি। ওর কথা, ওর লেখা, ওর আঁকা ছবি, ওর কন্ঠে আবৃত্তি। রবিঠাকুরের মানসসুন্দরী পুরোটা কখনো পড়ে নি। শুধু ঐ দুটো লাইন, তারপর একটু থেমে হেসে হেসে বাকী দুটো লাইন।
“জানি আমি জানি সখি
যদি আমাদের দোঁহে হয় চোখাচোখি
সেই পরজন্ম পথে দাঁড়াবো থমকি
নিভৃত অতীত কাঁপি উঠিবে চমকি”
...

আনোয়ার কামাল


প্রতিটি মানুষেরই একটি স্বপ্ন থাকে তার মনের গহীনে। যা তাকে সেই শৈশব হতে জীবনের শেষ অব্দি তাড়া করে ফেরে বা পিছু পিছু ছায়ার মতো অনুসরণ করে। মানুষ স্বপ্ন নিয়েই তার যাপিত জীবনাচারণ পরিপালনের একটি ছক আঁকে। কেউ কেউ তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, কেউবা ঈশ্বরকে দায়ী করে তার স্বপ্ন পূরণ না হওয়াতে। তবুও মানুষ স্বপ্ন দেখে বলেই বেঁচে থাকে, এক আবিষ্ট ঘোরের মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে। স্বপ্ন না থাকলে মানুষ হয়তো তার জীবন নিয়ে এতো ছন্দময়, গতিময় সময় অতিক্রম করতে পারতো না। স্বপ্নই তাকে তাড়িত করে, চালিত করে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে।

বাবুল হোসেইন


এই আসমান, অসমান, মেঘাবৃত, মেঘালয়ের কাছাকাছি, তোমাকে দেখি না আর। আছো সুখে,  জানি, সুখ, প্রকৃতপক্ষে তোমাকেও কাবু করে ফেলে। বিকেলের ঘুড়ি আঁকা ফুল কিংবা ফুল আঁকা ঘুড়ি ভেবে আকাশের দিকে যাই। বালকবেলা, স্মৃতিঘোড়া। ফালি ফালি চাঁদ। জানলায় লটকে থাকা। আর নদীর গন্ধে আকুল। আমিও জানি, আরো কিছু রাত্রি হোক, রাত্রি হোক।

09 April 2017

সুনীতি দেবনাথ





সোনালি ডানার চিল 
জীবনানন্দ দাশের চিল আর দেখি না। নিঃসঙ্গ রাত একা একান্তে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে এখনো। শেষ রাত ধীরে বিভাবরী, জাগরণের, ঘুম আসে না। হঠাৎ উদ্দাম আন্দোলন, না বলা চলে ঝড়ো হাওয়ার মাতন। কাঁপছে থিরথির ঝরছে কুচি কুচি। শুয়ে আছি ঘাসেদের মোলায়েম বিছানায়। কল্পনার সবুজ ঘাসের মিহিকোমল আস্তরণ বিশেষে। দুহাতে সরিয়ে দিচ্ছি ঐ অন্ধকার কুয়াশার মোহজাল, নাকি অতীতের দরজা খুলছি। এক আকাশ খরখরে রোদ! নীলবাহার কোথায় গেলো? আয় না! আসে আরো রোদ! প্রখর তপন তাপে দহনজ্বালা! ঝালাপালা!দূরে বহুদূরে কালো ক'টি বিন্দু...একটা চক্র, আবর্তিত হচ্ছে নেমে আসছে, চোখের লেন্স ছবি আঁকছে! নামছে ...কয়েকটি চিল ঘুরপাক খাচ্ছে ! হায় চিল সোনালি ডানার চিল ...আমার অতীতের চিল, বর্তমানে অদৃশ্য। আর দেখা হবে না নিরালা ভবিষ্যতে অন্তহীন ঐ বর্তুলাকার আকাশের পরিসীমায়। সোনালি ডানা আর ত্রিকালের সমুদ্রের উপরে সাঁতার কাটবে না। পালক খুলে খুলে যায়... সুখ যায় দুঃখ যায় প্রেম যায় প্রাণ...সাঁতার কাটে নৈঃশব্দের অতলান্তে ... সোনালি রোদের বাস্তব হারিয়ে যায় পরাবাস্তবতার তীরে...জেগে উঠি নিঃশব্দ নৈশঃব্দে! হায় চিল, কল্পলোকের সোনালি ডানার চিল!
কাজরী,৪ অক্টোবর, ২০১৬


