08 October 2016

ইন্দ্রজিৎ দত্ত





জ্যোৎস্না যা মাঝে মাঝে

মধ্যরাত নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই
আবছা বারান্দা,ঘুম ঘুম বেডরুম
তোমার ব্রা-হীন বুক
স্পটবয়ের মত
অভ্যাস নিয়ে জেগে আছি
আজকাল এমনটা মনে হয়
বন্ধ দরজার ওইপারে
তুমিও
একটি তিরিক্ষি বাতিহীন ধর্ষণের অপেক্ষায় জেদী
কাঁচের চুড়ি আর প্রৌঢ় নাগরদোলা ছুঁয়ে
সোম...মঙ্গল...বুধ...
আর আমি
ঘুমের ওষুধ কিনতে এসে
খুচরো নিয়ে বচসা করছি
জিরিয়ে নিচ্ছি।



সুধাংশু চক্রবর্ত্তী




শান্তি কোথায়
সব দেখেও চুপ করে থাকি । মুখ খুলি সে সাহস নেই। কার কাছে খুলবো? বিয়ের আগে যে-মেয়ের মধুর বচন শুনে বিমোহিত হয়ে বিয়ে করেছি সেই মেয়েই কিনা বিয়ের পর অমন পালটে গেল! অমন সুমধুর গলা দিয়েই কিনা অনর্গল ঝরে চলেছে কর্কশ রবের হাঁকডাক এবং হম্বিতম্বি! গোপনে বলে রাখি, মাঝেমধ্যে মুখের সাথে হাত চালাতেও দ্বিধা করছে না। বিয়ে করে ঘরে তুলেছি তাই  ফেলতেও পারছি না আবার গিলতেও পারছি না এমতাবস্থায় পড়ে হাঁসফাঁস করছি। না না, শুধু আমি নই । আমার মা-বাবাও নিস্তার পাচ্ছেন না এই অবস্থা থেকে। 

দিন ধরে বাবার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তার দেখাতে হলেও স্ত্রীর অনুমতি নিতে হচ্ছে। তবে হ্যাঁ, অনুমতি দিচ্ছেন কিন্তু আদিখ্যেতা বলে উড়িয়ে দিতে ছাড়ছেন না। বৌমাকে খুশী রাখতে চেয়ে মা যেচে পড়ে হেঁশেলের ভার তুলে নিয়েছেন নিজের অশক্ত কাঁধে। সেই সাথে চলছে বাবার সেবাযত্ন। সেসব দেখে চোখে জল এসে গেলেও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি স্ত্রীর মুখচোপার ভয়ে। আজ অফিসে যাবার সময় শুনলাম কাজের মেয়েটা নাকি সপরিবারে বেড়াতে গিয়েছে। দিনকয়েক কাজে আসবে না। ভাবলাম, স্ত্রী এবার বেজায় ঠ্যালায় পড়বেন। ঘরদোর সাফ করা থেকে বাসন মাজা ইস্তক সব কাজ যে সেই তাকেই সামলাতে হবে। সেই আনন্দে খুশিমনে অফিসে চলে গেলাম।

পরদিন ছুটি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাজারে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছি। হঠাৎ চোখে পড়লো ব্যাপারটা। মা কলতলায় ডাই করে রাখা বাসনগুলো মাজতে বসেছেন! অথচ স্ত্রী কিনা ঘরে বসে চা খাচ্ছেন সোফায় বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে! দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। বাবার চিকিৎসার খরচে কোনো টান যাতে না পড়ে মা কি সেদিকে লক্ষ্য রেখে বাসন মাজতে বসেছেন! মা কি ঝিয়ের কাজটাও স্বেচ্ছায় তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে শুধুমাত্র বাকী জীবনটা শান্তিতে কাটাতে চান সেই আশায় বুক বেঁধে?




