17 May 2017

মোজাফ্ফর হোসেন





ক.
সুবীর ওর বাবাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে উঠেছে। বছরখানেক আগেই ওদের এখানে আসবার কথা ছিল। তখন বাবা বেঁচেছিলেন। সুবীরের বাবা হরিশঙ্কর কাকা লোকমারফত ভাঙা ভাঙা অক্ষরে পত্র লিখে পাঠিয়েছিলেন, আসবার কথা জানিয়ে। বাবা সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে আপ্লুত হয়ে উত্তরও পাঠালেন। এরপর বাড়ির এটা ঠিক করো, ওটা ঠিক করো-এতদিন পর হরি আসছে! বাড়ির সবাইকে অস্থির করে তুলেছিলেন। সীমান্তে যারা কারবার করতো তাদের রোজই একবার করে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতেন- দেখবি, হরির আসতে সমস্যা হয় না যেন! তারপর বাড়ি আর পথ করতে করতে একদিন নিজেই চলে গেলেন। গতকাল সুবীর যখন হরিশঙ্কর কাকাকে নিয়ে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় দিলো, তখন কেবলই বাবার কথা মনে হচ্ছিল। আমার স্ত্রী তো পেছনে দাঁড়িয়ে কেঁদেই ফেলল। হরি কাকাকে ওই ধরে নিয়ে গিয়ে বসবার ঘরে বসালো। বেশ ভারী শরীরের মানুষটা। হাঁটবার সময় বাচ্চাদের মতো দেখে দেখে পা ফেলেন। সুবীর আমার বয়সই হবে। মিরাকে হাত তুলে নমস্কার করে একটু ইতস্তত করে একটা হাত আমার দিকে এগিয়ে দিল। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে খানিকটা ফিসফিস করে বলল- মেহেরপুরে পা দিয়েই কাকার সংবাদটা শুনলাম। বাবাকে বুঝতে দিইনি। এমনিতেই অনেক ধকল গেছে; এখনই কিছু বলবেন না প্লিজ। অন্যকিছু বলে ম্যানেজ করুন। হরি কাকার দিকে তাকিয়ে বিষয়টা বুঝতে আমার অসুবিধা হলো না। সঙ্গে সঙ্গে মিরাকে আড়ালে ডেকে বললাম- কাকাকে বলো, বাবা কদিন মেরেপুরের বাইরে গেছে। চলে আসবে। শরীরটা বিশেষ ভাল না, এখনই কিছু বললে বেশি আপসেট হয়ে পড়লে সমস্যা হতে পারে। হরি কাকাকে মিরার দায়িত্বে রেখে আমি আর সুবীর গেস্টরুমের বারান্দায় গিয়ে বসলাম। সুবীর লম্বা ছিপছিপে গড়নের। ক্লিন সেভড্। ফতুয়ার মতো একধরনের শার্ট আর বেগিজাতীয় ঢিলেঢালা প্যান্ট পরে আছে। হরিকাকা সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা পরেছেন। 

শাপলা জাকিয়া





প্রতিদিন বহু মানুষের মৃত্যু হয় ।মৃত্যুর দিনটি তাদের কেমন কেটেছিল,তারা সেটা কাউকে বলার আর সুযোগ পান না । তবু কিভাবে যেন দু’টি ঘটনা জানা গেলো ।
ঘটনা –একঃ
মিনহাজ সাহেবের বয়স ষাট। তিনি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন। নামিদামী হাসপাতাল নয় ,সরকারি হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ড। ছেলে তাকে কেবিনে রাখতেই পারতো কিন্তু রাখেনি, তিনি এখন বাতিলের খাতায়,তারজন্য টাকা খরচ মানে টাকা পানিতে ফেলা। নেহাৎ বুকে ব্যাথা উঠে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে এনে ভর্তি করে দিয়ে গেছে । তবে ছেলের দোষ তেমন তিনি দেনও না । ছোটবেলা থেকেই ছেলে তাকে লম্পট ও মদ্যপ বলে জানে। সারাজীবন স্ত্রী আর ছেলেকে তিনি আসলে বঞ্চনাই করে গেছেন। স্ত্রীর কথা মনে পড়তেই বিয়ের প্রথম দিককার কথা মনে পড়ে মিনহাজ সাহেবের। স্ত্রী কাবেরী তখন কি মিষ্টি দেখতেই না ছিলো। শান্ত, সরল একটা মেয়ে। কিছু বললে বড় বড় চোখ দু’টিতে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতো,যেন জীবনে প্রথম সে এই কথা শুনছে। সেই মিষ্টি কাবেরী সময়ের সাথে কতো বদলে গেলো। সে এখন একজন মোটাসোটা দজ্জাল রমণী! দোষ কাবেরীকেও তিনি দিতে পারেন না। কারন কাবেরীর সেই শান্ত,মিষ্টি স্বভাবকে তিনি কোন মূল্যই দেন নি বিবাহিত জীবনের শুরুতে। তখন তিনি বন্ধুর বউ এর প্রেমে দিওয়ানা ছিলেন। 