25 January 2017

দেলোয়ার হোসেন মঞ্জু




জীবন্যাস
গত দুইদিন অথবা দুইশত বছর যদিও তুমি পিরামিডের মতো স্থির থাকতে চেয়েছো, ভেতরে অনুভূত হয়েছে ফেরাউনের মমির কম্পন। মরুতাপে উচ্চকিত ধ্বনি বার বার মিশে গেছে বালির প্রপাতে- খুফু রে, রে ফেরাউন... ঈষৎ ফেটে-যাওয়া মমির ভেতর ঢুকে পড়েছে কয়েকটি উঁইপোকা; তোমার মনে পড়েছে শৈশবের ইতিহাস বইয়ের সবুজ মলাটটির কথা। গত দুইদিন তুমি স্থির থাকতে চেয়েছো অথচ দেখলে- তাড়া-খাওয়া পূর্ণিমা হঠাৎ ঢুকে পড়েছে তোমাদের কলাপসিবল গেটের ভেতর। আহারে জ্যোৎস্না! এমন সুন্দরী রাতে কেবল মরে যেতে ইচ্ছে করে। তুমি ভাবো- সুন্দরী চৌথাই নদীটি যেভাবে মারা গেলো... আর ঐ যে নারী কোনো এক ডুবন্ত বিকেলে বউ হয়ে চলে গেলো দূরের গ্রামে। দূর পর্বতে দৃশ্যমান হলো ঝর্ণাগুলি- শুধু আত্মহত্যা করছে গড়িয়ে গড়িয়ে। রক্তাক্ত তুমি ছায়া সন্ধান করো। দৃশ্যমান হয়- ফাল্গুনের চাঁদের আলোয় তোমাদের গ্রামের উঠোনে আড়াআড়ি পড়ে আছে ডালিম ডালটির চিরল ছায়া। বাতাস বইছে ছেঁড়া ছেঁড়া। ছায়াগুলি ছায়ার শিরচ্ছেদ করছে ধীরে। দেখতে পাও- তোমাদের বাগিচা বাজারে লণ্ঠনের নিম-আলোয় ইলিশের পেটির মতো চিকচিক করছে ঘাতকের ছোরা। এ দৃশ্যে তুমি নিদ্রা যেতে পারো না। বরং শুনতে পাও- তোমার শিথানের পাশে লাল-পাকুড়ে বৃক্ষের বয়স্ক পায়ের আওয়াজ। তারা হাঁটচলা করছে; গুড়ি-কন্দের শব্দ থেঁতলে দিচ্ছে নৈঃশব্দ্য। দৃশ্য উচিয়ে চলে যাও দৃশ্যান্তরে। লোহার গালিচায় বিষণ্ন বালিকারা বসে আছে। তাহাদের হাতে নীল নয়নের নুড়ি। বুঝে উঠতে সামান্য সময় লাগে- বালিকারা কোটর হতে চক্ষুদ্বয় খুলে ফেলেছে, বালিকাদের হাতে এখন মার্বেলের মাছি; তারা চক্ষু খেলায় মনোযোগী হয়- দপ্পা এক, দপ্পা দুই... নির্ঘুম সারারাত ভাবিত হও- ঐ বন মর্মর আর হরপ্পা নদীর নির্মাণশৈলী নিয়ে। তোমার হাতের কাছে প্যারামাকন, পাখিদের ঠোঁট; তোমার হাতের পাশে ম্রিয়মাণ খাগড়ার কলম ছিলো। যুদ্ধ করেছো সারারাত অথচ কিছুই লিখতে পারোনি। তাকিয়েছো হাতের কৈশিক শিরা উপশিরা আর রক্তপ্রবাহের দিকে। হস্তদ্বয় গুটিয়ে গেছে কেঁচোর মতো। তোমার হাতে রঙিন কোনো কমলা নেই, শিশিরের স্তন নেই। আপাতত তোমার কোনো হাত নেই; পৃথিবীতে আর কোনো হাতের অস্তিত্ব নেই। তোমার চোখ নেই, কান নেই, তোমার চারপাশে মুহীন জোলেখা সুন্দরী কুহু কুহু রবে... তুমি তাকিয়েছো দূরতম দেশের দিকে- ঐ দেশে কিছুই নাই বন্যাকবলিত পিতার কবর ব্যতিরেকে। তোমার ঘাড়ের ডানদিকে শিলং শহর। কে যেনো বলে যায়- ঐ শহরে সরকারি দিঘিতে একটা নীলপদ্ম ফুটেছে; আর যে নারী যুবতী, তার জানালায় সামান্য ঝুলে পড়েছে জুঁই আর শেফালির ঝোঁপ, বাঁ দিকে ঘাড় ঘোরাতেই তুমি বিমর্ষ হও। ল্যাম্পপোস্টের ঘোলা আলোর ভেতর একপাল জন্মান্ধ পতঙ্গ উড়ছে, উড়ছে...
যে তোমার বন্ধু ছিলো, প্রিয় কিশওয়ার এখন মৃত্যুর রাজা...