কল্পনার ডানা মেলে
রোদ তেমন কড়া নয়। ক্র্যাচে ভড় দিয়ে হাঁটতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে পারমিতার। আর কতটা যেতে হবে বুঝতেও পারছে না। তবে এটুকু বুঝেছে নদীর অনেকটাই কাছে চলে এসেছে। একঝাঁক গাঙচিল উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে। ওদের ক্যাঁচরম্যাচর আওয়াজে বুঝলো আর বেশী হাঁটতে হবে না। মনে জোর এনে হাঁটতে লাগলো ক্র্যাচ টেনে টেনে।
নৌকাটা জলে কাঁপছে থিরথির করে। ছাউনির ভেতরটা এখনো সুনসান হয়ে আছে। ওপারে যেতে কত ভাড়া নেবে তাও জানা নেই। কাঠের লম্বা তক্তায় কিছু টুকরো কাঠ লাগানো রয়েছে ছেড়ে ছেড়ে। যেন সিঁড়ির ধাপ! নৌকা এবং স্থলভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে মেলবন্ধনের সেতু হয়ে। পারমিতা দোমনা করতে করতে নৌকায় উঠে পড়লো কাঁপাকাঁপা পায়ে। ছাউনির তলায় সবে বসতে যাবে নৌকার প্রায় ঢাকা গলুইয়ের ভেতর থেকে মাঝি বলে উঠলো এ নৌকা ফুটো দিদিমণি। জমা জল বের না করা ইস্তক নৌকা নড়বে না এখান থেকে।
-তাহলে কি হবে ? আর কোনো নৌকা যে দেখছি না এখানে।
-এই একটাই নৌকা। যখন ছাড়বে যাবেন।
-আমার যে দেরী হয়ে যাবে ভাই। কি করি?
-সাঁতার কেটে পার হয়ে যান যদি তাড়া থাকে। লোকটা নিজের মনে জল ছেঁচতে ছেঁচতে জবাব দিলো। অর্ণব যদি ফিরে যায় ওকে না দেখতে পেয়ে! পারমিতা অসহায় মুখে দেড়খানা পা দিয়ে জল কাটতে লাগলো সাঁতরে নদী পার হবার জন্য। মাঝি কিছুই টের পাচ্ছে না । 


রিকি দাশ


খেলা
ভাতঘুমের চোখ ছিটকে পড়ে উঠোনের ঝুলন্ত কাপড়ে।শীত শীত ভাব টপকে পড়ে মিশে যাচ্ছে পশ্চিমগঙ্গায়। বৃষ্টির মতন ঝরঝরে স্রোতে চুষে নিলো শরীরের সমস্ত ঘ্রাণ।যেন একটি ব্যাংক একাউন্টে সেভিংস হচ্ছে সারাদিনের সমস্ত ক্লান্ত কর্ম। প্রতি ফোটা যেন এক এক সঞ্চয়ী হিসাব।কড়কড়ে রোদের কোরাসে টগবগে গন্ধরাজ আঁকতে গিয়ে ভাবি,জীবনের সাথে ওই ঝুলিয়ে দেয়া শুকনো কাপড়ের বড্ড মিল!
ওদিকে এক পাড়ায় আজ গায়ে হলুদ।রঙে পূর্ণ সব দরজা জানালা।ওপাড়ায় আজ রাত যাবেনা...
আশ্বিনের কোল ঘেষে বসে থাকবে সমস্ত আধার।
অথচ দেখ অন্য পাড়ায় একটা মানুষ নাকি আর ঘুম থেকে উঠবেনা, হাঁটবেনা...কালের স্নানে ডুব দেওয়া সত্যজলে সে পরিশুদ্ধ হওয়ার অভিপ্রায়ে গা ভাসিয়ে দিল চিরন্তনে।তাই সমূহ আঁধার হেঁটেছে আজ ওই পাড়ায়। কর্পোরেট চোখ দুটি বন্ধ করতেই দেখি জানালাটি গুটি পায়ে কাপড়ের সাথে ভাব বিনিময় করছে...আর আকাশে উঠেছে রংধনু...



গন্তব্য
মেঘের কলিংবেলে চাপ দিতেই, ঝমঝমিয়ে নুপূর শব্দ শুনিয়ে দিল শেষ জলটুকু। সবটুকুন ঝেড়ে ফেলে সফেদ আকাশ নিয়ে বসে পড়ল ইস্টিশন মাস্টার। আশ্বিনের মাস, ত্রয়োদশী তিথি! শহুরে নদে এসব নেই। বাথটাবের ছলছল স্নানের শব্দে, ডিম-পাউরুটির ব্রেকফাস্টে অমাবস্যা পুর্ণিমার গদ্য-পদ্য সব সাঙ্গ হয়।জিন্স আর সানগ্লাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকে হোলির দাগ। চাঁদের বুকে জ্বালায় আতশ বাজি!