প্রজ্ঞা মৌসুমী




তুমি এতোই কালো! তবেতো তুমি পুরা রাত। ভালো তো। লোকে পায় ১২ ঘণ্টার রাত আর তোমার বউ পাবে ২৪ ঘণ্টা। সারাবছরই তার বাসর।
-আমি যে কালো এতে তোমার খারাপ লাগে না? আরে এই দেখো! বলতে না বলতেই চোখ ভিজে গেল!
-ফের যদি এরকম বলো! আমার দিকে তাকাও রাত। কিছু বুঝলে?
-কি?
-সবকিছু তোমাকেই চায়। আর আমিই বা কি আহামরি মেয়ে? আমার মত মেয়েকে কেউ কামনা করতে পারে?
-নিজেকে নিয়ে এত আফসোস কেন তোমার?এটা ঠিক না সোনা। তুমি যে আমার তারা...'একা রাতের আকাশে'...

মাহবুব আলী





তেইশ-চব্বিশ বছরের দাম্পত্য জীবন। এখন মনে হচ্ছে কত ঠুনকো। সেই কথা শোনার পর সারারাত ঘুমে-আধো-জাগরনে পার করে ঘড়ি দেখে সোয়া তিন। নিস্তব্ধ গভীর রাত। ভোর রাত। মশারির বাইরে মশার ভন ভন গান। তখনো কানে বাজছে ভয়ংকর শব্দরাশি।
‘তার নাম কী ছিল?’
‘নাম কি ছিল জানা নেই, আমি দিয়েছিলাম। আমাদের পাড়ায় এক বদ ছোড়া ছিল, আলম; ওর নামে নাম রেখেছিলাম। বুঝলে আমাদের আলম কিন্ত বেশ শান্ত। একদিন ওর সাথে ভাব হয়ে গেল খুউব। আমাকে ভালবাসত।’
‌‌‌‘যেমন?’
‘এই ধরো স্কুল থেকে আসার পর গা ঘেষে দাঁড়াত। গল্প করত। এইসব আর কি?’
‘কত দিন মানে কত বছর ছিল তোমাদের বাসায়?’
‘বছর নয়...দু-আড়াই মাস।’
‘তুমি কোন্ ক্লাসে পড়তে তখন?’
‘সেভেন এইট...এত জিজ্ঞেস করছ কেন? গাধা কোথাকার?’

16 May 2017

প্রণব আচার্য্য





সখী সংবাদ
১.
শুনেছ সখী, করাল অভ্যুত্থানে
আবার এসেছি দুষ্টচক্রে ভেসে
পৃথিবীর যত অচেনা ভাষার টান
ওষ্ঠ অধরে তুলেছি আমরা শেষে

আমাদের হাসি সূর্যের চারপাশ
ঘুরে হয়েছে ব্যাকুল রাখাইন গান

মুনিরা চৌধুরী




1.
মুনিরায়ানা কীর্তনীয়া সুরে
বাজে বাঁশি, করুণ বাঁশের বাঁশি, বাজে হাড়ের বাঁশি...
আয় তবে হাড় ভেঙ্গে ফেলি, নদীর দুই পাড় ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়।

বাঁশির রসে এমন পূর্নিমাসুন্দরী ভাসে
ঘৃতকুমারীর বনে

সৈয়দ শিশির






সময়গ্রস্ত
যান্ত্রিক ত্রুটিতে ট্রেন বিকল হওয়া এক মধ্যরাতে
আবাসিক হোটেলে ভোরের সূর্য দেখার অপেক্ষার পর-
সাময়িক প্রতিবেশীর খরিদানি আর সুখের প্রলাপ শুনে
অবাক বিস্ময়ে নিজেকে আবিষ্কার করি দালালের হাসিতে।