...সুবেহ সাদিক ভরা মাঠ। অশ্বারোহী তুমি যাচ্ছো প্রভাতের দিকে। দূর গাঁয়ে ঝুলে আছে কুয়াশার রেখা। শিশিরসিক্ত মাঠে হৃদকম্পন থেমে থেমেই শুনতে পাচ্ছো আর দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যাচ্ছে অচিন পশুদের মগ্নতার শীৎকার। দুরন্ত তোমার হস্তদ্বয় কে যেনো ঝাপটে ধরে হঠাৎ। প্রাণপণ যুদ্ধ করো তুমি; কিছুতেই মুক্ত হতে পারো না। সে এক কালো মানুষের হাত, হাতের কব্জি... শেষবারের মতো তাকিয়ে দেখো- লাল ঘোড়াটি তোমায় ফেলে রেখে কুয়াশার গ্রামে মিলিয়ে যাচ্ছে।

কোনো এক শাকিলা পাখির ডাকে তুমি ইচ্ছে করলেই এখন জেগে উঠতে পারো না। এখন তুমি আর কেউ না। অথচ একদিন ছায়ার ঘনত্ব খুঁজতে যেয়ে লুকিয়ে পড়েছিলে ঝুনা নারকেলের পেটের ভেতরে। নারকেলের ভেতরে জল; আসলে জল নয়, মেঘের মগজ। তুমি বসে থাকলে ফলের পূর্ণিমায়। নিজেকে মনে হলো অনেক অনেক কুচবর্ণ অথচ অভিজ্ঞ, প্রাচীন শিলাখন্ডের মতো; মনে হলো তুমি এক কুকাপত, বসে আছো কুকাশাস্ত্র হাতে; দুই কাঁধে দুইখ- অজগর যাদের রয়েছে নয়শত মাথা...। মাঝে মাঝে উলঙ্গ দুপুরে তুমি আসন পেতেছো নীলনদের তীরে। প্রাচীন গুণীন তুমি, উড়ন্ত কবুতর দুইখ- করে প্রেয়সীর পায়ের কাছে ফেলে দিয়েছিলে আর ঘর্মাক্ত তুমি শিশির খুঁজেছিলে নারী সর্বংসহার বুকের গহিনে।