ইস্টিশন মাস্টার পঞ্জিকা গুটিয়ে দেখে শেষ জলটুকু ঝেড়ে আজ জানালা বেশ পরিষ্কার।
নক্ষত্র ভালো, হেটে যাওয়া যাবে বহুদুর...!



ইমরান মাহফুজ





সাহিত্য সংসারে দীর্ঘ হাহাকার!

সময়ে অবসাদগ্রস্থতা নগরীর মানবিক রোগের নাম। যাপিত জীবনে নৈতিকতা-মূল্যবোধ মানব অস্তিত্বের বড় দিক হলেও প্রকটভাবে সংকট তৈরি হয়েছে।যোগ করেছে সৃজনশীলতায়- নগরে মোড়ে মোড়ে জমাট বেঁধে নেড়িকাকের অহেতুক চিৎকার আর চেচামেচিতে অস্বস্থিকর পরিবেশ। প্রকৃত মূল্যবোধের কাঠামো ভেঙে যে বুদ্বুদ তোলার চেষ্টা চলছে, তাতে মনোরাসায়নিক দুর্গন্ধ সহ পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা। সৃজনশীল সাহিত্যের নামে কতেক তোষামোদকারী কিংবা সুবিধাবাদী লোকের আখড়ায়...

পাঠাভিজ্ঞতায় দেখা যায় সাহিত্য রচনার পাশাপাশি সাহিত্য বিচার করবার কাজটিও একটি বড় বিষয় বলে সবসময় মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্য-‘জ্ঞানের বিষয় নহে, ভাবের বিষয়’-এ্ই বিশ্বাস তাঁর আজীবন ছিল। সেই সাথে আরেকটা জিনিস লক্ষ্য করি- অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানের এবং ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ’। এর ফলে সাহিত্য ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে বিশ্বজনীন হয়ে উঠে। আর এ বিশ্বজনীন করতে হলে উন্নত রুচি, বোধ, চিন্তাশীলতার জায়গা বিস্তৃত প্রয়োজন। সেটা সমকালে প্রচন্ড সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

গতকাল এক কবিবন্ধু দেখায়, ঐ যে উনি যাচ্ছেন, তিনি কবিতা যেমনই লিখেন, তার কবিতা যে কাউকে ছাপতে হয় এবং তার অনুষ্ঠানে দাওয়াত করলে আসতে হয়, অন্যথায় অপমান কপালে।
আমি কিঞ্চিত বিচলিত হলাম না। এই সমাজে আরো হেন কাজ যে হচ্ছে সেটি জানি বলে। একবার গীতিকবি শহিদুল্লাহ ফরায়েজী বললেন : ইমরান, শিল্পচর্চার পূর্বে মানুষ হতে হয়। সে মানুষ হবে- সুন্দর আর উন্নত রুচির, তাহলেই সে শিল্পচর্চা থেকে পাঠক উপকৃত হবে।

মানুষ হওয়া তো দূরের কথা শিল্পজ্ঞান না নিয়েই ক্ষমতা কিংবা লবিংয়ের ‘গুণে’ দেশ থেকে দেশান্তরে বাংলাসাহিত্যের ‘প্রতিনিধিত্ব’ করে দূর্বাঘাসের মতো মাড়িয়ে দিয়ে আসছে প্রকৃত সাহিত্য কৃষকের ফসল। আর ভিনদেশীরা ভাবছে ‘বাংলা সাহিত্য বুঝি এমনই’। অথচ যার শিল্পজ্ঞান ভাল, শ্রেণী/সংগঠন না মনে রেখে কীর্তিকে জানান দিয়ে আসতে পারতো, তিঁনি যেতেই পারছে না।
প্রসঙ্গে বলি, সমাজে এখনো একটা চিত্র আছে- যে ছেলেটি পড়াশোনা ভালভাবে করেনা, মা-বাবার কথা শোনে না, লোকাল পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ছে, নারী কেলেঙ্কারিতে পরিবারের মানসম্মান যায় যায়, ঠিক সে সময় সিদ্ধান্ত হয় ছেলেটিকে বিদেশ পাঠানোর। এতে কি ছেলেটি কত অংশে ভাল হয়ে যায়? সেকি আমার দেশের প্রতিনিধিত্ব করেতে পারে? অবশ্যই না।