এভাবে নিজেকে আরও একবার আবিষ্কার করেছিলাম-
প্রিয় বন্ধু খালেদের দেওয়া ভুল ঠিকানায় সুইচ টিপে;
যে ঠিকানায় একই ফ্লোরে বসবাস করে ফুল আর কীট।
কীটের উল্লাসে যেখানে বিবর্ণ হয়েছিলাম ফুলজলে।

দালালের চোখে যেমন কমিশন ছাড়া আর কিছুই ভাসে না-
তেমনি, কীটের নর্দমায়ও সময়গ্রস্ত ফুল হাসে না।


নিষাদ মজুমদার





ফুল এবং কনডম
ফুল এবং কনডম দুটো কিনতে গেলে আমি রীতিমত ঘেমে একাকার,
লজ্জায় শেষ দোকানী কি ভাববে/ভাবছে
প্রেমিকা!
বউ!
ছি, ছি! 
কেনা হয়নি কখনো দাম দিয়ে রক্তাক্ত গোলাপ কিংবা তৈলাক্ত বেলুন
আমি ভালবাসতে জানি না
ভালবাসা ঘটানোর জন্য যথাযথ সামগ্রীগুলো কেনার মত প্রেমিক নই বলেই
আমি প্রেমিক হতে পারিনি
ইদানীং ভালবাসা আবার গঠনশৈলী ভাবে ঘটানো হয়
বহু ভেবেও সেই শিল্পের সুস্পষ্টরূপ আমি ধরতে পারিনি

রিকি দাশ




ঘোরের আধারে শীতফুল ফুটে আছে শহরের ঠোঁটে। নিয়ন আলোর সুড়ঙ্গ ধরে দীর্ঘ বয়ে গেছে যে রাত তার বুকে যাত্রীছাউনি নেই।কেবল রেলপথ,আছে দুরারোগ্য মাইক্রোফোনে ভেসে আসা আকাশের চিবুকে তিলের ঘোর।চমৎকার সিল্ক তিলে যেন জমে থাকে সমূহ উপকথা।
বয়স্ক রাতের ভুমি খুঁড়ে খুঁড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতন বের করে আনি প্রেমের ভাস্কর্য।প্রফুল্ল শুভ্রতায় আমরা অপরিচিতের মতন বার্তালাপ চালায়। জন্মস্রোতে জ্বলতে জ্বলতে নিভে যাওয়া মোমবাতির রক্তিম চুম্বন,সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে যুবতীর সৌন্দর্য,
কালোত্তীর্ণ অনুভুতি-
যেন প্রথম মেঘ ধরা,
          প্রথম জ্যোস্না গিলে খাওয়া,
প্রথম প্রেমে পড়া...



তানভীর আহমেদ হৃদয়





সম্পত্তি
দূর্ভাগ্যজনক ভাবে কিছু ভুলের পাশে শুয়ে আছি
কিছুটা দুঃস্বপ্ন তাড়িতও

বালিশের পাশে রাখা গ্লাস ভর্তি আলো
একদিন সব অন্ধকার হবে জানি, তার জন্য এই অগ্রিম
আয়োজন
ব্যাংকে তেমন কোন সঞ্চয় নেই, আমার হাত-পা ই
একমাত্র সম্বল
স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছুর
প্রয়োজন দেখি না একজন মানুষের জীবনে

পাশের বাড়ির ভদ্রলোককে দেখি রোজ দৌঁড়ান
দরজার পাশে তার জন্য কতগুলো কুকুর দণ্ডায়মান
হয়ে থাকে-

নাজনীন খলিল





অগ্নিমুখো ড্রাগন
একটা ধুসর জামার ভেতরে রাত
তার ইনসমনিয়াক দৈত্য পোষে রাখে।
আমি রাখতে চেয়েছি ঘুম
আর
স্বপ্নের ঠিকাদারি।