সময় চলে গেছে; মহাকালের হা-করা গর্তের ভেতর সময় অনেক তো চলে গেছে। বহুবর্ষ আগে ঐ সুবেহ সাদিকের মাঠে তোমায় চেপে ধরেছিলো ঐ যে হস্তদ্বয়, থামিয়ে দিয়েছিল রথযাত্রা তোমার, পাঁজর ফুঁড়ে সর্বভুক যে শিকড় গুলি মুখের দিকে ধাবমান তা হলো বৃক্ষের দাঁত, জিহ্বাবলি। ঠিক দুইদিন নয়, দুই হাজার বছর ধরে তুমি মানুষ নও; তুমি মূলত বৃক্ষের আহার...



আলোচ্য পেটকাটা ঘুড়ি ও কমলা রঙের হাতি পরম্পরা
একটা পেটকাটা ঘুড়ির ভেতর বাতাসের মুখ আবিস্কার করতে পেরে আশির দশকের শেষের দিকে চরকাসিমপুর গ্রামের একদল বালক ভাঙা দাঁত ও ছেড়া জিহ্বা বের করে যদিও হেসে উঠেছিলো কিন্তু বড় হয়ে আকাশ ভর্তি শকুনের ঠোঁট ও মানুষের ছিন্নভিন্ন হা-পা-পাঁজর এবং মৃত কুকুরের ছায়া প্রত্যক্ষণের পর চিরদিনের জন্য ঘুড়ি ওড়ানোর কৌশল ভুলে গিয়ে দলবদ্ধ তারা যখন নগর মুখো হয় তখন কেউ কেউ সাঁকো ভেঙে জলের গর্তে অগত্যা হারিয়ে যায় এবং দু-তিনজন ছাড়া সকলেই  দশ-বরো বছরের ব্যবধানে ভেসে ওঠে পৃথক পৃথক জল ও স্থলখ-ে- লেবাননে আফগানিস্তানে জয়দেবপুরে শমসেরনগরে এবং যারা যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয় তারা হাত ধরাধরি করে সড়কের পর মহাসড়ক পেরুতে যেয়ে জ্ঞাত হয়- এ পন্থে চলাচলকারী প্রতিটি ট্রাক বাস মহিলা-বাসসহ অটোরিক্সা হামাজীব নট-নটী এবং রাষ্ট্রপতি মহা-রাষ্ট্রপতিসহ সমগ্র বাংলাদেশের ওজন পাঁচটন করে অর্থাৎ চরকাসিমপুর গ্রামের একটা তিনপায়া উনুনের ভেতর আগুনের ওজন অথবা গ্রামসুন্দরী ভাবিটির স্তনের ওজনের সঙ্গে বিস্তর ফারাক অনুভব করে ঈষৎ বিস্মিত তারা মহাসড়কের মধ্যবর্তী আয়ারল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আপাতচঞ্চল ডানদিকে তাকিয়ে বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরাতেই কমলা রঙের হাতিগুলোর কথা ভুলে গিয়ে পেটকাটা ইঁদুরের ভেতর দলবদ্ধ মানুষের লুকিয়ে-পড়ার-দৃশ্যে বেশ আশ্বস্থ যদিও তবু মনে পড়ে যায়- প্রতিমাসে আঠারোবেলা ভাত খাওয়ার জন্য কমপক্ষে বিশটি সাপ ধরে কোনো প্রযত্নে যখন জীবনধারণ অসম্ভব হতো তখন প্রতি বর্ষা-মৌসুমে কয়েক মণ ঘাড়–-ব্যাঙ ধরে কয়েক মণ ভাঙাধানের বন্দোবস্ত করতে হতো... তারপরও তাদের নির্জন পল্লীতে পূর্ণিমা  আসতো আর ধবল উঠোনে আগুনে-পোড়া পূর্ব পুরুষের মুখ ভেসে ভেসে পুনরায় মিলিয়ে যেতো... বেড়ালের হর্ষধ্বনি হতে অনেকগুলো নতুন বেড়ালের জন্ম হলেও কোনো এক প্রত্যুষে নিদ্রা ভেঙে তারা নিরাধারা কান্না করেছিলো... ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হতে হতে বাকরুদ্ধ হয়েছিলো... এখন যদিও তা মনে নেই তবে নিগূঢ় দৃশ্যকল্পটি কিছুতেই ভুলতে পারে না এ জন্যে যে- ঐ রাতে বেড়াল  জননী  তার সদ্যপ্রসূত ছানাটির মাথা ও ঘাড়সহ তলপেটের অংশবিশেষ গিলে খেয়েছিলো এবং তা প্রত্যক্ষরণের পর অপ্রতিরোধ্য বিবমিষার সময় তারা বুঝতে পেরেছিলো- মানুষ তার সারাটা পাকস্থলী সরু ছিদ্র দিয়ে উগলে দিতে পারে কিন্তু পাকস্থলী হতে বেড়ালের মাথাটা উগলে দেয়া প্রায়-অসম্ভব...