এমনটাই হচ্ছে প্রতিটি ক্ষেত্রে। মেধাবী সাহিত্যজন, যে জায়গা থাকলে সাহিত্যের উপকার হতো তাকে যোগ্যস্থানে বসাতে সক্ষম হচ্ছি না। কথাও বলছি না কুলুপ এঁটে আছি। যারা আবার বলছে- ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে কথা বলতে দেখছি না। কখনো কখনো দলকানার পরিচয়ও দিচ্ছে। আবার কখনো ‘তকমা’ জুড়ে কথা বলে কাউকে একঘরে রাখার অপচেষ্টায় লিপ্ত একশ্রেণী। যেন হরিলুটের বাজার। পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত সাহিত্য- যে যার মতো বিলিয়ে যাচ্ছে। বলারও কেউ নেই। দেখার আছে হলভর্তি দর্শক।
সমালোচনা সাহিত্যে আবদুল মান্নান সৈয়দ কিছুটা ভূমিকা রেখেছেন। এই সময়ে তাঁর অনুপস্থিতেতে হাহাকার দীর্ঘ হচ্ছে। আড্ডাগুলোতে প্রশংসার ঝুড়ি নিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। একজন অন্যজনের পিঠ চুলকানোর মত, কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। শৈল্পিক সমালোচনা থাকছে অধরা। বিলের ফেনার মতো সবাই ভেসে আছি নয় কি!

আজ সত্যি- ‘মানুষ’ অধরা। ফলে যোগ্য জায়গায় যোগ্য লোক না থাকায় এই ‘প্রজন্ম’ কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল দেখছি। আর যাঁরা ভোর এনেছিল আজ তারা লিফটের ডানে কিংবা বামে দাঁড়িয়ে ক্ষমতা ঘরে কলিংবেল দিচ্ছে। অযোগ্যদের ‘কদমবুসি’ করে সূর্যসকালের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। দূর থেকে পাখিরাও হাসছে!

ব্যক্তি পরিচয় কিংবা ‘নারী’ বলে নিন্মমানের লেখা ছাপানো হচ্ছে সাময়িকীতে। আবার কখনো না ছাপলে নিজেই পত্রিকা করে ক্ষমতা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত। একজন পাঠক সৃজনশীল মানুষ থেকে সৃষ্টিটাই চায় নারী কিংবা ক্ষমতার নয়। কীর্তন হউক সৃষ্টির।

যা হোক এই সময়ের ময়না তদন্ত আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং এতে দুর্গন্ধ ছড়ায়। আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়। মানব জীবনে বিশ্বাস হারানো পাপ। সময়ের উদ্দেশ্য হউক আলোকোজ্জ্বল। সাহিত্য হয়ে উঠুক দেশীয় এবং বৈশ্বিক। সৃষ্টিশীলতার দৃষ্টিবোধ কীর্তি নিয়ে দাঁড়াক আকাশচূড়া ক্যানভাসে। স্বপ্নের মশাল হাতে সমকালের মুখোমুখি আমরা।

কবি ও সম্পাদক : কালের ধ্বনি

মৌসুমী রহমান




দুঃখ যাত্রা
আমার বুকের পাটাতনে পা রেখে-
তুমি দূরের আকাশ দেখ!
জানো কি?
ওই আকাশের গায়ে যত নক্ষত্র
                           তত কষ্ট আমার বুকে।
বুঝো কি?
আমার পলাশ রাঙা অনুভূতিগুলো ক্রমশ ভোতা হয়ে যাচ্ছে,
সুখগুলোও তিতা তোমার ছোঁয়াও আজ বড্ড নির্লিপ্ত!

মিথ্যে নয়,
এ যে সত্যিও নয়
এ এক অনন্ত দুঃখ যাত্রা...



বিরহী সুর

অব্যক্ত বেদন
করছে খেলা
স্মৃতির মেলায়
ভুলের ভেলা।

বিষণ্ণ কায়া
কষ্টের ভৃত্য
অভ্যস্ত বিরহে
কান্নার নৃত্য।

অপ্রাপ্তির বৈঠা উল্টোদিকে বায়
পাতাঝরা পথে
বাউল গায়-
খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়...