14 May 2017

সাদিয়া সুলতানা




চুয়ানির ঢেকুর উঠে মুখটা কেমন টক টক হয়ে গেল বিল্লালের। ‘মালে নিশ্চিত ভেজাল দিছে সাত্তার হারামজাদা। ঠেকের লগে মাগিবাজি শুরু করায় সাত্তাইরার ব্যবসায় ভ্যাজাল ঢুকছে।’ সাত্তারকে গালি গালাজ করতে করতে থেকে থেকে বমি করে বিল্লাল। মনে হচ্ছে পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসবে। বমির দমকে রাস্তায় বসে পড়ে ও। একটা পুরি আর একটা সিঙাড়া পেটের ভেতর যেয়ে অতটা হয়ে গেছে ভাবতে অবাক লাগে ওর। মিনিট পাঁচেক পর বিল্লাল স্থির হয়। মুখে খানিকটা পানি দিতে পারলে আরাম হতো।

উদয় শংকর দুর্জয়





উড়ছে মেঘের পালক শ্রাবণের মাঠে
উড়ছে মেঘের পালক শ্রাবণের মাঠে, আঁধারে পুড়ছে আলো বৈকালিক প্রিয়টানে
সবকটি জানালা খুলে গেলে রোষাবেশে, মুঠো ভরা আর্তি ঢুকে পড়ে কঙ্কণ সুরতানে
ঝরে গেলে দগ্ধ অশ্রু বিষাদ অনুরণনে, ঝাঁক সাজবাতি জোনাক কুড়িয়ে আনে
অমন করে ফেলে গেলে চিহ্ন হৃত-পাথরে, শুধু ছুঁয়ে দ্যাখ রক্ত-রঙ দীপ্ত অভিমানে 

ও চোখের উদ্যানে সবুজ গাছালি মৃদুমন্দ পায়ে, বহুকাল পরে সে খুলেছে মন বিচরণে
একদল হরিণ শাবক দাঁড়ায় সচকিত চোখে, ভোরের ভেজা তৃণ মেখে খোঁজে সমীরণে
রুপোলী মাছ শিকারের কৌশল রেখে গেলে, স্রোত এসে খুঁজে যায় তিথির অবলম্বনে
এক মাঘী পূর্ণিমায় আকাশ পাশে হাঁটলে, পাল তুলে হৃতমনা নৌকা বয়ে যায় উজানে

শরীফুল ইসলাম





স্বপ্নীল সন্দেহ
স্বপ্নীল সন্দেহে কাঁচা চোরা মাটি
গলে গিয়ে সমুদ্রে বিলীন
অবাক বালিয়াড়ির চৌকশ ফাঁদে
তারাদের বাড়ি
লাল ঝুটি বিশিষ্ট মোরগের বিয়ে
হচ্ছে ঘন ঘন।
তোমার হিন্দোলে আরও কিছু
উদ্যমী হাওয়া ক্লান্ত হচ্ছে
আর নোনা জলে সাঁতার কাটছে
একটি ডলফিন।

তুহেল আহমেদ






বেঁচে থাকুক নীল জল

অসীমের শূন্যে বা শূন্যের অসীমে ,
মিল্কিওয়ের  প্রতিটি  বালুকণায়
বা  অখেয়ালের  দেয়ালে, খসে যাওয়া রংয়ে  ,
তীরহীন নদীর মোহনায় বা অবহেলার ভাঙা  কাঁচের  টুকরোয় ,
বেঁচে  থাকুক  তোর  ঘৃণা,
তাচ্ছিল্য  ভরা  নিঃশ্বাসের  রেশ...
বেঁচে থাকুক আজন্মলালিত ভালোবাসার আঁড়ালের কামুক লোভ , তোর ভালোবাসা …

তোর চোখ তোর মায়াময়ী কন্ঠস্বর , তার গান ,
বেঁচে থাকুক নীল জল…
ঘরের কোণে অবহেলিত  মুচড়ানো  কয়েক চিঠি ,
ধুলিমাখা ডায়েরীর পাতাগুলির ধুলো , বেঁচে থাকুক …
বেঁচে থাকুক বিকেলের রোদ,
পাহাড়ের সবুজ স্বপ্নের সেই ফোস্কা কুঁড়ানো, দৌড়ঝাপ  ,
তোর ঘরের পর্দার ভাজে আটঁকে থাকা কত  শত  মজার গল্প ,
হাসা-হাসি দু' এক অশ্লীল কৌতুক …
বেঁচে থাকুক সন্ধ্যার বুক,
জোনাক পোকার পালকের ছোঁয়া বা
তাদের আলোর ভালোবাসা বিলানো  শহর …