14 August 2016

মির্জা মোনালিসা


জলের ক্রন্দন
গাঁয়ের দক্ষিণ রেখায় ঝুমকোলতায় থোকা থোকা ফুল ফুটলে তুমি আন্দোলিত হও। তোমার সেই মুগ্ধতা গ্রাম পেরিয়ে গ্রামান্তরে পরিব্যপ্ত হলে আমার জ্বর আসে। তোমাকে অদ্ভুত কিছু ভাললাগার অনুভূতি জানাতে চাই। এই যেমন, কালরাতে মেহেন্দীর গন্ধে আমার নিদ্রা টুটে গেলে সারারাত এক জ্যোৎস্না কবলিত মাঠে বসে ছিলাম; কিংবা নদীর ধার ঘেঁষে অলৌকিক শুদ্ধতা নিয়ে যে মানবী দাঁড়িয়ে আছে সে আমার মৃত বোন।  এরকম অজস্র দৃশ্য চিত্রের কথা তোমাকে লিখতে চাই। তবে লেখা হয়ে উঠে না, কেননা, আমার বানান ভুল হলে তুমি রাগ করো। অথচ মহাপৃথিবীর মহাসৃষ্টি জুড়ে যে অজস্র ভুল বানানের ছড়াছড়ি তা তুমিও যেমন জানো, আমিও জানি। মহাপৃথিবীর মহাগ্রন্থের অজস্র বানান ভুল আমার ভুল বানানের কাছে কিছুই নয়। তুমি অনুধ্যায়ী হয়েছ মহাগ্রন্থের বানান ভুল শুধরে দিতে। পিরামিড স্কিংস এর ভুল বানান রোধ করতে করতে তোমার কলমের দজলা-ফোরাতের কালি নিঃশেষিত প্রায়। আফ্রিকার গহীন জঙ্গলে ঈশ্বরের বিভ্রমে যে আধা জন্তু আধা মানুষের জন্ম তাও তুমি জ্ঞাত আছো। তুমি কি জ্ঞাত আছো বংশাই নদের জল ঘোলা হয় কেন ভরা বর্ষায়? কিংবা দুই নদীর জল কখনো এক রকম হয় না কেন? আমি জানি তুমি এসব প্রশ্নের উত্তর জানো। তবু তোমাকে জানাতে ইচ্ছে করে খুব। তবে, তুমি ইচ্ছে করলেই জগতের মানুষের জীবন পাল্টে দিতে পারো না, যেমন পারো না আমার বানান ভুল রোধ করতে।
তীব্র ভালোলাগা এখন আমার ভেতর। কোথায় যাই বলো তো! নগরীর ওই পুরাতন বৃক্ষটি পাতা ছুঁয়ে আসতে ইচ্ছে করছে খুব। পৃথিবীর কোথাও কি লায়ন লিলিগুচ্ছ সৌরভ ছড়াচ্ছে! কী জানি!
নিজেকে সেই আকাডিয়ান কন্যা মনে হচ্ছে। আজ থেকে চার হাজার তিনশত বর্ষ পূর্বে সুমেরু কন্যা আকাডিয়ান রাজকুমারী; রাজমন্দিরের প্রধান পুরোহিত এনহেদুয়ানা চন্দ্রদেবী নান্নার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছেন।

‘হে আমার দেবী; আমি একান্ত অনুরক্ত তোমার। উপস্থিত হয়েছি সমস্ত সৌন্দর্য নিয়ে; এই রাজ্যের বিদুষী রাজকন্যা এক। কেবল তোমার উপাসনা করি এবং করে যাবো চিরদিন। জেনে রেখো, আমিই একমাত্র এবং বিশ্বস্ত পূজারী। যদি এক ফোঁটা অনুগ্রহ বর্ষিত না হয়, যদি বিস্মৃত হও আমাকে তবুও সমস্ত যজ্ঞ তোমার। কেননা তোমার সর্বোচ্চ শাস্তি প্রত্যক্ষণের অভিজ্ঞতা আমার আছে।’

তুমি তো জানো, এই মন্ত্র উচ্চারণের মুহূর্তে নতুন করে বাক দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো। তবু তোমাকে একথা আবার জানাতে চাই, জানাতে চাই, কী নিমগ্নতা আর ধ্যানস্থ হয়ে তিনি উচ্চারণ করেন এই মন্ত্রগুলো। তার উচ্চারণে ঝরে পরে আভিজাত্য, সৌন্দর্য আর শুদ্ধতা। কবিকূল জননী তিনি। তবু তোমাকে তা বলা হয় না।  বানান ভুল হওয়ার ভয়ে তোমাকে জানাতে পারিনা কবি চন্দ্রাবতীর প্রেমিক, কৈশোরসঙ্গী জয়ানন্দ কেমন করে মুহূর্তের মধ্যে পিছু নেন। চন্দ্রাবতীর বিয়ের লগ্ন প্রায় হয়ে এসেছে, অথচ জয়ানন্দ তখন নৌকায় করে জল-পরিভ্রমণ করছেন। নৌকার ছইয়ের ভেতর এক মায়াবতী শুয়ে আছে। বৃদ্ধ মাঝি দাঁড় টানছে। কনক গোঙুলী তখন। মাঝি তার মেয়েকে ডাকে পালের দড়িটা ধরতে। সেই মেয়ে ওঠে, দু’পায়ের আঙুলে ভর করে পালের দড়িতে টান দেয়। পূবের হাওয়ায় উড়ছে তার শাড়ি। জয়ানন্দ দ্যাখে, মেয়েটির নাকের পাটায় জোনাকির ফোঁটা। অলীক আলোয় সেই নারী জোয়ারি জলের ওপর। তার সেই মুহূর্ত নদী হয়েই তাকে ডুবে মরতে বলছে।
এই তো মাহেন্দ্রক্ষণ! এমন সময় অনন্তেও আসে না কিংবা কদাচিৎ আসে। জয়ানন্দ মুহূর্তের পিছু নেন। আর ভাটিতে পড়ে থাকে তার বিদুষী প্রেমিকা চন্দ্রাবতী। চন্দ্রাবতী তখন কী করেন! চন্দ্রাবতী! কবি তিনি। তিনি জানেন কী করে শোককে পরিণত করতে হয় শক্তিতে। তিনি রচনা করেন সীতার বারোমাসি। সম্পূর্ণ নতুন করে। যে সীতা কেবলই এক মানবী। চন্দ্রাবতী তাকে রামায়নের নারী থেকে আলাদা করেছেন। এসব কথা তুমি জানো, তবু বারংবার তোমাকে জানাতে ইচ্ছে হয়।



কেবল জানো না, চাঁদের লাগোয়া ঘরে বাস করে এক চন্দ্রাবতী নারী
কালীগঙ্গার ঢেউয়ের ভেতর থেকে সুর ভেসে আসে - সময় গেলি সাধন হবে না।কেউ প্রশ্ন করে, এমন ঘুটঘুইট্যা আন্ধারে কই যাও কন্যা?
 কে প্রশ্ন করে আমি তারে দেখি না। তবু বলি, আমি আমার সাঁইজির তালাশ করি।
তাঁর খোঁজ কি আর এমনি এমনি পাওয়া যায়? তাকে পেতে হলে ডুব দাও কালীগঙ্গায়, মন ভাসাও হৃদ যমুনায়।
দ্যাখো, জল বাড়ছে বংশাইয়ের। জোয়ারের জল আসতেছে। তুমি কি শুনতে পাচ্ছো জোয়ারের ডাক! জলের শব্দ!
পাগল! এতো জলের শব্দ নয়; জলের কান্দন। এমন কান্দন তোমার ভেতরেও আছে। তখন তুমি ঘর-বাহির করো, নিমবৃক্ষের তলায় দাঁড়িয়ে থাকো তখন তোমার ভেতর কান্দনের সুর ওঠে। তুমি বুঝতে পারো না। তাই অমন অস্থির হয়ে উঠো।
‘জলের কান্দন’-এর কথা তোমাকে বলা হয় না। তুমি তো জানো, আমার জন্মগৃহে রাহু আর কেতুর অবস্থান। তাই কন্যা লগ্নে জন্ম নিয়েও খুব সহজে কোনো কিছুর প্রাপ্তি ঘটে না আমার। আর ভাগ্যরেখা সোজা উঠে গেছে চন্দ্রক্ষেত্র থেকে শনির ক্ষেত্রর দিকে। তাই চন্দ্র প্রসন্ন হলেই আমি কেবল মহাপৃথিবীর মহাপথগুলো পাড়ি দিতে পারি।
আর তাই ‘পুরণমাসি’রাতে প্রার্থনা পড়ি


হে চন্দ্র, হে আমার ভাগ্য নিয়ন্ত্রক, তুমি প্রসন্ন হও, আমি তো তোমারই কন্যা
চন্দ্র প্রসন্ন  হোন কি হোন না ঠিক বুঝতে পারি না।
তবু, তোমাকে আমার জীবনের যাবতীয় বানান ভুলের কথা লিখে যেতে চাই; আমার কী দোষ বলো, ঈশ্বর যদি ভুল বানানে আমার জীবনগাঁথা লিখে রাখেন!
...একদিন আমাদের গাঁয়ের বাঁশঝাড়ে নিরাধারা কান্না করে চৈত্রের বাতাস। নিভৃত গন্ধমের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে নৈঋতে নৈঋতে। দক্ষিণের ভিটায় ঘুঘুর ডাক প্রলম্বিত হয়। আমরা ভীত হই। সমস্বরে জপ করি ঈশ্বরের নাম। সেই দিবালোকে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে; দিনের আলোয় রাত্রি নেমে এলে আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠরা কিয়ামত আসন্ন ভেবে আমাদের আগলে রাখেন। ঝড় ও ঝঞ্ঝায় উড়ে যায় ঢেউটিন। আমাদের রক্তপ্লাবিত কাটা স্কন্ধ পড়ে থাকে ফসলী ক্ষেতে। কেউ কেউ বেঁচে থাকে কিংবা পুনর্জন্ম লাভ করে। তারা ঈশ্বরের নামে গৃহ বানায়; জমিতে হাল দেয়।
আর আমি !
জন্ম নিচ্ছি পুনর্বার, আপন উদর হতে ক্রমশ নতুন। প্রগাঢ় অন্ধকারে ডিম ভেঙে জন্ম নিলে সূর্য ও কুসুম, আমিও খোলস ভেঙে ফেলি। আমি নীত হচ্ছি নতুন এক শহরে। এ কোনো মৃতের নগরী নয়। এইখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় জীবনের রেণু। আরো একবার কোনো এক পুষ্প ভোরে আমার মৃত্যু হলে এইখানে ছিলাম আমি। এই বর্ষণসিক্ত পথ, পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ আমার চেনা। ঘনবর্ষা আবেগ ঝরায় দুর্বার ধার ঘেঁষে। পৃথিবীর কোথাও কি তবে জীবনের আকাঙ্খা ছিল! এখন মহাকাল গুটিয়ে নিয়েছে তার ডানা বিপন্ন বিষাদে। এখন বিসর্জিত অস্তিত্ব আমার ধাবমান অনস্তিত্বের দিকে।
এখন সকাল নয়
সন্ধ্যা নয়,
দিন কিংবা রাতও নয়
নিয়মও স্থিরতম

মন্দিরের ঘন্টাগুলো কবেই বন্ধ হয়ে গেছে লাফিয়ে লাফিয়ে ...


শীর্ষা মণ্ডল


হাঁড়িকাঠ
যে কোন শহরেই তুমি একটা চৌরাস্তা পেয়ে যাবে যার একদিকে একটা প্রকাণ্ড শিবমন্দির থাকেই। তার থেকে সাড়ে তিন পা পেছোলেই তুমি সম্পূর্ণ অন্য মোড়ে পৌঁছে যাবে। শহুরে অনুরণনযুক্ত খোলসের মধ্যে কেউ সেখানে রোজ রাতে মৃতদেহ সৎকার করে। আরো দুটো রাস্তায় হাঁটলেও তুমি সেই চওড়া লোমশ আয়নাটাই দেখবে কিন্তু তার সামনে তুমি নিজেকে খুঁজে পাবে না সহজে। খুব মন দিয়ে মাইক্রোস্কোপের তলায় দেখলে সেখানে পুরোনো কোন রক্তচোষা মাছির সঙ্গে আলাপ হবে তোমার। যার শুধু ওই চিত্রস্হিত মৃতদেহটাকে ঝলসে নুন মাখিয়ে খাওয়াটাই বিধান

 

পাশবালিশ জড়িয়ে শোওয়াটা আমার চোখে মুক্তির ডাকনাম। ওটাকে তুমি নানা রঙে সাজিয়ে গুছিয়ে টিপ পরিয়ে অজুহাত নাম দিয়ে তৈরী করতে পারো। দুটো দিন পরেও দেখবে আমি পাশবালিশ জড়িয়েই ঘুম বলে কোন আঠার সঙ্গে ভাব জমাচ্ছি। যতবার পা আটকে গেঁথে যাবার চেষ্টা করছি ততই যেন একপুকুর জলের আবির্ভাব হয়ে আঠার তাক পাতলা হয়ে আসছে। আমি কেঁপে কেঁপে উঠছি। তুমি যত্তসব বলে উপুড় হয়ে বিছানা বানাচ্ছো আমাকে। ধুঁকছি আমি। ভূমিকম্প হচ্ছে ক্রমাগত। কিন্তু কেউ দরজা খুলে মাঠের দিকে ছুটছেনা প্রাণভয়ে। তুমিই শুধু ঘামে ভেজা কিছু ফুল ছড়াচ্ছো ভূমিকম্প পরবর্তী মৃতদেহে।

   

ঘেরাটোপের আর্তকথা

যেগুলো আমার তারা নিজস্বই আমার। একান্ত। মেঘ এসে তুমুল কঠিন তাকালেও আমি দেব না। বসন্ত চুমুভেজা ছোঁয়া দিলেও না। যতক্ষণ শেষ না হই পালক আমার মুকুট আমার সিংহাসন তলোয়ার বেড়ি সব আমার। এবং চিবুক তুলে তাকানোটাও শুধুই আমার। তোমাকে বড়জোর অপ্রয়োজনীয় ফুরসতে পাখি হবার স্বপ্নটুকু দিতে পারি।